গাজার হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে এখন শুধু রোগীর ভিড় নয়, ছড়িয়ে পড়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। ইসরায়েলের নতুন নিষেধাজ্ঞার ফলে ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস বা এমএসএফ যদি মার্চের পর গাজা ছাড়তে বাধ্য হয়, তাহলে চিকিৎসা সেবার শেষ ভরসাটুকুও হারাবে হাজারো মানুষ।
নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা ও উদ্বেগ
গত মাসে ইসরায়েল ঘোষণা দেয়, মার্চের এক তারিখ থেকে এমএসএফসহ সাতত্রিশটি আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাকে গাজায় কাজ করতে দেওয়া হবে না। অভিযোগ, এসব সংস্থা তাদের ফিলিস্তিনি কর্মীদের বিস্তারিত তথ্য দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পরপরই আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। ত্রাণ সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে, এতে গাজায় খাদ্য ও চিকিৎসা সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে, যেখানে টানা দুই বছরের যুদ্ধে এমনিতেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের সংকট চরমে।
হাসপাতালের শয্যায় আতঙ্ক
দক্ষিণ গাজার নাসের হাসপাতালে এখনো এমএসএফের চিকিৎসকেরা পোড়া ক্ষত, বোমার স্প্লিন্টারের আঘাত আর দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভোগা শিশুদের সেবা দিচ্ছেন। কিন্তু এই উপস্থিতি যে আর বেশি দিনের নয়, সেই আশঙ্কাই তাড়া করছে রোগী ও স্বজনদের।
দশ বছর বয়সী আদম আসফুরের বাঁ হাতে এখনো ধাতব রড বসানো। সেপ্টেম্বরের এক বোমা হামলায় স্প্লিন্টারের আঘাতে গুরুতর আহত হয়েছিল সে। হাসপাতালের শয্যা থেকে আদম বলছে, যুদ্ধের পুরো সময় এমএসএফ আমাদের পাশে ছিল। তারা চলে যেতে পারে শুনে খুব খারাপ লাগছে।
চিকিৎসার ধারাবাহিকতার লড়াই
ফাইরুজ বারহুমের আঠারো মাসের নাতি জৌদের মাথা এখনো ব্যান্ডেজে মোড়া। ঝড়ো হাওয়ায় অস্থায়ী আশ্রয়ে ফুটন্ত পানি পড়ে তার মুখ ঝলসে যায়। এমএসএফের চিকিৎসায় তার অবস্থা অনেকটাই ভালো হয়েছে। বারহুম বলছেন, শুরুতে অবস্থা খুব গুরুতর ছিল, এখন দাগ অনেকটাই কমে এসেছে। এই চিকিৎসা ধারাবাহিকভাবে না পেলে আমরা কোথায় যাব।
এমএসএফের ভূমিকা ও সীমাবদ্ধতা
এমএসএফ জানায়, গাজায় তারা অন্তত বিশ শতাংশ হাসপাতালের শয্যা পরিচালনা করে এবং প্রায় বিশটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু রেখেছে। শুধু গত বছরেই আট লাখের বেশি চিকিৎসা পরামর্শ আর দশ হাজারের বেশি প্রসব করিয়েছে সংস্থাটি। তাদের কাজ শুধু চিকিৎসা নয়, যুদ্ধক্লান্ত মানুষের জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থাও করা।
নাসের হাসপাতালে কর্মরত এমএসএফের এক কর্মকর্তা বলেন, আমাদের জায়গা পূরণ করার মতো আর কোনো সংস্থা এখন গাজায় আসতে পারবে বলে মনে হয় না। তাই এই সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত নয়।
ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এমএসএফের দুই কর্মীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুললেও সংস্থাটি তা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে। এরই মধ্যে অন্তত তিনজন আন্তর্জাতিক এনজিও কর্মীকে কেরেম শালোম সীমান্ত দিয়ে গাজায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি। নতুন কর্মী ও সরঞ্জাম ঢুকতে না পারায় সংকট আরও বাড়ছে।
এমএসএফের এক লজিস্টিকস ব্যবস্থাপক জানান, যতদিন পারি আমরা কাজ চালিয়ে যাব। কিন্তু আন্তর্জাতিক কর্মী ও সরবরাহ ঢুকতে না পারলে খুব শিগগিরই বড় ঘাটতির মুখে পড়তে হবে।
এই পরিস্থিতিতে গাজার মানুষ একটাই প্রশ্ন করছে, এমএসএফ চলে গেলে চিকিৎসার জন্য আর কার কাছে যাবে তারা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















