দুবাইয়ের কাঁচ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার শহরে এক ভিন্ন ভাষায় কথা বলছে গুড আর্থ। সেই ভাষা মাটি, সুতো আর শতাব্দী প্রাচীন কারুশিল্পের। গুড আর্থের প্রতিষ্ঠাতা অনিতা লালের কাছে পরিবেশগত টেকসই তার মতোই জরুরি সাংস্কৃতিক টেকসইতা। এই দর্শন নিয়েই মধ্যপ্রাচ্যে ব্র্যান্ডের প্রথম ফ্ল্যাগশিপ স্টোর চার বাগ খুলেছে দুবাইয়ে। এটি কেবল একটি দোকান নয়, বরং ইতিহাস, বাণিজ্য ও সৌন্দর্যের যৌথ উত্তরাধিকারের ওপর দাঁড়ানো এক সাংস্কৃতিক সেতু।

ভারতীয় কারুশিল্পের আধুনিক ভাষা
উনিশশো ছিয়ানব্বই সালে গুড আর্থের যাত্রা শুরু হয় একটি সহজ কিন্তু সাহসী ভাবনা নিয়ে। ভারতের কারুশিল্পকে আধুনিক জীবনে প্রাসঙ্গিক করে তোলা। সেই সময়ে ভারতীয় বিলাসিতার নিজস্ব রূপ নিয়ে খুব বেশি আলোচনা ছিল না। অনিতা লাল বিশ্বাস করতেন, ঐতিহ্য আর আধুনিকতা পরস্পরের বিরোধী নয়, বরং একে অন্যের পরিপূরক। চার বাগের মাধ্যমে সেই দর্শনই পৌঁছেছে দুবাইয়ের দর্শকদের কাছে, যারা আজ বিলাসিতাকে বাড়াবাড়ি নয়, বরং সত্যতা, কারিগরি দক্ষতা ও অর্থবহ সংযোগ হিসেবে দেখতে শিখছেন।
মাটি থেকে শেখা দর্শন
গুড আর্থের শিকড় গভীরভাবে যুক্ত ভারতের কুমোর সম্প্রদায়ের সঙ্গে। অনিতা লালের এই সম্পর্ক দূর থেকে দেখা নয়, বরং হাতে-কলমে শেখার। তিনি নিজেই কুমোর হিসেবে কাজ করেছেন, মাটির সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে, কারুশিল্প কেবল সৌন্দর্যের ফল নয়, এটি ধৈর্য, সম্মান ও ধারাবাহিকতার এক জীবন্ত প্রক্রিয়া। তাঁর ভাষায়, মাটির সঙ্গে কাজ করলে সময়কে অন্যভাবে বুঝতে শেখা যায়, শেখা যায় বিনয়।
অতীতকে জমিয়ে রাখা নয়, ভবিষ্যৎ তৈরি
অনিতা লালের কাছে সংরক্ষণ মানে অতীতকে থামিয়ে রাখা নয়। বরং একই দক্ষতাকে নতুন প্রেক্ষাপটে, নতুন ঘরে, নতুন দর্শকের সামনে তুলে ধরা। তামার পানির পাত্রকে আধুনিক জীবনে ফিরিয়ে আনা, ধূপ ও সুগন্ধির আচারকে শহুরে জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া—এই সবই প্রাচীন অভ্যাসের আধুনিক রূপ। তাঁর মতে, আচার হারিয়ে যায় না, অর্থ থাকলে তা নতুন রূপ খুঁজে নেয়।
বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত এক জীবনধারা
মৃৎশিল্প থেকে শুরু হয়ে গুড আর্থ আজ এক বহুমাত্রিক জীবনধারার ব্র্যান্ড। খাবার পরিবেশন ও সাজসজ্জা, ঘরের বস্ত্র, পোশাক, গয়না, সুস্থতা, সুগন্ধি ও ত্বক পরিচর্যা—সব ক্ষেত্রেই একই দর্শন। সুন্দর বস্তু মানেই গল্প, দায়িত্ব ও অর্থ বহন করবে। এই ভাবনাই গুড আর্থকে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক পরিসরে নিয়ে গেছে, যেখানে জাদুঘর ও নিলাম ঘরের সঙ্গে সহযোগিতা ব্র্যান্ডটির কিউরেটরিয়াল বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করেছে।
চার বাগ, এক সাংস্কৃতিক ঘোষণা
চার বাগ কোনো সাধারণ দোকান নয়। সংরক্ষণ স্থপতি অভা নারায়ণ লাম্বার নকশায় মুঘল ও পারস্য বাগানের ঐতিহ্য এখানে জীবন্ত। খিলান, হাতে খোদাই করা পাথর, জলাধার—সব মিলিয়ে কেনাকাটার জায়গা নয়, বরং থামার ও ভাবার এক পরিসর। অনিতা লালের মতে, স্থাপত্য স্মৃতি বহন করে, তাই এই ভবন যেন দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে।
ভেতরে ঢুকলে অনুভূতির এক যাত্রা শুরু হয়। গুড আর্থের বিভিন্ন সংগ্রহের পাশাপাশি রয়েছে লিভিং হেরিটেজ গ্যালারি, যেখানে জাদুঘরের বাইরে খুব কম দেখা যায় এমন দুর্লভ শিল্পকলা প্রদর্শিত। এখানে সময় ও শ্রমের মূল্য বোঝানো হয়, যাতে দর্শকের সঙ্গে বস্তুর সম্পর্ক বদলে যায়।

