ভারতের উত্তর–পূর্বের রাজ্য মণিপুরে প্রধান সড়কজুড়ে সামরিক চেকপোস্ট। কড়াকড়ি নিরাপত্তায় আপাত শান্তি ফিরলেও প্রায় তিন বছর আগে শুরু হওয়া জাতিগত সহিংসতার ক্ষত আজও শুকায়নি। শত শত মানুষের প্রাণহানি, হাজার হাজার ঘরবাড়ি ধ্বংস আর কয়েক দশক হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর অঞ্চলটি যেন স্থবির হয়ে আছে। নিরাপত্তার দেওয়াল দুই সম্প্রদায়কে আলাদা রেখেছে ঠিকই, কিন্তু সেই দেওয়াল উন্নয়নকে শ্বাসরুদ্ধ করছে এবং সমঝোতার পথ আরও কঠিন করে তুলছে।
সহিংসতার শিকড় কোথায়
দৃষ্টিতে এই অস্থিরতা ভারতের অন্য অনেক অঞ্চলের দাঙ্গার মতোই মনে হতে পারে। দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের পর ধীরে ধীরে টানাপোড়েন বাড়ে, তারপর হঠাৎ বিস্ফোরণ। মণিপুরে সংঘাতে জড়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু মেইতেই সম্প্রদায় এবং পাহাড়ি অঞ্চলের প্রধানত খ্রিস্টান কুকি জনগোষ্ঠী। বিরোধের কেন্দ্রে ছিল বিশেষ অধিকার নিয়ে বিতর্ক। আদালতের এক সুপারিশে মেইতেইদের তফসিলি উপজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্তির কথা ওঠে। এতে সরকারি চাকরি ও জমির সুবিধা বাড়ত। কুকিদের অভিযোগ ছিল, এতে তাদের আর্থসামাজিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং মেইতেইদের সেই সুবিধা প্রয়োজন নেই। একটি প্রতিবাদ মিছিল থেকেই সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে এবং কয়েক সপ্তাহ ধরে ভয়াবহ সহিংসতা চলে।

তিন বছর পরও আলাদা আলাদা জীবন
এই সংঘাতকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে তার দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকার। প্রায় তিন বছর পরও রাজ্যটি জাতিগত রেখায় বিভক্ত। রাজধানী ইম্ফল ও আশপাশে মেইতেইদের বসবাস, পাহাড়ি এলাকা ও তার ধারে শহরগুলোতে কুকিরা। মাঝেমধ্যে আবারও সহিংসতার খবর আসে। জানুয়ারির শুরুতে মেইতেই অধ্যুষিত একটি এলাকায় বিস্ফোরণ সেই ভঙ্গুর বাস্তবতাই মনে করিয়ে দেয়।
দুই পক্ষ মিলিয়ে প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ এখনো শরণার্থী শিবিরে। বিপরীত পক্ষের প্রভাবাধীন এলাকায় থাকা ঘরে তারা ফিরতে পারছে না। পরিত্যক্ত সরকারি ভবনে গাদাগাদি করে থাকা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ আর অনিশ্চিত জীবিকা তাদের নিত্যসঙ্গী। কেউ কেউ দিনমজুরের কাজ জোটালেও অনেকেই বেকার। দৈনিক সামান্য সরকারি ভাতায় টিকে থাকতে হচ্ছে।
শিবিরের ভেতরের বিষণ্নতা
শিবিরগুলোতে বাতাস ভারী। এক মেইতেই নারী বলেন, তার সন্তানেরা প্রতিদিন বাড়ি ফেরার কথা জিজ্ঞেস করে, কিন্তু তিনি বলতে পারেন না যে সেই বাড়ি আর নেই। কুকি শিবিরে থাকা এক ব্যক্তি জানান, দেখা রক্তপাতের পর তিনি আর কখনো মেইতেইদের সঙ্গে একসঙ্গে বসবাস কল্পনাও করতে পারেন না। কুকিদের একাংশ আলাদা আধা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের দাবি তুলেছে, যা মেইতেইদের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় মহলেও প্রবল আপত্তির মুখে।

সরকারের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ
এই সংকটে দুই পক্ষেরই একটি মিল আছে। তাদের মতে ক্ষমতাসীন দল আরও আগে এবং আরও দৃঢ়ভাবে পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতি এত দূর গড়াত না। অনেকের অভিযোগ, দাঙ্গার সময় রাজ্য প্রশাসন সংকটের গভীরতা বুঝতে দেরি করেছে এবং সহিংসতা উসকে দেওয়া চরমপন্থীদের আটকাতে ব্যর্থ হয়েছে। কেন্দ্রীয় শাসন জারির পরও সাধারণ মানুষের ধারণা বদলায়নি যে দিল্লি তাদের দুর্দশাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় না।
তবু সাম্প্রতিক সময়ে কিছু আশার ইঙ্গিত মিলেছে। নিরাপত্তা বেষ্টনীর কাছাকাছি এলাকায় কিছু পরিবার পুনর্বাসিত হয়েছে। দুই পক্ষের রাজনীতিকদের এক টেবিলে বসার দৃশ্যও দেখা গেছে। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী আলাদা সময়ে রাজ্য সফর করেছেন। তবে এসব উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কতটা ফল দেবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

দেশের জন্য সতর্কবার্তা
দেশের মূল ভূখণ্ডে বসবাসকারীদের কাছে মণিপুরের সংকট দূরের মনে হতে পারে। কিন্তু এর প্রভাব জাতীয়। দীর্ঘদিনের বিদ্রোহী ইতিহাস নতুন করে মাথাচাড়া দিতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির ঝুঁকি এখানে স্পষ্ট। বিশেষ সুবিধা ও সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি বিভাজন কমানোর বদলে যে আরও গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে, মণিপুর তার কঠিন উদাহরণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















