ঢাকা-কারাচি ফ্লাইট পুনরায় চালুর প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপটে এক দশকেরও বেশি সময় পর ঢাকা-কারাচি সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় চালু হচ্ছে। আগামী ২৯ জানুয়ারি থেকে এই ফ্লাইট শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। জাতীয় বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এই রুটে নন-স্টপ ফ্লাইট চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, যা দীর্ঘদিনের বন্ধ থাকা সরাসরি বিমান যোগাযোগের অবসান ঘটাবে। এই উদ্যোগ দুই দেশের কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতারই প্রতিফলন, বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে।
ভারতের আকাশসীমা নিয়ে অনিশ্চয়তা
ভারত ও পাকিস্তান একে অপরের বিমানের জন্য আকাশসীমা বন্ধ রেখেছে। ফলে ঢাকা-কারাচি সরাসরি ফ্লাইট ভারতের আকাশপথ ব্যবহার করতে পারবে কি না, সেটি এখনো অনিশ্চিত। এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি ভারতের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমান সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কও নানা কারণে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা এই অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
যদি ভারত আকাশপথ ব্যবহারের অনুমতি না দেয়, তাহলে বিমানকে ভারতীয় উপদ্বীপ ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রায় তিন ঘণ্টার ২৩০০ কিলোমিটারের যাত্রা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৫৮০০ কিলোমিটার, আর সময় লাগবে প্রায় আট ঘণ্টা। এতে খরচ ও পরিচালন জটিলতা দুটোই বাড়বে।
আইনি ও কূটনৈতিক নিয়ন্ত্রণ
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই ফ্লাইট সার্ভিস বিদ্যমান বিমান সেবা চুক্তি অনুযায়ী পরিচালিত হবে। অর্থাৎ, প্রযুক্তিগত ও আইনি দিক থেকে বিষয়টির চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ নয়া দিল্লির হাতেই রয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে ফ্লাইট সংযোগ নিয়ে তারা সংবাদ দেখেছেন এবং এ ধরনের উদ্যোগ সংশ্লিষ্ট বিমান সেবা চুক্তির আওতাতেই পরিচালিত হবে।
১৯৭৮ সালের দ্বিপাক্ষিক চুক্তির প্রভাব
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৭৮ সালে স্বাক্ষরিত একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি রয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যে বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে। এই চুক্তিতে আকাশপথ ব্যবহারের নিয়ম, নির্ধারিত রুট এবং কোন পরিস্থিতিতে অনুমতি স্থগিত করা যেতে পারে—এসব বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। ফলে ঢাকা-কারাচি ফ্লাইট ভারতের আকাশসীমা ব্যবহার করতে পারবে কি না, তা এই চুক্তির শর্ত এবং ভারতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে।
আঞ্চলিক রাজনীতিতে পরিবর্তনের প্রভাব
শেখ হাসিনার পতনের পর নয়া দিল্লি ও ঢাকার সম্পর্ক শীতল হয়েছে, বিপরীতে ইসলামাবাদ ও ঢাকার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা, সংখ্যালঘু অধিকার এবং ঢাকায় একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। একই সময়ে ইসলামপন্থী সমর্থনে পরিচালিত কিছু রাজনৈতিক আন্দোলনে ভারতের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় বক্তব্যও শোনা গেছে।
বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা
শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস দুইবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারও ঢাকায় সফর করেছেন। এর পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত বছরে বছরে প্রায় ২০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি হয়েছে। দুই দেশ ১০০ কোটি ডলারের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তির লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারকেও স্বাক্ষর করেছে।
সামরিক সহযোগিতার নতুন দিক
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক সহযোগিতাও আগের তুলনায় গভীর হয়েছে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রধান সম্প্রতি পাকিস্তান সফর করেছেন এবং চীন-পাকিস্তান যৌথভাবে তৈরি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তিনি পাকিস্তানের শীর্ষ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। পাশাপাশি দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনী আমান-২৫ সামুদ্রিক মহড়ায় একসঙ্গে অংশ নিয়েছে।
সব মিলিয়ে ঢাকা-কারাচি সরাসরি ফ্লাইট শুধু একটি বিমান যোগাযোগ নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার জটিল কূটনীতি ও আঞ্চলিক রাজনীতির প্রতিচ্ছবিও বহন করছে। এর ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে ভারতের সিদ্ধান্তের ওপর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















