দশকের পর দশক ধরে নীতিনির্ধারকেরা মনে করে এসেছেন, অবকাঠামো গড়া, শ্রমশক্তি সংগঠিত করা ও বিনিয়োগবান্ধব আর্থিক ব্যবস্থা তৈরি করলেই সমৃদ্ধি আসে। প্রকৃতিকে ধরা হয়েছে অশেষ ও বিনামূল্যের সম্পদ হিসেবে। কিন্তু বাস্তবে অর্থনৈতিক অগ্রগতি সব সময়ই পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভর করেছে—উর্বর মাটি, বিশুদ্ধ পানি ও বনভূমি মানবসভ্যতার ভিত্তি। প্রশ্ন হলো, যখন এই প্রাকৃতিক সম্পদ আর প্রাচুর্যে থাকবে না, তখন কী হবে?
বিশ্বব্যাংকের নতুন প্রতিবেদন ‘বাসযোগ্য পৃথিবীর অর্থনীতি’ দেখাচ্ছে, আজকের দিনে ভূমি, বায়ু ও পানির অবস্থা সড়ক, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির মতোই সমৃদ্ধি নির্ধারণ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পৃথিবীর ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ এখন ভূমি অবক্ষয়, দূষিত বায়ু বা পানির সংকটে বসবাস করছে। একই সঙ্গে বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ কর্মসংস্থান সরাসরি প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। প্রকৃতিতে বিনিয়োগ মানে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নতুন সমৃদ্ধির পথ খুলে দেওয়া।
প্রতিবেদন থেকে উঠে আসা পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিচে তুলে ধরা হলো।

প্রকৃতিকে সীমার বাইরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে
মানব কার্যকলাপ পৃথিবীর জীবমণ্ডলকে গভীরভাবে বদলে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা যে নয়টি গ্রহীয় সীমার কথা বলেন, তার মধ্যে ছয়টিই ইতিমধ্যে অতিক্রম করা হয়েছে। দেড়শ বছর আগে বন্য স্তন্যপায়ী প্রাণী ছিল মোট জৈবভরের প্রায় অর্ধেক। আজ তা নেমে এসেছে মাত্র পাঁচ শতাংশে। বিপরীতে মানুষ ও তাদের পালন করা প্রাণী মিলিয়ে এখন জৈবভরের ৯৫ শতাংশ। এই ভারসাম্যহীনতা প্রকৃতির সহনশীলতাকে চরমভাবে চাপে ফেলেছে।
উন্নয়ন পুনর্গঠনে শুধু অর্থ যথেষ্ট নয়
বিশ্বের অনেক দরিদ্র দেশ শিল্পায়নের আগেই পরিবেশগত সংকটে পড়ছে। একসময় ধারণা ছিল, শিল্পায়নের জন্য দূষণ অনিবার্য। কিন্তু বাস্তবতা বদলেছে। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে ৮০ শতাংশ মানুষ একই সঙ্গে ভূমি অবক্ষয়, দূষিত বায়ু ও পানির চাপের মধ্যে রয়েছে। ভূমি অবক্ষয় খাদ্যনিরাপত্তা ও জীবিকা দুর্বল করে, বায়ুদূষণ কমায় উৎপাদনশীলতা ও বাড়ায় চিকিৎসা ব্যয়, আর পানির সংকট আঘাত হানে স্বাস্থ্য, কৃষি ও জ্বালানি উৎপাদনে। উন্নয়ন বৈষম্য কমাতে হলে দারিদ্র্য ও পরিবেশ—দুটোকেই একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।
বন হলো অর্থনীতির অবকাঠামো
বন শুধু কার্বন শোষণ বা জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল নয়। বন জলচক্রের চালিকাশক্তি। বনভূমি বাতাসে আর্দ্রতা যোগায়, বৃষ্টিপাত নিয়ন্ত্রণ করে এবং মাটিতে পানি ধরে রাখে। বন উজাড় হলে বৃষ্টি কমে, খরা বাড়ে, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রতিবেদনের হিসাব বলছে, বন উজাড়জনিত বৃষ্টিপাত কমে বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতি হয়। মাটির আর্দ্রতা কমে কৃষিখাতে ক্ষতি হয় প্রায় ৩৭৯ বিলিয়ন ডলার, যা বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদনের প্রায় আট শতাংশ। প্রাকৃতিক বন খরা মোকাবিলায় বাগানভিত্তিক বনাঞ্চলের তুলনায় দ্বিগুণ কার্যকর। অর্থনীতিতে বনের প্রকৃত মূল্য এখনো যথাযথভাবে স্বীকৃত হয়নি।
দক্ষতা টেকসই উন্নয়নের নীরব শক্তি
অদক্ষতা ভূমি, বায়ু ও পানির ওপর নীরবে চাপ সৃষ্টি করছে। বিশ্বে উৎপাদিত মোট খাদ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নষ্ট হয়। ব্যবহৃত নাইট্রোজেন সারের অর্ধেকের বেশি ফসলে লাগে না, বরং পানি ও বায়ু দূষণ করে। পানির সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রায় ৩০ শতাংশ পানি নষ্ট হয়, যা গঙ্গা নদীর অর্ধেক প্রবাহের সমান। তবে দক্ষতা বাড়ানোর সুফলও স্পষ্ট। গত দশকে দক্ষতা বৃদ্ধির ফলে পানির ব্যবহার বৃদ্ধির প্রায় অর্ধেক, বায়ুদূষণ বৃদ্ধির ৬০ শতাংশ এবং ভূমি ব্যবহারের ৭০ শতাংশ চাপ সামাল দেওয়া গেছে। তবু শুধু দক্ষতা নয়, বৃত্তাকার ও পুনরুদ্ধারমুখী অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হওয়াই ভবিষ্যতের চাবিকাঠি।

বাসযোগ্য পৃথিবী কর্মসংস্থান ও জীবিকা রক্ষা করতে পারে
পরিবেশগত অবস্থা কর্মসংস্থানের পরিমাণ ও মান—দুটোকেই প্রভাবিত করে। উর্বর জমি, সুস্থ মৎস্যসম্পদ ও সমৃদ্ধ বন কৃষি, মৎস্য ও পর্যটনে কোটি মানুষের জীবিকার ভিত্তি। বিপরীতে বায়ু ও পানিদূষণ কমায় উৎপাদনশীলতা, মজুরি ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা। ধারণা করা হয়, বায়ুদূষণের কারণে বছরে প্রায় ১.২ বিলিয়ন কর্মদিবস নষ্ট হয়। তবে ইতিবাচক দিক হলো, কম দূষণকারী ও পুনরুদ্ধারমুখী খাতে বিনিয়োগ করলে প্রতি মিলিয়ন ডলারে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব। স্মার্ট সার ব্যবহারে উৎপাদন বাড়ে, দূষণ কমে এবং খরচের তুলনায় ২৫ গুণ বেশি লাভ হয়। বাজারভিত্তিক বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি বিনিয়োগের বিপরীতে ২১৫ ডলার পর্যন্ত সুফল মিলতে পারে। সহজ ও সস্তা সমাধান, যেমন পানিশোধনের ট্যাবলেট, পানিবাহিত রোগে শিশু মৃত্যুর এক-চতুর্থাংশ ঠেকাতে পারে।
এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নে তিনটি নীতি গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নাগরিকদের ক্ষমতায়ন ও সমস্যা ব্যবস্থাপনা জোরদার করা। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন খাতের নীতির মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও শেখার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। এসব নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশগুলো ভূমি, পানি, বায়ু ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে একটি সত্যিকারের বাসযোগ্য ভবিষ্যতের পথে এগোতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















