ইরানের রাজধানী তেহরানসহ দেশজুড়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে সহিংসতা যখন প্রতিদিনই প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে, তখন দক্ষিণ কোরিয়ায় বসবাসরত ইরানি নাগরিকেরা কোরিয়া সরকার ও সাধারণ মানুষের কাছে সরাসরি পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষায়, নীরবতা এখন আর নিরপেক্ষতা নয়, বরং নিপীড়নের পক্ষে দাঁড়িয়ে যাওয়ার শামিল।
কোরিয়ার নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন
ছয় বছর ধরে কোরিয়ায় বসবাসরত ইরানি নাগরিক নিউশা বলেন, মানবিক মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করেই তিনি কোরিয়াকে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন তাঁর কাছে বিস্ময়কর লাগছে, একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়েও কোরিয়া কীভাবে চুপ করে থাকতে পারে, যখন ইরানের মানুষ রাস্তায় রাস্তায় নিহত হচ্ছে। তাঁর মতে, কানাডা, ফ্রান্স ও জার্মানির মতো দেশ যেখানে কূটনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেছে, সেখানে সিউলের সতর্ক নীরবতা হতাশাজনক।

গণতন্ত্রের ইতিহাস থেকেই দায়বদ্ধতা
আরেক ইরানি নাগরিক, যিনি সারাহ নামে পরিচিত হতে চান, আট বছর ধরে কোরিয়ায় রয়েছেন। তিনি বলেন, ত্যাগ আর রক্তের বিনিময়ে কোরিয়া নিজেই গণতন্ত্র অর্জন করেছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই কোরিয়ার উচিত দর্শক হয়ে না থাকা। তাঁর আহ্বান, কোরিয়া সরকার ও নাগরিক সমাজ যেন স্বাধীনতার দাবিতে লড়াই করা ইরানি জনগণের পাশে দাঁড়ায়, কোনো দমনমূলক শাসনের পাশে নয়।
কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের দাবি
দশ বছর ধরে কোরিয়ায় থাকা লায়লা বলেন, কোরিয়া যে ন্যূনতম কাজটি করতে পারে তা হলো ইরানের বর্তমান সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা। তাঁর মতে, কোরিয়ায় ইরানি দূতাবাস বন্ধ করা এবং তেহরান থেকে কোরিয়ান দূতাবাস প্রত্যাহার করাই হবে স্পষ্ট বার্তা।
প্রতিবাদ নয়, বিপ্লব
এই আন্দোলনকে শুধু অর্থনৈতিক দাবি নিয়ে প্রতিবাদ হিসেবে তুলে ধরাকে বড় ভুল বলে মনে করছেন ইরানিরা। সারাহ বলেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন বিক্ষোভ নয়, এটি একটি সর্বজনীন বিপ্লব। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে যে ব্যবস্থা মানুষের কণ্ঠরোধ করেছে, তার বিরুদ্ধে সারাদেশের প্রত্যাখ্যানই এখন রাস্তায় রাস্তায় ফুটে উঠছে।

অতীতের দমন আর বর্তমানের পুনরাবৃত্তি
বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তাঁরা মিল খুঁজে পাচ্ছেন অতীতের ঘটনাগুলোর। দুই হাজার উনিশ সালের জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি বিরোধী আন্দোলন কিংবা দুই হাজার বাইশ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া নারী জীবন স্বাধীনতা আন্দোলনেও একইভাবে দমন নেমে এসেছিল। প্রতিবারই ইরান সরকার ইন্টারনেট ও যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়েছিল, যাতে সহিংসতার প্রকৃত চিত্র বাইরের দুনিয়ায় না পৌঁছায়।
গোয়াংজুর স্মৃতি আর তেহরানের বাস্তবতা
লায়লা কোরিয়ার গোয়াংজু গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে ইরানের বর্তমান বাস্তবতার তুলনা টানেন। তাঁর ভাষায়, ইরানের তরুণরা বন্দুকের মুখে দাঁড়িয়ে ঠিক সেই স্বাধীনতার দাবিতেই স্লোগান দিচ্ছে, যার জন্য একসময় কোরিয়ার মানুষ লড়েছিল। একনায়কতন্ত্রের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে গড়া দেশ হিসেবে কোরিয়ার নৈতিক দায়িত্ব চোখ ফিরিয়ে না নেওয়া।

নীরবতার ভেতর লুকোনো মৃত্যু
বর্তমানে ইরানে আংশিকভাবে কিছু আন্তর্জাতিক ল্যান্ডলাইন চালু হলেও ইন্টারনেট কার্যত বন্ধ। সরকারি হিসাবে হতাহতের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার বলা হলেও, ফার্সি ভাষার গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাব বলছে সংখ্যা বারো হাজারের কাছাকাছি। খণ্ডিত ফোনকল আর দুর্বল যোগাযোগের মাধ্যমে কোরিয়ায় থাকা ইরানিরা এমন সব গল্প শুনছেন, যা শিরোনামে আসে না। নিউশা বলেন, অনেক পরিবারকে স্বজনের মরদেহ পেতে বিপুল অর্থ দিতে হচ্ছে, কোথাও আবার জানাজাও করতে দেওয়া হচ্ছে না, রাতের আঁধারে লাশ দাফন করা হচ্ছে পরিবারের অজান্তে।
আমাদের কণ্ঠস্বর হন
এই তিনজনের কথায় একটি অনুরোধই সবচেয়ে বেশি ফিরে আসে। ইরানের ভেতর থেকে বারবার যে বার্তা আসছে, তা খুব সরল। আমাদের কণ্ঠস্বর হন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















