বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীতে অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা এখন একটি ধারাবাহিক সংকটে রূপ নিয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়কালে দেশের বিভিন্ন নদী থেকে অন্তত ৩০১টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দিচ্ছে—নদীভিত্তিক অজ্ঞাত মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে এবং বিষয়টি জাতীয় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোথায় কত অজ্ঞাত মরদেহ মিলছে
উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর অবস্থান ও সংখ্যা বিশ্লেষণ করলে একটি বিস্তৃত ভৌগোলিক চিত্র সামনে আসে। উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর উপজেলায় আত্রাই নদী থেকে সাম্প্রতিক ঘটনায় দুই তরুণের অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। একই সময়ে মধ্যাঞ্চলের মানিকগঞ্জ জেলায় কালিগঙ্গা নদী থেকে অন্তত এক যুবকের অজ্ঞাত মরদেহ পাওয়া গেছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা জেলায় গত এক বছরে রূপসা ও কাজীবাছা নদী থেকে ৫০টির বেশি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ২০টির পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। খুলনার বটিয়াঘাটা এলাকায় কাজীবাছা নদী থেকেই একটি ঘটনায় ৫২ বছর বয়সী এক অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

মধ্যাঞ্চলের নারায়ণগঞ্জ শহরে শীতলক্ষ্যা নদী থেকেও একাধিকবার অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে একটি ঘটনায় এক যুবকের ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করা হয়, যার পরিচয় দীর্ঘ সময় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
উত্তর-মধ্যাঞ্চলের জামালপুর জেলায় হরিন্দহরা নদী থেকে এক অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়, যা ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়। দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলায় কঁচা নদী থেকে উদ্ধার হওয়া এক যুবকের মরদেহে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়, যা হত্যার আশঙ্কাকে জোরালো করে।
আত্রাই নদী: সাম্প্রতিক উদ্বেগের কেন্দ্র
দিনাজপুরের আত্রাই নদী সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। লাক্কিতলা সেতুর কাছে নদী থেকে উদ্ধার হওয়া দুই তরুণের মরদেহ স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। বয়স আনুমানিক ২৪ থেকে ২৫ বছর হওয়া এই দুই তরুণের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাথমিক ধারণা, কয়েক দিন আগে তাদের হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হতে পারে।

সংখ্যার ভাষায় সংকট
সাত মাসে উদ্ধার হওয়া ৩০১টি মরদেহের মধ্যে শতাধিক মরদেহ অজ্ঞাত থাকা প্রমাণ করে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অনেক জেলায় বছরে ৩০ থেকে ৫০টির বেশি মরদেহ নদী থেকে উদ্ধারের নজির রয়েছে। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে অনেক মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে, যা তদন্তকেও জটিল করে তুলছে।
নদী কেন অপরাধের গোপন পথ
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী এখন অপরাধীদের কাছে লাশ গোপনের সহজ মাধ্যম হয়ে উঠছে। স্রোত, চরাঞ্চল, এবং নদীপথে সীমিত নজরদারি এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে বহু হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন দীর্ঘসূত্রতায় পড়ছে এবং নিহতদের পরিবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

তদন্ত ও নজরদারি জোরদারের প্রয়োজন
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানাচ্ছে, প্রতিটি অজ্ঞাত মরদেহকে সম্ভাব্য হত্যাকাণ্ড হিসেবে ধরে তদন্ত করা হচ্ছে। তবে ক্রমবর্ধমান সংখ্যার কারণে নদীপথে নজরদারি বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং আন্তঃজেলা সমন্বিত তদন্ত আরও জোরদার করা জরুরি হয়ে উঠেছে। সময়মতো পরিচয় শনাক্ত ও অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা না গেলে নদীতে অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের এই প্রবণতা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















