যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান জেরোম পাওয়েলকে ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের ফৌজদারি তদন্ত শুরু হওয়ায় দেশটির আর্থিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সুদের হারের স্বাধীনতা খর্ব করার চেষ্টা হিসেবেই এই পদক্ষেপকে দেখছেন সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধানরা ও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী আইনপ্রণেতাদের একটি বড় অংশ। পাওয়েল নিজেই এই তদন্তকে অজুহাত বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং বলেছেন, নীতিনির্ধারণে রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই চাপ বাড়ানো হচ্ছে।
তদন্ত শুরু ও সমন জারি
রবিবার রাতে প্রকাশ্যে আসে যে বিচার বিভাগ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সমন পাঠিয়েছে। ওয়াশিংটনের কৌঁসুলি জিনিন পিরোর অনুমোদনে এই তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ঐতিহাসিক দুটি ভবন সংস্কারে ব্যয় বেড়ে যাওয়া নিয়ে কংগ্রেসে দেওয়া পাওয়েলের বক্তব্য। বিচার বিভাগের দাবি, ব্যয়ের বিষয়ে আলোচনা এড়িয়ে যাওয়ায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে বিচার বিভাগের শীর্ষ নেতৃত্ব আগে থেকে বিষয়টি জানতেন না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

বাজারে প্রতিক্রিয়া ও সুদের হারের শঙ্কা
তদন্তের খবর ছড়িয়ে পড়তেই দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদ বেড়ে যায়। বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রানীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়বে। একই সঙ্গে স্বর্ণের দাম রেকর্ড ছুঁয়েছে, ডলার দুর্বল হয়েছে। শেয়ারবাজারে বড় ধাক্কা না লাগলেও সুদের ঊর্ধ্বগতি প্রশাসনের ভোক্তা ব্যয় স্বস্তির লক্ষ্যকে উল্টো চাপে ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের মত।
স্বাধীনতার প্রশ্নে রাজনৈতিক প্রতিরোধ
সোমবার সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধান জ্যানেট ইয়েলেন, বেন বার্ন্যাঙ্কি ও অ্যালান গ্রিনস্প্যান এক যৌথ অবস্থানে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁদের ভাষায়, নীতিনির্ধারণে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ উদীয়মান দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার লক্ষণ এবং এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। ফ্রান্স ও কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধানরাও প্রকাশ্যে সংহতি জানান। রিপাবলিকান দলের সিনেটর থম টিলিস এই পদক্ষেপকে বড় ভুল বলে অভিহিত করে তদন্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নতুন মনোনয়ন ঠেকানোর ঘোষণা দেন। লিসা মারকাউস্কি ও কেভিন ক্রেমারও স্বাধীনতা হারানোর ঝুঁকির কথা বলেন।

পাওয়েলের কড়া বক্তব্য
পাওয়েল বলেন, আইনের শাসন ও জবাবদিহির প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে এবং কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। তবে তাঁর বক্তব্য, এই নজিরবিহীন পদক্ষেপকে প্রশাসনের ধারাবাহিক হুমকি ও সুদ কমানোর চাপের প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে। তাঁর দাবি, এটি ভবন সংস্কার বা কংগ্রেসের তদারকি নিয়ে নয়, বরং জনস্বার্থে নিরপেক্ষ মূল্যায়নের ভিত্তিতে সুদের হার নির্ধারণের কারণেই ফৌজদারি হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
হোয়াইট হাউস ও কংগ্রেসের অবস্থান
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, বিচার বিভাগের পদক্ষেপ সম্পর্কে তিনি অবগত নন, তবে পাওয়েলের নেতৃত্ব নিয়ে তাঁর অসন্তোষের কথা আবারও বলেন। প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন তদন্ত প্রক্রিয়া চলতে দেওয়ার পক্ষে মত দেন। ট্রেজারি সচিব স্কট বেসেন্ট প্রশাসনকে সতর্ক করে বলেন, এই তদন্ত বাজারের জন্য জটিলতা তৈরি করতে পারে।
আগামীর সমীকরণ
পাওয়েলের মেয়াদ শেষ হবে মে মাসে, তবে গভর্নর বোর্ডে থাকার সুযোগ রয়েছে আরও কয়েক বছর। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, সাম্প্রতিক চাপ তাঁকে অবস্থানে অনড় থাকতে উৎসাহিত করতে পারে। একই সময়ে আরেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তাকে অপসারণের উদ্যোগ সুপ্রিম কোর্টে শুনানির অপেক্ষায় থাকায় দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















