এক অচেনা অন্ধকার থেকে ক্যামেরা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে এক নারীর কানের কাছে। অসহ্য যন্ত্রণায় সে কুঁকড়ে উঠছে, যেন মাথার ভেতর থেকে কোনো শব্দ থামছেই না। এই দৃশ্য দিয়েই শুরু হয় সিনেমা ‘বাব’। শুরুতেই দর্শক বুঝে যায়, এই ছবি সহজ কোনো গল্প বলবে না, বরং মানুষী মনের গভীর ক্ষত উন্মোচন করবে।
ওয়াহিদা একজন তালাকপ্রাপ্ত নারী, দুই সন্তানের মা। সে টিনিটাসে ভুগছে, এমন এক সমস্যা যেখানে কোনো বাহ্যিক শব্দ না থাকলেও কানে ভোঁ ভোঁ বা শিসের মতো আওয়াজ শোনা যায়। কিন্তু এই রোগ কেবল শারীরিক নয়, এটি যেন তার ভেতরের দুঃখ, শোক আর অপরাধবোধের প্রতীক। যমজ বোন নিসমার মৃত্যুর পর থেকে ওয়াহিদার জীবন ভেঙে পড়েছে। শোক তাকে এমন এক মানসিক অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে, যেখানে বাস্তব আর কল্পনার সীমারেখা ধীরে ধীরে মুছে যেতে থাকে।
পরিবারের ভেতরের টানাপোড়েন গল্পটিকে আরও গভীর করে তোলে। মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক বিষণ্ন ও কটু কথায় ভরা। সন্তানরা মায়ের অস্থির আচরণে ভীত ও বিভ্রান্ত। ঘরের কাজের নারী সুরুজি নীরবে সবকিছু প্রত্যক্ষ করে যায়, তার চোখের ভাষাই দর্শকের অনুভূতির প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। এই ঘরের ভেতর একটি সবুজ দরজা সবসময় বন্ধ, যার ভেতরে লুকিয়ে আছে অজানা রহস্য। ওয়াহিদা বিশ্বাস করতে শুরু করে, এই দরজার আড়ালেই লুকিয়ে আছে তার জীবনের সত্য।

এক সময় সে পুরোনো ক্যাসেট টেপ খুঁজে পায়, যা নিসমার মৃত্যুকে নতুন আলোয় দেখতে বাধ্য করে। প্রশ্ন উঠতে থাকে, নিসমার মৃত্যু কি সত্যিই স্বাভাবিক ছিল, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো গল্প আছে। কিন্তু ‘বাব’ কোনো সহজ থ্রিলার নয়, যেখানে হঠাৎ চমকে দেওয়ার মতো মোড় আসে। এটি বরং শোকাক্রান্ত মনের ভেতরের যাত্রা, যেখানে দুঃখ মানুষকে কতটা গভীরে টেনে নিতে পারে, সেই সত্যটাই সামনে আনা হয়।
আরবি ভাষায় ‘বাব’ অর্থ দরজা। এই দরজাই ওয়াহিদার মানসিক ভাঙনের প্রতীক। যত সে সত্যের কাছে পৌঁছাতে চায়, ততই সে নিজের ভেতরের অস্থিরতায় ডুবে যেতে থাকে। পরিচালক নায়লা আল খাজ এই যাত্রাকে দেখিয়েছেন কাঁচা ও নির্ভীক ভঙ্গিতে, কোনো সাজানো সৌন্দর্য ছাড়াই।
গল্প বলার ধরনে সরল ধারাবাহিকতা নেই। শোকের চারটি স্তরকে আলাদা ভঙ্গিতে তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে বাস্তবের সঙ্গে কল্পনার মিশেল দর্শকের মনে এক অস্বস্তিকর অথচ গভীর অনুভূতি তৈরি করে। ক্যামেরা ওয়াহিদার মুখের প্রতিটি ভাঁজ, প্রতিটি দুশ্চিন্তার রেখা নিখুঁতভাবে ধরেছে, যা চরিত্রটিকে আরও জীবন্ত করে তোলে।
এই ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি এর সুর ও শব্দ। আর রহমানের সংগীত রহস্যময় আবহ তৈরি করে ওয়াহিদার যন্ত্রণা অনুভব করায়। শব্দ পরিকল্পনায় প্রতিটি নীরবতা, প্রতিটি ক্ষুদ্র আওয়াজ সিনেমার টানটান ভাবকে আরও বাড়িয়ে দেয়। চিত্রগ্রহণে পাহাড়ি এলাকার খোলা প্রকৃতি আর ঘরের ভেতরের দমবন্ধ করা পরিবেশের বৈপরীত্য চোখে লেগে থাকে। প্রযুক্তিগত দিক থেকে ‘বাব’ আন্তর্জাতিক মানের ছবি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করে।
সবচেয়ে বড় কথা, এই সিনেমা নায়লা আল খাজর সৃজনশীলতার জয়। নারীদের কেন্দ্র করে গল্প বলার মাধ্যমে তিনি আবেগজনিত আঘাত, মানসিক যন্ত্রণা আর নীরবতার ভাষাকে নতুনভাবে তুলে ধরেছেন। সমকালীন আরব সিনেমায় ‘বাব’ এক আলাদা জায়গা তৈরি করে নেয়, যেখানে মানবমনের গভীর অন্ধকারই হয়ে ওঠে গল্পের মূল আলো।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















