বাংলাদেশে গত এক মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তত আট সদস্য হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন৷ তবে এগুলোকে সাম্প্রদায়িক রূপ দিতে রাজি নয় সরকার৷ তারা এগুলো স্রেফ হত্যাকাণ্ড হিসাবে দেখতে চায়৷
তবে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ বলছে, প্রতিটি নির্বাচনের আগে ও পরে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা যেভাবে আক্রান্ত হন, এবারও সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে৷ পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘প্রতি নির্বাচনের আগে ও পরে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ হয়৷ এবারও ব্যতিক্রম হচ্ছে না৷ ইতিমধ্যে আক্রমণ শুরু হয়ে গেছে৷ এখন এই পরিস্থিতিতে আমরা নির্ভয়ে, নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবো কিনা তা নিয়ে শঙ্কিত৷ সম্প্রতি যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তাতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে কোনো ভূমিকা রাখতে দেখা যায়নি৷ ফলে হামলাকারীরা এই সময়টাকে বেছে নিয়েছে৷ আমরা বারবার বলার পরও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে কোনো ভূমিকা রাখতে দেখা যাচ্ছে না৷ আমরা মনে করছি, পরিকল্পিতভাবে এই হামলাগুলো হচ্ছে৷’’
এক মাসে হত্যার শিকার আটজন
গত ৫ জানুয়ারি যশোরের মনিরামপুরে রানা প্রতাপ বৈরাগী নামে এক ব্যবসায়ীকে মাথায় সাত রাউন্ড গুলি করে হত্যা করা হয়৷ ওইদিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে কপালিয়া বাজারে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে৷ নিহত রানা প্রতাপ (৪৫) পার্শ্ববর্তী কেশবপুর উপজেলার আড়ুয়া গ্রামের তুষার কান্তি বৈরাগীর ছেলে৷ তিনি মনিরামপুর উপজেলার কপালিয়া বাজারের ব্যবসায়ী ছিলেন৷ এ ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে৷ স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ঘটনার সময় রানা প্রতাপ কপালিয়া বাজারে নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে (বরফকল) অবস্থান করছিলেন৷ সন্ধ্যায় কয়েকজন দুর্বৃত্ত তাকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে ডেকে নিয়ে পার্শ্ববর্তী এক গলিতে নিয়ে যায়৷ সেখানে তার মাথা লক্ষ্য করে সাত রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়৷ এতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু ঘটে৷
রানা প্রতাপের বাবা তুষার কান্তি বৈরাগী ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমার ছেলের কোনো শত্রু নেই৷ সে পারলে মানুষের উপকার করে, কোন ক্ষতি করে না৷ আমি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, আমার স্ত্রী প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করেন৷ আমার ছেলেকে হত্যার কোনো কারণ আমি খুঁজে পাচ্ছি না৷ ঘটনার পরদিন পুলিশ যোগাযোগ করেছিল, এখন আর কেউ যোগাযোগও করে না৷ ফলে কাউকে ধরেছে কিনা তাও জানি না৷ আমরা আসলে আতঙ্কের মধ্যে আছি৷’’
৭ জানুয়ারি শরীয়তপুরের ডামুড্যায় ব্যবসায়ী খোকন চন্দ্র দাস নামে একজন ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে৷ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ জানিয়েছে, ছিনতাই করতে গিয়ে আসামিরা এ ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানিয়েছেন৷ ডামুড্যা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রবিউল হক ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘ছিনতাইকারীদের চিনে ফেলায় খোকনকে হত্যা করা হয়েছে৷’’
নিহত খোকন চন্দ্র দাস ডামুড্যা উপজেলার তিলই গ্রামের পরেশ চন্দ্র দাসের ছেলে৷ তিনি কেউরভাঙা বাজারে ওষুধ ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবসা করতেন৷ গত বুধবার রাতে বাজার থেকে ফেরার পথে কনেশ্বর ইউনিয়নের তিলই এলাকায় তাকে কুপিয়ে জখম করার পাশাপাশি শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়৷ রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত শনিবার সকালে তিনি মারা যান৷
