আফ্রিকার উপকূল জুড়ে বিস্তৃত সমুদ্র, নদী ও হ্রদ মানবসভ্যতার আদিকাল থেকেই জীবিকা ও খাদ্যের উৎস। তবু স্বাধীনতার পর দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে আফ্রিকার বেশিরভাগ উপকূলীয় রাষ্ট্রে মৎস্য খাত ছিল অবহেলার শিকার। ছোট আকারের জেলে সম্প্রদায়, যাদের থেকে রাজস্ব আদায় কঠিন, তারা রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পনায় খুব কম গুরুত্ব পেয়েছে। তবে সময় বদলাতে শুরু করেছে। নীল অর্থনীতি ধারণা ক্রমেই নীতিনির্ধারকদের আলোচনার কেন্দ্রে আসায় আফ্রিকার সমুদ্র আর কেবল লুটের ক্ষেত্র নয়, উৎপাদন ও টেকসই উন্নয়নের সম্ভাবনাময় ভাণ্ডার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দীর্ঘ অবহেলার ইতিহাস
আফ্রিকার উপকূলীয় অঞ্চলের সমৃদ্ধ কিন্তু নাজুক সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র যুগ যুগ ধরে মানুষের খাদ্য ও জীবিকার ভরসা। তবু বাস্তবতা হলো, কারুশিল্প ভিত্তিক মাছ ধরা ও উপকূল ঘেঁষে অর্থনৈতিক কার্যক্রম রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারে ছিল না। জেলেরা বারবার অভিযোগ করেছে, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের কণ্ঠ শোনা হয় না।

নীল অর্থনীতির দিকে নীতিগত মোড়
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমুদ্র রক্ষা ও টেকসই ব্যবহারের গুরুত্ব বাড়ছে। সেই সঙ্গে আফ্রিকার নীতিনির্ধারকরাও নীল অর্থনীতির সম্ভাবনা বুঝতে শুরু করেছেন। আফ্রিকান ইউনিয়নের নীল অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা লিন্ডা আমোরঙঘোর ওজে এত্তার মতে, বহু দেশ এখন এই খাতকে গুরুত্ব দিচ্ছে। আফ্রিকান ইউনিয়নের সহায়তায় ইতিমধ্যে ত্রিশ টিরও বেশি দেশ নীল অর্থনীতি কৌশল প্রণয়ন করেছে।
নীল অর্থনীতি বলতে শুধু মাছ ধরা নয়, বরং সমুদ্র, নদী ও হ্রদের সম্পদ ভিত্তিক সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বোঝায়। এর মধ্যে রয়েছে মৎস্য ও জলচাষ, পর্যটন, সামুদ্রিক জ্বালানি, কার্বন সংরক্ষণ এবং জীবপ্রযুক্তি। এই খাতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও বিশাল। আফ্রিকান ইউনিয়ন ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির একটি উদ্যোগ আগামী কয়েক বছরে বিপুল কর্মসংস্থান ও রাজস্ব সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়েছে।
টেকসই না হলে বিপর্যয়
নীল অর্থনীতির কেন্দ্রে রয়েছে টেকসই ব্যবহার। বিশ্বের বহু অঞ্চলে শিল্পভিত্তিক মাছ ধরা ও জলচাষ পরিবেশ ধ্বংসের নজির সৃষ্টি করেছে। আফ্রিকার সামনে এখন ভিন্ন পথে হাঁটার সুযোগ রয়েছে। নীতিমালা ও পরিকল্পনার অভাব নেই, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ও আফ্রিকান ইউনিয়নের এজেন্ডায়ও নীল অর্থনীতি অন্তর্ভুক্ত। কেনিয়া ও নাইজেরিয়ার মতো দেশে আলাদা মন্ত্রণালয় গঠিত হয়েছে। তবু বাস্তবে অনেক দেশ নিজেদের সামুদ্রিক অঞ্চলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। অবৈধ ও নিয়ন্ত্রণহীন মাছ ধরার বড় অংশই ঘটে আফ্রিকার জলসীমায়।

