ইরানে নজিরবিহীন গণবিক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে। টানা ষাট ঘণ্টার বেশি সময় যোগাযোগ প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকার পরও রাজধানী তেহরান ও ধর্মীয় শহর মাশহাদসহ বিভিন্ন নগরে রাতভর রাস্তায় নেমেছেন হাজারো মানুষ। এই প্রেক্ষাপটে ইরানের সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালীবাফ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি হামলা চালায়, তবে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও নৌযান বৈধ লক্ষ্যবস্তু হবে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের আশঙ্কায় ইসরায়েল সেনাবাহিনীকে উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও বিক্ষোভ
দেশজুড়ে ইন্টারনেট ও যোগাযোগ বন্ধ থাকলেও বিক্ষোভ থামেনি। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, জ্বলন্ত যানবাহন, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ এবং হাসপাতাল ও মর্গে স্বজনদের আহাজারি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, রাতে রাস্তায় ছিল বিপুল মানুষের ঢল।
মানবাধিকার সংগঠনের সতর্কবার্তা
ইরানভিত্তিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠনগুলো জানিয়েছে, দেশজুড়ে একটি গণহত্যা পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে তারা বলছে, শত শত মানুষ নিহত হতে পারে। আরেকটি মানবাধিকার সংগঠন অন্তত একশ বিয়ানব্বই জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে, তবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হাসপাতালে ভয়াবহ দৃশ্য
তেহরানসহ বিভিন্ন শহরের হাসপাতালগুলোতে আহত ও নিহতদের ভিড় সামলানো যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন চিকিৎসাকর্মীরা। একাধিক হাসপাতালে জায়গার অভাবে মরদেহ স্তূপ করে রাখতে হয়েছে। এক চিকিৎসক জানান, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলি সরাসরি তরুণদের মাথা ও বুকে লাগছে। রক্তের সংকটও তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
বিক্ষোভের রূপান্তর
দুই সপ্তাহ আগে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন দেশ শাসনকারী ধর্মীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিস্তৃত আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। রাস্তায় নামা মানুষের মুখে শোনা যাচ্ছে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। এক মধ্যবয়সী নারী রক্তাক্ত অবস্থায়ও বলছেন, তিনি ভয় পান না, বহু বছর ধরেই তিনি নিজেকে মৃত মনে করেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রসঙ্গ
যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের বিভিন্ন বিকল্প জানানো হয়েছে। যদিও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তবু বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর কঠোর বার্তা দিয়ে বলেছে, ট্রাম্প যা বলেন, তা বাস্তবায়নে তিনি প্রস্তুত। এর জবাবে ইরান বলছে, যেকোনো হামলার জবাব হবে তাৎক্ষণিক ও ব্যাপক।
সরকারের অবস্থান
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার স্বীকার করলেও সতর্ক করে বলেছেন, দাঙ্গাকারীদের সমাজ অচল করতে দেওয়া হবে না। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর হতাহতের খবরই বেশি প্রচার করা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