খোকন চন্দ্রের বাবা পরেশ চন্দ্র দাস তিনজনের নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা করেন৷ তিনি বলেন, ‘‘শুধু ছিনতাইয়ের জন্য এই হত্যাকাণ্ড সেটা আমাদের বিশ্বাস হচ্ছে না৷ ছিনতাই হলে তো শুধু কুপিয়ে চলে যেত, শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরালো কেন? আমরা মনে করছি, সুষ্ঠু তদন্ত হলে হত্যাকাণ্ডের আসল রহস্য বেরিয়ে আসবে৷’’
৫ জানুয়ারি নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় দোকান বন্ধ করে ফেরার পথে বাড়ির ফটকে এক ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়৷ সেদিন রাত ৯টার দিকে উপজেলার চরসিন্দুর ইউনিয়নের সুলতানপুরে এ ঘটনা ঘটে৷ নিহত ব্যক্তির নাম শরৎ চক্রবর্তী ওরফে মণি (৪০)৷ তিনি পার্শ্ববর্তী শিবপুর উপজেলার সাধারচর ইউনিয়নের উত্তর সাধারচর গ্রামের মোহন চক্রবর্তীর ছেলে৷ পলাশ উপজেলার চরসিন্দুর বাজারে পৈতৃক মুদিদোকান পরিচালনার পাশাপাশি এক্সকাভেটর (খননযন্ত্র) ভাড়া দিতেন৷ মনি চক্রবর্তীর স্ত্রী মুক্তা রানী জানিয়েছেন, ‘‘আমার স্বামীর সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল না৷ কেন তাকে এভাবে হত্যা করা হয়েছে, সেটা আমরা বুঝতে পারছি না৷ আমরা ন্যায়বিচার চাই৷’’
গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ময়মনসিংহের ভালুকার জামিরদিয়া এলাকায় ‘পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস বিডি লিমিটেড কোম্পানির’ শ্রমিক ২৮ বছর বয়সি দিপুকে দাসকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়৷ এরপর তার লাশ গাছের ডালের সঙ্গে বেঁধে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়৷
২৯ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় সহকর্মীর গুলিতে বজেন্দ্র বিশ্বাস (৪০) নামে এক আনসার সদস্য নিহত হন৷ এ ঘটনায় ঘাতক আনসার সদস্য নোমান মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ সেদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে উপজেলার মেহরাবাড়ি এলাকায় সুলতানা সুয়েটার্স লিমিটেড কারখানায় এ ঘটনা ঘটে৷ নিহত আনসার সদস্য বজেন্দ্র বিশ্বাস সিলেট সদর উপজেলার কাদিরপুর গ্রামের প্রবিত্র বিশ্বাসের ছেলে৷ আর ঘাতক নোমান মিয়া সুনামগঞ্জ জেলার তাহেরপুর থানার বালুটুরি বাজার এলাকার লুৎফর রহমানের ছেলে৷
দায়িত্বরত আনসার সদস্য এপিসি মো. আজাহার আলী জানান, ‘‘ঘটনার সময় আনসার সদস্য নোমান মিয়া ও বজেন্দ্র দাস আমার রুমে একসঙ্গে বসে ছিলেন৷ হঠাৎ বজেন্দ্র দাসের উরুতে বন্দুক (শটগান) ঠেকিয়ে ‘গুলি করে দেই’ বলেই গুলি করে দেয়৷ এরপর নোমান পালিয়ে যায়৷ কিন্তু এর আগে আমি তাদের মধ্যে কোনো বাকবিতণ্ডা বা তর্ক-বিতর্ক হতে দেখিনি৷’’
গত ২৫ ডিসেম্বর রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় চাঁদাবাজির অভিযোগে অমৃত মণ্ডল ওরফে সম্রাট (২৯) নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে৷ তিনি উপজেলার হোসেনডাঙ্গা গ্রামের অক্ষয় মণ্ডলের ছেলে৷ পুলিশের দাবি, অমৃত মণ্ডল নিজের নামে এলাকায় একটি সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে আশপাশের এলাকায় ভয়ভীতি দেখিয়ে সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও চাঁদাবাজি করতেন৷ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভারতে পালিয়ে থেকেও সম্রাট বাহিনীর মাধ্যমে এলাকায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়েছেন৷ সম্প্রতি তিনি নিজ এলাকায় ফিরে আসেন৷
৯ জানুয়ারি সুনামগঞ্জে জয় মহাপাত্র নামে এক যুবককে একটি দোকানে ডেকে নিয়ে মারধর করা হয়৷ পরে তার মুখে বিষ ঢেলে দেওয়া হয়৷ চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়৷ পরিবারের দাবি, স্থানীয় এক ব্যক্তির সঙ্গে বিবাদের জেরে তাকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়৷