নারীদের অন্তর মহল ও নতুন সংলাপ
চার বাগের ভেতরে রয়েছে জেনানা, ঐতিহাসিক ভারতীয় বাড়ির নারীদের অন্তর মহল থেকে অনুপ্রাণিত এক শান্ত পরিসর। এখানে গয়না, সুগন্ধি ও আয়ুর্বেদিক ত্বক পরিচর্যা তুলে ধরা হয়েছে আচার হিসেবে, বিলাসিতা হিসেবে নয়। দুবাইয়ের জন্য বিশেষভাবে তৈরি কিছু সংগ্রহ মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতের নকশার মিলন ঘটিয়েছে। অনিতা লালের কথায়, এখানে ভারতকে হুবহু বসানো নয়, বরং সংলাপ তৈরি করা হয়েছে।
সাংস্কৃতিক টেকসইতার চর্চা
গুড আর্থের টেকসইতার ধারণা কাঁচামালেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি কারিগরের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক, ন্যায্য পারিশ্রমিক ও দক্ষতার ধারাবাহিক উন্নয়ন। দেশি তুলা, প্রাকৃতিক রং, পুনর্ব্যবহৃত ধাতু, টেকসই কাঠ ও পাথর—সবই দীর্ঘ স্থায়িত্বের জন্য। প্লাস্টিক মুক্ত প্যাকেজিং থেকে ছোট পরিসরে উৎপাদন, প্রতিদিনের সিদ্ধান্তেই এই দর্শন বাস্তবায়িত।

দুবাই কেন
ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক বহু পুরোনো। বস্ত্র, মসলা, অলংকরণে এই যোগ আজও স্পষ্ট। দুবাইয়ের মানুষ বিলাসিতাকে লোগোর চেয়ে গভীর অর্থে বোঝেন। চার বাগ তাই এক আশ্রয়, যেখানে ধীরতা, গল্প ও সময়ের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হয়।
শেষ নয়, এক নতুন শুরু
চার বাগ গুড আর্থের মধ্যপ্রাচ্য যাত্রার শুরু মাত্র। এখানে উদ্দেশ্য অনুকরণ নয়, বরং অন্তর্ভুক্তি। এই স্থানে বিলাসিতা মানে সংযম, গভীরতা ও স্থায়িত্ব। উচ্চতার শহরে গুড আর্থ মনে করিয়ে দেয়, সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সৌন্দর্য কখনো চিৎকার করে না, নীরবে কথা বলে, আর থেকে যায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















