মিয়ানমারে চলমান সাধারণ নির্বাচনের ব্যালটে তাঁর নাম নেই, প্রচারপোস্টারেও নেই কোনো ছবি। তবু পুরো নির্বাচনের ওপর ছায়া ফেলে আছেন এক ব্যক্তিই—সামরিক জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং। দুই হাজার একুশ সালের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নোবেলজয়ী অং সান সু চির নির্বাচিত সরকার উৎখাতের পর থেকেই দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্রে এই জেনারেল। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে গৃহযুদ্ধ, আন্তর্জাতিক চাপ আর অভ্যন্তরীণ ভাঙনের মধ্যেও কীভাবে তিনি ক্ষমতা আঁকড়ে আছেন, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
ক্ষমতার ভিত মজবুত রাখতে নির্বাচন
নির্বাচনের প্রথম ধাপের ভোট গণনার সময় নববর্ষের ভাষণে মিন অং হ্লাইং বলেছেন, তিনি পরবর্তী সরকারের হাতে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব তুলে দিতে চান। তবে বাস্তবে এই নির্বাচনকে বিরোধীশূন্য বলেই মনে করছেন অনেকেই। অং সান সু চির দল বিলুপ্ত, বড় বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে নেই। জাতিসংঘ ও পশ্চিমা মানবাধিকার সংগঠনগুলো একে অবাধ ও সুষ্ঠু মানতে নারাজ। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন এখানে গণতন্ত্র নয়, বরং ক্ষমতা ভাগাভাগির এক কৌশল, যাতে দায় ছড়িয়ে দিয়ে জান্তার ভেতরের ঐক্য টিকিয়ে রাখা যায়।

রাজনীতি ও ভয়ের মিশ্রণ
মিন অং হ্লাইংকে অনেকেই কঠোর সামরিক শাসক হিসেবে চেনেন। তবে ঘনিষ্ঠদের মতে, তিনি একই সঙ্গে সূক্ষ্ম রাজনৈতিক খেলোয়াড়। সামরিক পরাজয়, সীমান্ত অঞ্চলে বিদ্রোহীদের অগ্রগতি আর সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষয়ে গেলেও তিনি অভিজাত শ্রেণির সঙ্গে সমঝোতা করে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন। অভ্যুত্থানের পর থেকে সহিংসতায় নিহত বেসামরিক মানুষের সংখ্যা এক লাখের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা জানিয়েছে। এই রক্তক্ষয়ী বাস্তবতায় সরাসরি একক শাসনের বদলে নির্বাচনের পথে হাঁটা তাঁর জন্য চাপ কমানোর উপায় হয়ে উঠেছে।
জেনারেলদের মধ্যে ভারসাম্য
ক্ষমতার ভেতরের বিরোধ দমন করতেও কৌশলী মিন অং হ্লাইং। একদিকে সামরিক ঘনিষ্ঠ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে কিছু জেনারেলকে বসিয়ে সুবিধা দিয়েছেন, অন্যদিকে সম্ভাব্য উত্তরসূরিসহ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে আটক বা সামরিক আদালতে তুলেছেন। এতে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীরা নিয়ন্ত্রণে থেকেছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে তিনি রেখেছেন বিশ্বরাজনীতি বোঝেন এমন অনুগত ব্যক্তিদের, যাতে কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা কিছুটা কাটানো যায়।

চীনের সমর্থন ও কূটনৈতিক পথ
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে উঠেছে চীন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সীমান্ত এলাকায় জান্তার কিছু সামরিক সাফল্যের পেছনেও এই সমর্থনের ভূমিকা আছে বলে ধারণা করা হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া সাবেক জাতিসংঘ দূত থান সোয়ে মিন অং হ্লাইংকে কূটনৈতিক মঞ্চে ফেরাতে কাজ করছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোটের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টাও চলছে।
রাজনীতির প্রতি আগ্রহের শেকড়
অভ্যুত্থানের আগেও মিন অং হ্লাইংয়ের রাজনীতির প্রতি আগ্রহ ছিল স্পষ্ট। সেনাপ্রধান থাকাকালীনও তিনি নিয়মিত ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করতেন। তাঁর জীবনপথও সেই মানসিকতার পরিচয় দেয়। ইয়াঙ্গুনে আইন বিষয়ে পড়াশোনা, পরে প্রতিরক্ষা একাডেমি থেকে স্নাতক, সীমান্ত অঞ্চলে দায়িত্ব পালন—সব মিলিয়ে তিনি নিজেকে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবেই দেখেছেন। নির্বাচনে সু চির দলের ভরাডুবির পর তিনি নিজেকে অভ্যুত্থানের নৈতিক অধিকারী মনে করেছিলেন বলেই ঘনিষ্ঠ মহলের ধারণা।

সু চি প্রসঙ্গ ও কঠোর অবস্থান
অং সান সু চি বর্তমানে বিভিন্ন অভিযোগে সাতাশ বছরের সাজা ভোগ করছেন। তাঁর অবস্থান ও স্বাস্থ্যের বিষয়ে জান্তা স্পষ্ট কিছু জানায়নি। আন্তর্জাতিক মহল থেকে মুক্তির আহ্বান এলেও মিন অং হ্লাইং এ বিষয়ে কোনো আপস করতে রাজি নন। এটি তাঁর কাছে অতিক্রম করা যাবে না এমন সীমারেখা।
ক্ষমতা হস্তান্তর না রূপ বদল
ভোট দেওয়ার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নে মিন অং হ্লাইং বলেছেন, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা নন, তাই সরাসরি কিছু বলতে চান না। তবে ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, তিনি সেনাপ্রধানের পদে উত্তরসূরি বসিয়ে নিজে পুরোপুরি রাজনৈতিক ভূমিকায় যেতে পারেন। নতুন সরকার আসবে, কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতার কাঠামো খুব বেশি বদলাবে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। সামরিক সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা থাকলেও সেনাবাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যৎ নেতৃত্বেও সু চি বা প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতি নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম। ব্যক্তিগতভাবে মিন অং হ্লাইংকে পছন্দ না করলেও সেনাবাহিনীর ভেতরের অনেকেই বিদ্রোহকে সমর্থন করেন না। ফলে যুদ্ধ, নির্বাচন আর ভয়ের রাজনীতির মধ্যেই মিয়ানমারের ক্ষমতার খেলা চলতে থাকবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















