ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতার পালাবদলের পথে এবার ভিন্ন পথে হাঁটছে যুক্তরাষ্ট্র। নিকোলাস মাদুরোকে সরিয়ে দেওয়ার পর পুরো শাসনব্যবস্থা ভেঙে না দিয়ে সরকার কাঠামো বহাল রেখেই তাদের আচরণ বদলানোর কৌশল নিয়েছে ওয়াশিংটন। দীর্ঘ সাতাশ বছর ধরে গড়ে ওঠা কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থাকে এক ধাক্কায় ভেঙে না ফেলে ধীরে ধীরে নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে আনাই এখন মার্কিন প্রশাসনের লক্ষ্য।
মাদুরো অপসারণের পরও ভেনেজুয়েলার শাসকগোষ্ঠীর কট্টর নেতারা এখনো ক্ষমতায় রয়ে গেছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন এমন অনেক কর্মকর্তা, যাদের বিরুদ্ধে মাদক পাচারসহ নানা অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের মামলা রয়েছে। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলার বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির গুরুত্বও প্রকাশ্যে কমিয়ে দেখাচ্ছে ওয়াশিংটন।
নতুন কৌশলের লক্ষ্য ও যুক্তি
মার্কিন প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, লক্ষ্য হলো ভেনেজুয়েলার নেতৃত্বকে যুক্তরাষ্ট্রবান্ধব পথে ঠেলে দেওয়া, কিন্তু এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি না করা যাতে দেশটি অস্থিরতায় ডুবে যায়। ইরাক ও আফগানিস্তানে দীর্ঘ সামরিক উপস্থিতির অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রকে দেখিয়েছে, সরাসরি দখলদারিত্ব জনসমর্থন হারায় এবং বিপুল খরচ ও প্রাণহানির কারণ হয়। তাই এবার মাটিতে সেনা নামানোর পথ এড়িয়ে চলাই প্রধান বিবেচনা।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি প্রচলিত অর্থে সরকার পরিবর্তন নয়, বরং সরকার ব্যবস্থাপনা। পুরো কাঠামো ভেঙে না দিয়ে সেই কাঠামোর মধ্যেই আচরণ বদলানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। অর্থাৎ ভেনেজুয়েলাকে মুক্ত করার বদলে তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল।
ইরান ও কিউবার জন্য সম্ভাব্য দৃষ্টান্ত
এই কৌশল সফল হলে তা অন্য দেশেও প্রয়োগের দৃষ্টান্ত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ইরানে বিক্ষোভ দমন ও ধর্মতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং কিউবার দীর্ঘদিনের কঠোর কমিউনিস্ট শাসন—এই দুই ক্ষেত্রেই ভেনেজুয়েলা মডেল ভবিষ্যতে বিবেচনায় আসতে পারে।
তেল, মাদক ও ভূরাজনীতি
মাদুরো অপসারণের পর যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত কিছু বাস্তব ফল চায়। এর মধ্যে রয়েছে ভেনেজুয়েলার তেল খাত বিদেশি ও মার্কিন বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করা, যুক্তরাষ্ট্রে মাদক প্রবাহ কমানো এবং দেশটি থেকে চীন, রাশিয়া ও ইরানের প্রভাব সরিয়ে দেওয়া। গণতান্ত্রিক রূপান্তর আপাতত অগ্রাধিকারের তালিকায় নিচে রয়েছে।

এই কৌশলকে কেউ কেউ ‘রাষ্ট্র প্রশিক্ষণ’ বলেও অভিহিত করছেন। যুক্তরাষ্ট্র দৃশ্যমান পরিবর্তন চায়, কিন্তু সামরিক দখলের পথে যেতে চায় না। তাই মাটির স্থিতিশীলতার দায়িত্ব অনেকটাই বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
সাধারণ মানুষের বাস্তবতা
ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের জন্য এই পথ হয়তো রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ এড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে এতে দ্রুত গণতন্ত্র বা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের আশা অনেকটাই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। মাদুরো অপসারণের এক সপ্তাহ পরও একই দুর্নীতিগ্রস্ত কাঠামো বহাল রয়েছে, রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে সশস্ত্র আধাসামরিক গোষ্ঠী। তবে ইতিবাচক দিক হলো, সাম্প্রতিক সময়ে কয়েক ডজন রাজনৈতিক বন্দির মুক্তি।
আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা
গত কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক, আফগানিস্তান ও পানামায় সরকার উৎখাত করে নতুন শাসন গঠনের চেষ্টা করেছিল। কোথাও আংশিক সাফল্য, কোথাও দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ, কোথাও আবার পুরোনো শক্তির প্রত্যাবর্তন—এই অভিজ্ঞতাগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝিয়েছে, গণতন্ত্র রপ্তানি সহজ নয়। বিপুল অর্থব্যয় ও প্রাণহানিও দেশটির অভ্যন্তরে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
সীমাবদ্ধ শক্তির উপলব্ধি
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজের ক্ষমতার সীমা মেনে নিতে শিখছে। হয় কিছু অস্বস্তিকর শাসকের সঙ্গে সহাবস্থান করতে হবে, নয়তো অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করে নিজের শক্তি ক্ষয় করতে হবে—এই দুইয়ের মধ্যেই বেছে নেওয়ার বাস্তবতা সামনে এসেছে।
স্থল অভিযানের ঝুঁকি
পুরো ভেনেজুয়েলা নেতৃত্বকে সরাতে গেলে বড় ধরনের স্থল অভিযান প্রয়োজন হতো। এতে সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন অংশ ও মাদকচক্রের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এমন অভিযানে লক্ষাধিক সেনা লাগতে পারত, যা বর্তমান মার্কিন প্রশাসন ও জনমত কোনোটিই সমর্থন করত না।

বর্তমান চাপ ও ঝুঁকি
যদিও যুক্তরাষ্ট্র মাটিতে সেনা রাখেনি, তবু তার হাতে চাপ তৈরির অস্ত্র রয়েছে। অসহযোগী নেতাদের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক হামলার হুমকি কিংবা তেল রপ্তানি আটকে অর্থনৈতিক চাপ—সবই ব্যবহারযোগ্য। তবে এই চাপ গণতান্ত্রিক পরিবর্তনে কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
এই কৌশলের বড় ঝুঁকি হলো, যুক্তরাষ্ট্র এমন এক কঠোর গোষ্ঠীর সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলছে, যারা ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি ধ্বংস করেছে এবং দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থানে রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলা একদিকে আগের চেয়ে গণতন্ত্রের কাছাকাছি, অন্যদিকে ভেঙে পড়ার আরও কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে। মাদুরো বিভিন্ন গোষ্ঠীকে একসঙ্গে ধরে রেখেছিলেন। এখন প্রশ্ন হলো, নতুন নেতৃত্ব সেই ভারসাম্য রাখতে পারবে কি না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