অবৈধ মাছ ধরা ও জেলেদের বঞ্চনা
বিদেশি ট্রলার ও যৌথ উদ্যোগের আড়ালে পরিচালিত শিল্পভিত্তিক মাছ ধরা অনেক ক্ষেত্রে আইনি হলেও টেকসই নয়। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উপকূলীয় জেলে সম্প্রদায়। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় ছোট জেলেদের প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়, অথচ বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান সহজেই সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে।
খাদ্য নিরাপত্তা ও সমুদ্র
পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলে অতিরিক্ত মাছ ধরা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। বড় ট্রলার ছোট পেলাজিক মাছ ধরে রপ্তানি করছে, ফলে উপকূলের ছোট নৌকার জেলেরা পর্যাপ্ত মাছ পাচ্ছেন না। সামুদ্রিক সম্পদ পুনর্নবীকরণযোগ্য হলেও তার জন্য সংরক্ষণ জরুরি।
এই প্রেক্ষাপটে উন্মুক্ত সমুদ্র সংরক্ষণ চুক্তি আফ্রিকার জন্য আশার আলো। এই চুক্তি আন্তর্জাতিক জলসীমায় সুরক্ষিত এলাকা গঠনের পথ খুলে দেবে। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে মাছের প্রজনন বাড়বে এবং উপকূলীয় জলেও তার সুফল পৌঁছাবে।
প্রযুক্তির নতুন ঢেউ
অতিরিক্ত মাছ ধরা রোধের পাশাপাশি প্রযুক্তির ব্যবহার ছোট জেলেদের নতুন সুযোগ দিচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকার একটি সামাজিক উদ্যোগ তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জেলেদের আয় ও টেকসই চর্চা বাড়াচ্ছে। ধরা মাছ, খরচ ও আয়ের তথ্য সংরক্ষণ করে জেলেরা যেমন নিজের ব্যবসার পরিকল্পনা করতে পারছে, তেমনি বাজারে ন্যায্য দামও পাচ্ছে।

জলচাষ ও ভবিষ্যৎ খাদ্য
আগামী কয়েক দশকে আফ্রিকার জনসংখ্যা দ্রুত বাড়বে। খাদ্য নিরাপত্তার বড় সমাধান হতে পারে মাছ। জলচাষের মাধ্যমে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ছে, আমদানি কমছে। তবে মানসম্মত খাদ্য ও পোনার অভাব, আর্থিক সহায়তার সংকট এই খাতের বড় চ্যালেঞ্জ। সৌর বিদ্যুৎ চালিত সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও সহজ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এসব সমস্যার আংশিক সমাধান দিচ্ছে।
টেকসই জলচাষের চ্যালেঞ্জ
জলচাষেও ঝুঁকি আছে। অতিরিক্ত ঘনত্বে চাষ রোগ ছড়াতে পারে এবং অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ায়। সঠিক নিয়ন্ত্রণ ও উন্নত জাতের মাছ ব্যবহারে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব, পাশাপাশি পরিবেশগত ক্ষতিও কমে। আফ্রিকার সামনে সুযোগ রয়েছে অন্য অঞ্চলের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার।

অর্থায়নের বড় প্রশ্ন
নীল অর্থনীতির পূর্ণ বিকাশের জন্য অর্থায়ন অপরিহার্য। কিছু দেশ ইতিমধ্যে নতুন ধরনের অর্থনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে, তবে ঘাটতি এখনও বড়। বিশ্বজুড়ে ক্ষতিকর ভর্তুকিতে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও আফ্রিকার এই খাতে বিনিয়োগ টানতে শক্ত নীতিগত পরিবেশ ও সচেতনতা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, আফ্রিকার নীল অর্থনীতি গড়ে তোলা সহজ কাজ নয়। নীতিগত লক্ষ্য বাস্তবে রূপ দিতে সময় লাগবে। তবে সংরক্ষণ, জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এই খাতের গুরুত্ব আর অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















