আফ্রিকার উপকূলঘেঁষা অর্থনীতি যখন নতুন দিশা খুঁজছে, তখন আশার আলো দেখাচ্ছে ব্লু কার্বন প্রকল্প। ম্যানগ্রোভ বন, সামুদ্রিক ঘাস আর লবণাক্ত জলাভূমি রক্ষা ও পুনরুদ্ধারের বিনিময়ে কার্বন ক্রেডিট বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহের এই উদ্যোগ আফ্রিকার উপকূলীয় সম্পদ রক্ষায় বড় সুযোগ হিসেবে উঠে আসছে।
কেন ব্লু কার্বন এত গুরুত্বপূর্ণ
ম্যানগ্রোভ বনকে বলা হয় প্রকৃতির শক্তিশালী কার্বন শোষক। গভীর ও ঘন শিকড়ের কারণে এই বন মাটির ভেতর বিপুল পরিমাণ কার্বন আটকে রাখতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিণত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনের তুলনায় ম্যানগ্রোভ প্রায় দশ গুণ বেশি কার্বন ধরে রাখতে সক্ষম। শুধু তাই নয়, এই বন উপকূল ভাঙন ঠেকায়, বন্যা থেকে রক্ষা করে এবং অসংখ্য মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীর আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে।

সংকটে আফ্রিকার ম্যানগ্রোভ
তবে বাস্তবতা ভিন্ন। আফ্রিকা জুড়ে ম্যানগ্রোভ দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, নাইজার ডেল্টায় প্রায় তিন দশকে এক চতুর্থাংশের বেশি ম্যানগ্রোভ বন বিলুপ্ত হয়েছে। অতিরিক্ত মাছ ধরা, শিল্প দূষণ আর জীবিকার সংকট উপকূলীয় মানুষকে ম্যানগ্রোভ কাঠ কাটার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
উপকূলীয় জীবিকার বাস্তব চিত্র
সিয়েরা লিওনের উপকূলীয় এলাকায় জীবিকা পুরোপুরি নির্ভরশীল মাছ ধরার ওপর। কিন্তু বড় বাণিজ্যিক ট্রলারের কারণে মাছের মজুত কমে যাওয়ায় মানুষ রান্না, মাছ শুকানো ও নির্মাণকাজে ম্যানগ্রোভ কাঠ ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। এই চক্র ভাঙতে পশ্চিম আফ্রিকা ব্লু নামের একটি প্রকল্প স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কাজ শুরু করেছে। কাদা দিয়ে তৈরি চুলা ব্যবহার করে কাঠের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে, পাশাপাশি আধুনিক মাছ শুকানোর ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

আয়ের ভাগ আর কমিউনিটির ভূমিকা
ব্লু কার্বন প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণের ওপর। সাধারণত কার্বন ক্রেডিট বিক্রির আয় তিন ভাগে ভাগ হয়। এক অংশ যায় প্রকল্প উন্নয়নকারী ও বিনিয়োগকারীদের কাছে, এক অংশ পায় সরকার এবং বাকি অংশ সরাসরি যায় উপকূলীয় কমিউনিটির উন্নয়নে। ঘানার কেটা লেগুনে পরিচালিত একটি প্রকল্পে আয়ের প্রায় এক তৃতীয়াংশ রাখা হচ্ছে কমিউনিটি ট্রাস্ট ফান্ডে, যার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন স্থানীয়রাই।
ঘানার অগ্রগতি ও বিনিয়োগের বাস্তবতা
স্পষ্ট জমি মালিকানা আর শক্ত আইন কাঠামোর কারণে ঘানা ব্লু কার্বন প্রকল্পে এগিয়ে আছে। সেখানে ইতিমধ্যে শত শত কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে এবং ম্যানগ্রোভ রোপণ ও পরিচর্যার পাশাপাশি মাছ চাষের মতো বিকল্প জীবিকাও গড়ে উঠছে। এই প্রকল্পের কার্বন ক্রেডিট প্রতি টনের দাম বনভিত্তিক অনেক প্রকল্পের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি, যা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়াচ্ছে।

প্রকৃতির দামে ভবিষ্যৎ সুরক্ষা
কার্বন বাজার নিয়ে বিতর্ক থাকলেও অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, প্রকৃতিকে অর্থনৈতিক মূল্য না দিলে তা রক্ষা করা সম্ভব নয়। ম্যানগ্রোভের আর্থিক মূল্য নির্ধারণ না হলে সেগুলো সহজেই কেটে ফেলা হবে। ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও কার্বন বাজারই এখন উপকূলীয় মানুষের হাতে অর্থ পৌঁছানোর কার্যকর উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
টেকসই নীল অর্থনীতির স্বপ্ন
এই উদ্যোগের চূড়ান্ত লক্ষ্য শুধু কার্বন শোষণ নয়, বরং একটি টেকসই নীল অর্থনীতি গড়ে তোলা। ম্যানগ্রোভ ফিরলে মাছের আবাসস্থল শক্তিশালী হবে, জীবিকা ফিরবে উপকূলে, আর প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে তৈরি হবে এক ইতিবাচক পরিবেশগত চক্র।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















