হলিউডের প্রলোভন, বড় বাজেটের প্রস্তাব কিংবা পরিচিত ছকে আটকে থাকার চাপ—কোনোটিকেই গুরুত্ব দেননি তিনি। নিজের বিশ্বাস, রাজনৈতিক অবস্থান আর অভিনয় বাছাইয়ের প্রশ্নে আপসহীন থেকেছেন ব্রাজিলীয় অভিনেতা ওয়াগনার মৌরা। আর সেই জেদই শেষ পর্যন্ত তাঁকে এনে দিয়েছে বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গনের বড় স্বীকৃতি। ব্রাজিলের রাজনৈতিক থ্রিলার সিনেমা ‘দ্য সিক্রেট এজেন্ট’-এ অভিনয়ের জন্য এবার গোল্ডেন গ্লোব জিতেছেন তিনি।
দ্য সিক্রেট এজেন্ট ও একাত্তরের ছায়া
১৯৭৭ সালের ব্রাজিলের সামরিক শাসনের প্রেক্ষাপটে নির্মিত ‘দ্য সিক্রেট এজেন্ট’ সিনেমাটি এক অস্থির সময়ের গল্প। শুরুতেই বলা হয়, এটি ছিল এক ধরনের দুষ্টুমি আর বিদ্রুপের সময়। পর্তুগিজ শব্দ ‘পিরাসা’ দিয়ে যে মানসিকতার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, সেটি অনেকটা নিষেধ জেনেও কাজটি করে ফেলার সাহস। ওয়াগনার মৌরা নিজেই স্বীকার করেন, এই দুষ্টু জেদ তাঁর মধ্যেও আছে।

এই সিনেমায় তিনি অভিনয় করেছেন আরমান্দো চরিত্রে। একজন বিধবা বাবা, যিনি সামরিক শাসনের সময় রাষ্ট্রের চোখে শত্রু হয়ে ওঠেন। তিনি কোনো সশস্ত্র বিদ্রোহী নন, বরং একজন সাবেক অধ্যাপক, যিনি দুর্নীতির সঙ্গে আপস করতে রাজি নন। নিজের পরিচয় বদলে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে বেড়ানো এই মানুষটির ভয়, সংযম আর মানবিক চোখের ভাষাই সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি।
হলিউডে না বলার সাহস
নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘নারকোস’-এ পাবলো এস্কোবার চরিত্রে অভিনয়ের পরই মৌরা বিশ্বজুড়ে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। তখন তাঁর সামনে খুলে যায় একের পর এক বড় প্রস্তাবের দরজা। কিন্তু তিনি সেসব ফিরিয়ে দেন। তাঁর মতে, লাতিন অভিনেতা মানেই নির্দিষ্ট ছাঁচে বাঁধা চরিত্র—এই ধারণা তিনি ভাঙতে চেয়েছিলেন। এ নিয়ে নিজের এজেন্টদের সঙ্গেও বহুবার দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন তিনি।
মৌরা স্পষ্ট করে বলেন, তিনি টাকা কিংবা শুধু জনপ্রিয়তার জন্য কাজ করতে চাননি। তিনি এমন চরিত্রই বেছে নিতে চেয়েছেন, যেগুলো তাঁর বিশ্বাস আর মানসিকতার সঙ্গে যায়। সেই কারণেই ‘দ্য সিক্রেট এজেন্ট’-এর মতো আলাদা, রাজনৈতিকভাবে স্পষ্ট একটি সিনেমায় তাঁর উপস্থিতি।

পুরস্কারের মঞ্চে ব্রাজিলের প্রতিনিধি
এই সিনেমার জন্য শুধু গোল্ডেন গ্লোব নয়, কান চলচ্চিত্র উৎসব এবং নিউইয়র্কের চলচ্চিত্র সমালোচকদের কাছ থেকেও সেরা অভিনেতার স্বীকৃতি পেয়েছেন মৌরা। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এবার তাঁর অস্কার মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও, টিমোথি শ্যালামে কিংবা মাইকেল বি জর্ডানের মতো নামের পাশে উচ্চারিত হচ্ছে ওয়াগনার মৌরার নাম।
পরিচালক ক্লেবার মেন্ডোসা ফিলিও শুরু থেকেই এই চরিত্রে মৌরাকেই ভেবেছিলেন। তাঁর ভাষায়, মৌরার শক্তি তাঁর ধারাবাহিকতা আর স্পষ্ট অবস্থানে। রাজনীতি, শিল্প আর ব্যক্তিগত মূল্যবোধ—সবকিছুর মধ্যেই এই স্থিরতা কাজ করে।
রাজনীতি, সমালোচনা ও ব্যক্তিগত বিশ্বাস
ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর শাসনামলে ডানপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধে সরব ছিলেন মৌরা। এর মূল্যও দিতে হয়েছে তাঁকে। সামাজিক মাধ্যমে আক্রমণ, দেশজুড়ে বিতর্ক আর ঘৃণার মুখে পড়তে হয়েছে। তবু তিনি পিছু হটেননি। তাঁর ভাষায়, যা ঠিক মনে করেছেন, সেটাই বলেছেন, ফল যাই হোক না কেন।

এই অভিজ্ঞতার সঙ্গেই ‘দ্য সিক্রেট এজেন্ট’-এর গল্পের মিল খুঁজে পান তিনি। রাষ্ট্রের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো একজন সাধারণ মানুষ কীভাবে শত্রুতে পরিণত হয়, সেই যন্ত্রণা তিনি ব্যক্তিগতভাবেও অনুভব করেছেন বলে জানান।
দেশপ্রেম আর সমালোচনার সহাবস্থান
সবকিছুর পরও ব্রাজিলের প্রতি গভীর ভালোবাসা রয়েছে মৌরার। সোপ অপেরা থেকে শুরু করে ‘এলিট স্কোয়াড’-এর মতো জনপ্রিয় কাজ—সব মিলিয়ে দেশেই তিনি তারকা। ব্রাজিলের বৈচিত্র্য, মানুষের উষ্ণতা আর সংস্কৃতির প্রশংসা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ব্রাজিলিয়ান হওয়ার কোনো একক চেহারা নেই। সবাই ব্রাজিলিয়ান হতে পারে।
তবে একই সঙ্গে তিনি দেশের সহিংসতা, এলিটবাদ, নারীবিদ্বেষ আর সমকামিতা বিরোধী বাস্তবতার কঠোর সমালোচনাও করেন। তাঁর মতে, এসব দুর্বলতাকেই রাজনীতিবিদরা কাজে লাগায়।

আপস নয়, নিজের পথেই সাফল্য
পুরস্কার মৌসুমে যখন প্রচারণায় ব্যস্ত থাকার কথা, তখনও মৌরা ব্রাজিলের সালভাদোরে নাটকের মঞ্চে সময় দিয়েছেন। অনেকেই তাঁকে এই সুযোগ ছাড়তে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি রাজি হননি। তাঁর স্পষ্ট কথা, তিনি আপস করেন না।
ভবিষ্যতে হলিউডে আরও কাজ এলেও তিনি চান, তাঁকে তাঁর এই স্বভাবের জন্যই নেওয়া হোক, বদলে ফেলার জন্য নয়। তাঁর মতে, সাফল্য তখনই আসে, যখন আপনি যা করে এসেছেন, সেটার দিকেই হঠাৎ করে সবাই নজর দিতে শুরু করে।


সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















