গাজা উপত্যকার ধ্বংসস্তূপের মধ্যে কিছুদিন আগেও সামান্য আশার আলো দেখা যাচ্ছিল। দীর্ঘ যুদ্ধের পর খাদ্য সরবরাহ কিছুটা বাড়ছিল, সীমান্ত দিয়ে সীমিতভাবে মানুষ চিকিৎসার জন্য বের হওয়ার সুযোগ পাচ্ছিল, আর যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষ অন্তত রমজানে দুই বেলা খাবারের আশা করতে পারছিল। কিন্তু নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনা শুরু হওয়ায় সেই আশাও আবার ভেঙে পড়েছে। গাজার মানুষের জন্য শুরু হয়েছে অনিশ্চয়তার আরেকটি অধ্যায়।
সীমান্ত বন্ধ, আবার থমকে গেল স্বস্তির আভাস
গাজার বাসিন্দা নাজেহ হিলিসের জীবন যুদ্ধের ভয়াবহতার প্রতীক। নয় মাস আগে এক বিমান হামলায় দেয়াল ধসে পড়ে তার মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত লাগে। চিকিৎসা না পাওয়ায় তিনি দাঁড়াতেও পারেন না। তবুও ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে তিনি প্রথমবারের মতো সামান্য স্বস্তি অনুভব করেছিলেন। শরণার্থী শিবিরের কাছে বাজারে কিছুটা চিনি ও আটা পাওয়া যাচ্ছিল, একটি মানবিক সংস্থা প্রতিদিন ইফতারের জন্য ভাত ও সামান্য মুরগি দিচ্ছিল।
সবচেয়ে বড় আশা ছিল সীমান্ত আংশিক খোলার সিদ্ধান্ত। দুই বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো কিছু অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসার জন্য গাজা থেকে বের হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। হিলিস ও তার স্ত্রীও সেই তালিকায় নাম ওঠার অপেক্ষায় ছিলেন।
কিন্তু ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে নতুন সামরিক সংঘাত শুরু হলে সীমান্ত আবার বন্ধ হয়ে যায়। খাদ্যবাহী ট্রাক ঢোকা বন্ধ হয়, আর অসুস্থ মানুষদের বের হওয়ার পথও বন্ধ হয়ে যায়। গাজার অনেক মানুষের মতো হিলিসও তখন বুঝতে পারেন, তাদের জীবনের স্বাভাবিকতার স্বপ্ন আবার পিছিয়ে গেল।

আন্তর্জাতিক মনোযোগ সরে গেলে বাড়ছে গাজার চাপ
গাজায় প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষ বসবাস করেন। বহু বছর ধরে তারা এমন বাস্তবতার সঙ্গে অভ্যস্ত যেখানে বিশ্বের মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরে গেলে তাদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। নতুন আঞ্চলিক সংঘাত সেই পরিস্থিতিকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, বিশ্বের দৃষ্টি এখন অন্যদিকে থাকলেও গাজার বাস্তবতা বদলায়নি। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, সামরিক উপস্থিতি এবং অবরোধের কারণে এখানকার মানুষের জীবন এখনও অত্যন্ত অনিশ্চিত।
ধ্বংসস্তূপের মাঝে আবার প্রভাব বাড়াচ্ছে হামাস
এদিকে গাজার অভ্যন্তরে হামাস ধীরে ধীরে প্রশাসনিক উপস্থিতি পুনর্গঠন করছে। অনেক এলাকায় তারা আবার পুলিশ মোতায়েন করেছে, আদালত চালু করার চেষ্টা করছে এবং দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
রাস্তার মোড়ে মোড়ে পুলিশ সদস্যদের দেখা যাচ্ছে, কিছু এলাকায় কর সংগ্রহ শুরু হয়েছে এবং যানবাহনের নতুন নিবন্ধন নিয়মও ঘোষণা করা হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি গাজার বাস্তবতায় হামাসের প্রভাব আবার দৃশ্যমান হওয়ার ইঙ্গিত।

যুদ্ধবিধ্বস্ত বাস্তবতা
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, গত কয়েক বছরের সংঘাতে গাজার প্রায় আশি শতাংশ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ এখনও ধ্বংসস্তূপের পাশে তাঁবুতে বসবাস করছে।
অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির সময়ও হামলা পুরোপুরি থামেনি। যুদ্ধবিরতির পরেও শত শত মানুষ নিহত হয়েছে। তবুও বড় ধরনের হামলার তুলনায় পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছিল, যার ফলে কিছু এলাকায় খাদ্য সহায়তা বাড়ানো সম্ভব হয়েছিল।
খাদ্য সংকটের ঝুঁকি আবার বাড়ছে
মানবিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে গাজার অনেক পরিবার দিনে অন্তত দুই বেলা খাবার পেতে শুরু করেছিল। বাজারে পণ্যের দামও কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছিল।
কিন্তু নতুন করে সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আবার আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বাসিন্দারা বলছেন, পণ্যের দাম দ্রুত বাড়ছে এবং কালোবাজারি আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে।
মানবিক সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে নিয়মিত খাদ্য সরবরাহ না থাকলে পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

চিকিৎসা সংকট ও আটকে থাকা রোগীরা
গাজার হাসপাতালগুলোর অর্ধেকেরও কম আংশিকভাবে চালু রয়েছে। হাজার হাজার মানুষ জরুরি চিকিৎসার জন্য গাজা ছাড়ার অপেক্ষায় আছেন।
হিলিসের মতো অনেক রোগী বিদেশে চিকিৎসা পাওয়ার আশায় তালিকায় নাম ওঠার অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু নতুন করে সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই প্রক্রিয়াও থমকে গেছে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
গাজার পুনর্গঠন ও প্রশাসন নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিছু উদ্যোগ শুরু হয়েছিল। কয়েকটি দেশ পুনর্গঠনের জন্য অর্থ সহায়তার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল।
কিন্তু নতুন আঞ্চলিক সংঘাত সেই পরিকল্পনাগুলোকেও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। অনেক আলোচনা স্থগিত হয়ে গেছে, আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আবার ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

ধ্বংসস্তূপে অপেক্ষা মানুষের
গাজার বহু মানুষ মনে করেছিল যুদ্ধের দীর্ঘ অন্ধকারের পর হয়তো স্বাভাবিক জীবনের দিকে ধীরে ধীরে এগোনো সম্ভব হবে। কেউ চিকিৎসার আশায় ছিল, কেউ আবার পড়াশোনা বা কাজের নতুন সুযোগের অপেক্ষায়।
কিন্তু নতুন সংঘাত তাদের সেই স্বপ্ন আবার থামিয়ে দিয়েছে। ধ্বংসস্তূপের মাঝে বসে তারা এখন শুধু অপেক্ষা করছে—পরবর্তী খবরের, পরবর্তী সিদ্ধান্তের, আর হয়তো সামান্য শান্তির।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















