ইরানে চলমান অর্থনৈতিক সংকট ও গণবিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে বিশ্ব অপরিশোধিত তেলের বাজারে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মুদ্রা সংকট ও অর্থনৈতিক ভাঙনের জেরে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসকদের জন্য কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিক্ষোভ দমনে কঠোর অভিযান পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। এই অবস্থায় তেল ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, ইরানে অস্থিরতা বাড়লে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে অথবা দেশটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীতে কড়াকড়ি আরোপ করতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও বৈশ্বিক উদ্বেগ
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের কারণে। ওয়াশিংটন থেকে জানানো হয়েছে, ইরান ইস্যুতে শক্ত পদক্ষেপের বিকল্প খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপ কিংবা ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালীতে চলাচল সীমিত হলে বিশ্ব তেলের বাজারে বড় ধাক্কা আসতে পারে। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক ঘোষণাও ঝুঁকি বাড়িয়েছে, যা ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যে জড়িত দেশগুলোর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

ইরানের তেল শিল্পের বাস্তব চিত্র
দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও বিদেশি বিনিয়োগের ঘাটতির কারণে ইরানের তেল শিল্পের প্রভাব আগের তুলনায় কমেছে। বর্তমানে দেশটি বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় তিন শতাংশ তেল উৎপাদন করে, দৈনিক উৎপাদন প্রায় তেত্রিশ লক্ষ ব্যারেল। একসময় বিশ্ব তেল বাজারে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা ইরান বিংশ শতাব্দীর শুরুতে তেল শিল্প গড়ে তোলে এবং পরে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয়। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে দেশটি বৈশ্বিক উৎপাদনের বড় অংশ জোগান দিত। তবে বিপ্লবের পর বিদেশি কোম্পানি বিতাড়নের ফলে উৎপাদন ও বিনিয়োগে বড় ধস নামে, যা আর পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
চীনের ওপর নির্ভরশীল রপ্তানি
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরান এখন প্রায় সম্পূর্ণভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল। দেশটির প্রায় নব্বই শতাংশ অপরিশোধিত তেল চীনে যায়, তা-ও বড় ছাড়ে। সরকারি হিসাবে এই আমদানির তথ্য স্পষ্ট না হলেও জটিল বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক ও পুরোনো ট্যাংকারের মাধ্যমে এই তেল পরিবহন চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই পথে রপ্তানি বেড়ে বহু বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব
হরমুজ প্রণালী আরব উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা একটি সংকীর্ণ জলপথ। এই পথ দিয়েই প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। ইরান আগেও জানিয়েছে, উত্তেজনা বাড়লে তারা নৌ অবরোধ আরোপের সক্ষমতা রাখে। এই প্রণালীতে বিঘ্ন ঘটলে ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্বালানি রপ্তানি ঝুঁকিতে পড়বে। প্রতিদিন প্রায় এক কোটি পঁয়ষট্টি লক্ষ ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে যায়। যদিও কিছু দেশ বিকল্প পাইপলাইনের মাধ্যমে আংশিকভাবে রপ্তানি চালু রাখতে পারে, তবুও দীর্ঘমেয়াদি বন্ধের প্রভাব এশিয়ামুখী তেল সরবরাহে বড় ধাক্কা দেবে।
বাজারে সম্ভাব্য প্রভাব
ইতিপূর্বে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়লে ট্যাংকার ভাড়ার হার হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার নজির রয়েছে। ইরান সংকট আরও তীব্র হলে তেলের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















