দুবাইয়ের আকাশছোঁয়া টাওয়ার আর বিস্তৃত আবাসিক এলাকা এখন শুধু বিলাসের প্রতীক নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত। গত কয়েক বছরে বিশ্বজুড়ে যেখানে আবাসন বাজারে স্থবিরতা কিংবা অস্থিরতার ছাপ, সেখানে দুবাইয়ের সম্পত্তি বাজার ব্যতিক্রমী গতিতে এগোচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই উত্থান জল্পনাভিত্তিক নয়, বরং কাঠামোগত চাহিদার ফল।
জনসংখ্যা বৃদ্ধিই মূল চালিকা শক্তি
২০২০ সালের পর থেকে দুবাইয়ের জনসংখ্যা প্রায় পনেরো শতাংশ বেড়েছে। গত বছর প্রথমবারের মতো শহরের বাসিন্দা সংখ্যা চার মিলিয়ন ছাড়িয়েছে। শুধু এক বছরেই যুক্ত হয়েছে দুই লক্ষের বেশি মানুষ। তরুণ জনগোষ্ঠী এখানে বড় শক্তি, কারণ প্রায় ষাট শতাংশ বাসিন্দার বয়স পঁয়ত্রিশের নিচে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিপুল সংখ্যক প্রবাসী, যা ভাড়া ও নতুন বাড়ির চাহিদাকে স্থায়ীভাবে শক্তিশালী করছে।

দাম বাড়লেও ঝুঁকি তুলনামূলক কম
মূল্যস্ফীতির প্রভাব হিসাব করলে গত বছর দুবাইয়ে বাড়ির দাম এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বৈশ্বিক সূচকে শহরটির অবস্থান এমন কিছু মহানগরের কাতারে, যেখানে বাজারের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিয়ামি বা টোকিওর মতো শহরের তুলনায় দুবাইয়ের ঝুঁকি এখনো কম। কারণ সেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি সীমিত, কিন্তু দুবাইয়ে মানুষের আগমন অব্যাহত।
ভাড়া ও কেনাবেচার গতিপথ
গত পাঁচ বছরে ভাড়া বৃদ্ধির হার বাড়ির দামের চেয়ে বেশি ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে বিনিয়োগ চাহিদা জোরদার হওয়ায় বাড়ির দাম ভাড়াকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তবু প্রতি বর্গমিটারে দাম এখনো অনেক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কেন্দ্রের তুলনায় কম, যা দুবাইকে তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী রাখছে।

নতুন সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ, বাস্তবে ভারসাম্য
আগামী বছরে প্রায় এক লক্ষ নতুন আবাসিক ইউনিট বাজারে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত সরবরাহের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে ডেভেলপারদের মতে, বাস্তবে সব প্রকল্প সময়মতো শেষ হয় না। অনেক বড় প্রকল্প ধাপে ধাপে হস্তান্তর হয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে হিসাব করলে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে মোটামুটি ভারসাম্য থাকছে।
দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের দিকে নীতিগত ঝোঁক
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের অনুমতি দেওয়া ভিসা কর্মসূচি দুবাইয়ের আবাসন বাজারে বড় পরিবর্তন এনেছে। এর ফলে স্বল্পমেয়াদি কেনাবেচার বদলে স্থায়ী বসতির প্রবণতা বেড়েছে। লেনদেনের তথ্য বলছে, নগদ ক্রেতা এখনো শক্ত অবস্থানে, তবে নিজস্ব ব্যবহারের জন্য বাড়ি কেনা মানুষের অংশগ্রহণও বাড়ছে।
বৈচিত্র্যময় বৈশ্বিক চাহিদা

দুবাইয়ের বাজারে ক্রেতারা শুধু একটি দেশ বা অঞ্চলের নয়। দক্ষিণ এশিয়া, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সমানভাবে আগ্রহ আসছে। এই বৈচিত্র্য বাজারকে আরও স্থিতিশীল করছে, যেখানে অন্য অনেক শহরে আয়ের সঙ্গে দামের ফারাক বাড়ছে।
আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
তেলের দামের ওঠানামা এবং প্রতিবেশী শহরগুলোর প্রতিযোগিতা দুবাইয়ের জন্য চ্যালেঞ্জ। তবু বিশ্লেষকদের মতে, আগাম পদক্ষেপ, পরিষ্কার নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং তারল্য বাজারকে শক্ত ভিত দিয়েছে। পর্যটন, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও আর্থিক খাতে প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থান ও আয় বাড়াচ্ছে, যা অতিরিক্ত জল্পনা নিয়ন্ত্রণে রাখছে।
পরিচালনাই আসল পরীক্ষা
বিশ্বের অনেক শহরের জনসংখ্যা কমছে বা সামর্থ্যের সীমা তৈরি হয়েছে। দুবাইয়ের ক্ষেত্রে ঝুঁকি হঠাৎ ধস নয়, বরং সাফল্যকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা। পরিকল্পিত সরবরাহ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি বসবাস কে কেন্দ্র করে নীতি বজায় রাখতে পারলেই এই আবাসন জোয়ার টেকসই থাকবে বলে মনে করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