৬ জানুয়ারি নওগাঁ জেলায় মিঠুন সরকার (২৫) নামে এক হিন্দু যুবকে চোর সন্দেহে ধাওয়া করে একদল মানুষ৷ প্রাণ বাঁচাতে তিনি জলাশয়ে ঝাঁপ দেন৷ সেখানে ডুবে মৃত্যু হয়েছে তার৷
শুধু ডিসেম্বরেই সংখ্যালঘুদের উপর ৫১ সহিংস হামলা
আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্ভয়ে, নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়া নিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় শঙ্কিত হয়ে পড়েছে বলে মনে করছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ৷ গত মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে সংগঠনটি এ কথা বলেছে৷ একই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার তীব্রতায় গভীর ক্ষোভ, উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে সংগঠনটি৷ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই সাম্প্রদায়িক সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে৷ এসব ঘটনায় সারা দেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী ভবিষ্যতের অজানা আশঙ্কায় ভীত হয়ে পড়েছে৷
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ বলছে, ডিসেম্বর মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর কমপক্ষে ৫১টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে৷ এর মধ্যে হত্যা ১০টি, চুরি ও ডাকাতি ১০টি, বাড়িঘর-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান-মন্দির ও জমিজমা দখল, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ ২৩টি৷ ধর্মীয় অবমাননা ও ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর দালালির মিথ্যা অভিযোগে আটক ও নির্যাতন চারটি, ধর্ষণচেষ্টা একটি, দৈহিক নির্যাতন তিনটি৷
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহেও সহিংসতার ধারা অব্যাহত রয়েছে৷ এর মধ্যে ২ জানুয়ারি লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে সত্যরঞ্জন দাসের ৯৬ শতক জমির ধান জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে৷
৩ জানুয়ারি শরীয়তপুরে কুপিয়ে ও শরীরে আগুন দিয়ে ব্যবসায়ী খোকন চন্দ্র দাসকে হত্যা করা হয়েছে৷ একই দিন ভোরে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার আমুচিয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মিলন দাসের বাড়ির সবাইকে জিম্মি করে সেখানে ডাকাতি করা হয়েছে৷ একই রকমের ঘটনা ঘটেছে একই দিন কুমিল্লার হোমনার সানু দাসের ঘরে৷ তার ঘর থেকে ১০ ভরি স্বর্ণালংকার, ১২ ভরি রুপা ও ২০ হাজার টাকা লুট করে নেওয়া হয়েছে৷ এ ছাড়া ৪ জানুয়ারি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে ৪০ বছরের এক হিন্দু বিধবা নারীকে ধর্ষণ করে তাঁকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মাথার চুল কেটে দিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ মনে করে, আগামী নির্বাচনে পছন্দের প্রার্থীকে ভোটদানে জোরপূর্বক বিরত রাখার জন্য সাম্প্রদায়িক দুর্বৃত্ত মহল এসব ঘৃণ্য কার্যকলাপ অব্যাহতভাবে সারা দেশে চালিয়ে যাচ্ছে৷ অনতিবিলম্বে তা রোধে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছে ঐক্য পরিষদ৷
সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ৯৮ শতাংশ ঘটনা রাজনৈতিক, দাবি পুলিশের
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট থেকে সংখ্যালঘুদের ওপর যেসব আক্রমণ হয়েছে প্রকৃতপক্ষে সেগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য-প্রণোদিত ছিল বলে পুলিশের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে৷ সরকার ইতোমধ্যে এসব হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেছে৷ পুলিশ গত শনিবার এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে৷ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ৯৮ শতাংশ ঘটনাই তদন্তে রাজনৈতিক বলে পাওয়া গেছে৷
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এই প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকার দেশের যে কোনো সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতি শূন্য সহিষ্ণু নীতি গ্রহণ করেছে৷ অপরাধীদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে৷ এসব হামলার শিকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেছে সরকার৷ বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ দাবি করেছে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে মোট ১ হাজার ৭৬৯টি সাম্প্রদায়িক হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে৷ এসব হামলা, ভাঙচুর এবং লুটপাটের মধ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জীবন, সম্পদ ও উপাসনালয়ের ওপর ২ হাজার ১০টি ঘটনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে৷
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের তৈরি করা অভিযোগের তালিকা সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ পুলিশ৷ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের যারা এই সহিংসতার লক্ষ্যবস্তু বলে দাবি করা হচ্ছে, পুলিশ সেসব সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করেছে৷
পুলিশ ঐক্য পরিষদের তালিকা অনুযায়ী প্রত্যেকটি স্থান, প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির কাছে গিয়ে তদন্ত করেছে৷ ১ হাজার ৭৬৯টি অভিযোগের মধ্যে, পুলিশ এখন পর্যন্ত ৬২টি মামলার প্রাথমিক তথ্য নির্ধারণ করে মামলা দায়ের করেছে৷ তদন্তের ভিত্তিতে অন্তত ৩৫ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷
তদন্তে দেখা গেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হামলাগুলো সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল না৷ বরং সেগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা হয়েছে৷ পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে ১ হাজার ২৩৪টি ঘটনা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য-প্রণোদিত এবং ২০টি ঘটনা সাম্প্রদায়িক ছিল৷ কমপক্ষে ১৬১টি অভিযোগ মিথ্যা বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে৷
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের হিসাব অনুযায়ী, মোট অভিযোগের ৮২.৮ শতাংশ বা ১ হাজার ৪৫২টি ঘটনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঘটেছে, যেদিন শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন৷
পরিষদের তথ্যমতে, ৪ আগস্ট ৬৫টি এবং ৬ আগস্ট ৭০টি ঘটনা ঘটেছে৷ এই অভিযোগগুলোর ভিত্তিতে অন্তত ৫৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে৷ এসব মামলায় মোট ৬৫ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ সব মিলিয়ে ৪ আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক হামলার অভিযোগে মোট ১১৫টি মামলা দায়ের হয়েছে এবং অন্তত ১০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷
সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতায় দায়ীদের বিচার করতে সরকার ব্যর্থ: ৩২ বিশিষ্ট নাগরিক
দেশে একের পর এক পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, ধারাবাহিক সহিংসতা, বিশেষত সংখ্যালঘু হত্যা, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনাসহ বিভিন্ন হামলার ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন ৩২ বিশিষ্ট নাগরিক৷ এসব ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে তাদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিতের দাবিও জানিয়েছেন তারা৷ গত শনিবার এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে কয়েক সপ্তাহে একের পর এক পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডসহ ধারাবাহিকভাবে সংখ্যালঘু নাগরিককে হত্যা, তাদের পরিবারের বাড়িঘরে হামলা, অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে- যা নির্বাচনের আগে দেশকে অস্থিতিশীল করার অভিপ্রায়ে করা হচ্ছে বলে জনমনে ধারণা বিরাজ করছে৷
আসন্ন নির্বাচনকে বিঘ্নিত করতে এসব কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী নাগরিকদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক দেশের ঐতিহ্যের অংশ৷ যারা এসব সহিংস সাম্প্রদায়িক হামলা বা হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে, তারা সমাজের একটি ক্ষুদ্র অংশ৷ সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদী ও রাজনৈতিক অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নাশকতা সৃষ্টিকারী৷ বিবৃতিদাতারা মনে করেন, দেশি-বিদেশি উসকানিদাতা পৃষ্ঠপোষক গোষ্ঠীও এসব ঘটনায় মদদ দিচ্ছে৷ বিবৃতিতে তারা বলেছেন, ‘‘আমরা বিস্ময় ও ক্ষোভের সঙ্গে এও লক্ষ করছি, ঘটনার দ্রুত তদন্ত এবং নাশকতা, হত্যা-হামলার জন্য দায়ীদের বিচারের কাঠগড়ায় সোপর্দ করতে সরকার বারবার ব্যর্থ হচ্ছে৷’’
বিবৃতিতে চারটি দাবি জানিয়েছেন নাগরিকেরা৷ এগুলো হলো, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ হত্যা, বাড়িঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনা এবং উসকানিদাতাদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা৷ সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, দোকানপাটসহ স্থাপনা, মন্দির, গির্জাসহ সব উপাসনালয়ের সুরক্ষা দিতে অন্তর্বর্তী সরকারকে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা৷
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীরা হলেন সুলতানা কামাল, খুশী কবির, রাশেদা কে চৌধুরী, জেড আই খান পান্না, ইফতেখারুজ্জামান, আনু মুহাম্মদ, শাহীন আনাম, ফিরদৌস আজিম, শামসুল হুদা, নুর খান, সামিনা লুৎফা, সুমাইয়া খায়ের, সুব্রত চৌধুরী, তবারক হোসেন, স্বপন আদনান, তাসনিম সিরাজ মাহবুব, রোবায়েত ফেরদৌস, জোবাইদা নাসরীন, মনিন্দ্র কুমার নাথ, পাভেল পার্থ, সালেহ আহমেদ, পারভেজ হাসেম, রেজাউল করিম চৌধুরী, শাহ ই মবিন জিননাহ, জাকির হোসেন, সাইদুর রহমান, সাঈদ আহমেদ, দীপায়ন খীসা, জবা তালুকদার, ঈশিতা দস্তগীর, মেইনথিন প্রমীলা ও হানা শামস আহমেদ৷
যাচাই বাছাই ছাড়া সাম্প্রদায়িক ইস্যুতে বিবৃতি না দেওয়ার অনুরোধ: প্রেস উইং
নরসিংদীর মনি চক্রবর্তী হত্যাকাণ্ডকে সাম্প্রদায়িক হামলা দাবি করে বিবৃতি দিয়েছিলেন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা৷ তবে হত্যাকাণ্ডটি পূর্ব শত্রুতার জেরে হয়েছিল বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার সিনিয়র সহকারী প্রেস সচিব ফয়েজ আহম্মদ৷ তার দাবি, পারিবারিক কলহ ও ব্যবসায়ের পূর্ব শত্রুতার জেরে হওয়া হত্যাকাণ্ডকে সাম্প্রদায়িক বলে অপপ্রচার চালানো হয়৷ এমন ঘটনায় বিবৃতি দেওয়ার আগে যাচাই-বাছাইয়ের অনুরোধ করেছেন ফয়েজ আহম্মদ৷ পাশাপাশি বিশিষ্টজনদের জেনে বুঝে বিবৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি৷
পরে ডয়চে ভেলেকে ফয়েজ আহম্মদ বলেন, ‘‘সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ঘটনায় একটু উদ্বেগের সঙ্গে খেয়াল করা যায়, অপপ্রচারের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টা করা হচ্ছে৷ সর্বশেষ নরসিংদীতে একজন মুদি ব্যবসায়ী হত্যার শিকার হয়েছেন৷ পুলিশ এবং পরিবারের প্রাথমিক ধারণা, তিনি পারিবারিক ও ব্যবসায়ের পূর্ব শত্রুতার জেরে খুন হয়েছেন৷ ভদ্রলোকের ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে নানান জায়গায় মিথ্যা প্রোপাগান্ডা তৈরি হয়েছিল যে, তিনি সাম্প্রদায়িক হামলায় নিহত হয়েছেন৷ ওই ঘটনার জেরে কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক বিবৃতিও দিয়েছেন৷’’
ফয়েজ আহম্মদ বলেন, ‘‘যারা বিবৃতি দিয়েছেন তাদের মধ্যে অনেককেই দেখা গেছে ইতিপূর্বে নানান ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত করেছেন৷ উনারা সে সমস্ত জায়গায় ভিজিট করেছেন৷ আমরা প্রত্যাশা করবো, কোনো ঘটনায় যদি উনাদের উদ্বেগ তৈরি হয়, তাহলে যাচাই-বাছাই করবেন৷ মিথ্যা বা বানোয়াট তথ্যের ভিত্তিতে প্রভাবিত না হয়ে বিবৃতি দেওয়ার আগে একটু যাচাই-বাছাই করবেন, প্রয়োজনে সরেজমিনে ভিজিট করবেন৷ সেখানে কোনো সাম্প্রদায়িক ইস্যু আছে কি না সেটা দেখবেন৷ মিথ্যা তথ্য ও উনাদের এই ধরণের বিবৃতি যখন এক হয়, তখন তা আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে৷’’
মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ঘটনায় আমরা কিন্তু উদ্বেগ প্রকাশ করেছি৷ এসব ঘটনায় বিচারের কোনো ব্যবস্থা করা হচ্ছে না৷ ফলে মানুষ এগুলোকে সাম্প্রদায়িক হামলা হিসেবেই দেখছে৷ কিন্তু সরকার যদি বিচারের ব্যবস্থা করত বা বিচার ব্যবস্থায় কার্যকর পদক্ষেপ আমরা দেখতাম তাহলে তো মানুষ এগুলো নিয়ে এই ধরনের কথাবার্তা বলত না৷ যে ঘটনাগুলো ঘটে গেছে, সেগুলো দেখলেই তো বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়৷ যেমন ধরুন, ময়মনসিংহে দিপু দাসকে ধর্মীয় অবমাননার দায়ে পিটিয়ে হত্যার পর শরীরে আগুন দেওয়া হলো, সেটাকে আপনি কি বলবেন? ফলে সরকারকে শুধু মুখে বললেই হবে না, দৃশ্যত কিছু করে দেখা হবে৷’’
মানবাধিকার কর্মী খুশি কবীর ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘প্রতিটি হত্যাকাণ্ডই মানবাধিকারের লংঙ্ঘন৷ কিন্তু সেই হত্যাকাণ্ডটি যদি হয় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে এবং এর বিচার না হয় তাহলে তো প্রশ্ন উঠাই স্বাভাবিক৷ শুধু এখন নয়, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে আমরা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন হতে দেখেছি, এখন সেটা আরও বেড়েছে৷ কিন্তু সরকার শুধু দুঃখপ্রকাশ করছে৷ এতে তো হবে না৷ দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে৷ সেটা তো নেওয়া হচ্ছে না৷ এখন সরকার শুধু মুখে বললো যে, এটা সাম্প্রদায়িক হামলা নয়, মানুষ তো সেটা বিশ্বাস করবে না৷ সরকারকেই কার্যকরভাবে আইন ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে সেটা সাম্প্রদায়িক ঘটনা না৷’’
বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক হামলাকে ব্যক্তিগত শত্রুতা-প্রতিহিংসা বলা হচ্ছে : ভারত
বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক হামলাকে ব্যক্তিগত শত্রুতা, প্রতিহিংসা এবং রাজনৈতিক মতভিন্নতাসহ অন্যান্য কারণে সংঘটিত ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল৷ তিনি বলেছেন, এর মধ্য দিয়ে শুধু এসব ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের উৎসাহিত করা হচ্ছে৷ গত শুক্রবার নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে এ কথাগুলো বলেন জয়সোয়াল৷
এক প্রশ্নের জবাবে রণধীর জয়সোয়াল বলেন, ‘‘আমরা বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর বাজেভাবে আক্রমণের পুনরাবৃত্তি হতে দেখছি৷ চরমপন্থিরা তাদের বাড়িতে ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা করছে৷’’
এ ধরনের ‘সাম্প্রদায়িক ঘটনাবলি’ দ্রুততার সঙ্গে ও দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা করা দরকার উল্লেখ করে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ‘‘আমরা এই সমস্যাজনক প্রবণতাও দেখছি, এ ধরনের ঘটনাগুলোকে ব্যক্তিগত শত্রুতা, ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা, রাজনৈতিক মতভিন্নতা ও অন্যান্য অপ্রাসঙ্গিক কারণে সংঘটিত বলে বলা হচ্ছে৷ এর মধ্য দিয়ে শুধু চরমপন্থী ও এসব অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের উৎসাহিত করা হচ্ছে এবং সংখ্যালঘুদের মধ্যে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে৷’’
ডিডাব্লিউ ডটকম
সমীর কুমার দে 



















