০৭:৩৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬

আমেরিকা ২৫০ বছরে: বর্তমান সংকটে ইতিহাসের শিক্ষা

যুক্তরাষ্ট্র যখন তার ২৫০ বছরের যাত্রাপথে পৌঁছাতে চলেছে, তখন দেশটির রাজনীতি গভীরভাবে বিভক্ত, উত্তেজনাপূর্ণ ও অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের একটি ঘটনা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। মিনিয়াপোলিসে ৭ জানুয়ারি অভিবাসন সংস্থার এক কর্মকর্তার গুলিতে রেনি গুড নামে এক মায়ের মৃত্যুর পর একই দেহক্যামেরা ভিডিও দেখে আমেরিকানরা সম্পূর্ণ বিপরীত সিদ্ধান্তে পৌঁছান। নতুন বিষয় হলো, কেন্দ্রীয় সরকার দ্রুত ওই নারীকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেয় এবং কীভাবে ঘটনা ঘটল তা নিয়ে তদন্ত কার্যত বন্ধ করে দেয়। অনেকের কাছে এটি এমন এক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়, যেখানে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেন ইচ্ছাকৃতভাবেই অস্থিরতা উসকে দিতে চাইছেন, যাতে কঠোর দমননীতির যুক্তি তৈরি হয়।

ইতিহাসে সংকট আর পুনর্জাগরণ

ইতিহাস বলছে, আমেরিকার অগ্রগতি কখনোই সরল পথে হয়নি। বারবার ব্যর্থতা, পিছু হটা ও নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েই দেশটি এগিয়েছে। সংকটের মুহূর্তে সাধারণ মানুষ যখন প্রতিবাদ করেছে, তখনই পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়েছে। এই অভিজ্ঞতাগুলোই আজকের পরিস্থিতি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট দেয়।

Archibald: Are we celebrating Independence Day on the wrong date? - al.com

চলতি বছর স্বাধীনতা দিবস পর্যন্ত সাতটি ধারাবাহিক পর্বে যুক্তরাষ্ট্রের এমন সব সময়ের দিকে ফিরে তাকানো হবে, যখন রাষ্ট্র কাঠামো প্রবল চাপে পড়েছিল। উদ্দেশ্য একটাই—বর্তমান সংকটকে ইতিহাসের আলোকে দেখা। ট্রাম্পের শাসনামল নিঃসন্দেহে কঠিন পরীক্ষা, তবে একেবারে নজিরবিহীন নয়।

ভিন্নমত দমন: পুরোনো চিত্র

ট্রাম্পই প্রথম প্রেসিডেন্ট নন, যিনি সমালোচকদের রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে দেখেছেন। ১৭৯৮ সালে জন অ্যাডামসের সময়ে প্রণীত ‘এলিয়েন ও সেডিশন আইন’ সরকারের বিরুদ্ধে লেখালেখিকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। পরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ও পরবর্তী পর্বে উড্রো উইলসনের প্রশাসন ভিন্নমতাবলম্বীদের কারাবন্দি ও বহিষ্কার করে, সংবাদমাধ্যমে সেন্সর আরোপ করে এবং তথাকথিত ‘অআমেরিকান’দের বিরুদ্ধে জনতার সহিংসতা উপেক্ষা করে। প্রতিবারই এসব দমনমূলক পদক্ষেপকে নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমের নামে বৈধ ও প্রয়োজনীয় বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে—যে ভাষা আজও শোনা যায়।

গণতান্ত্রিক রীতিনীতির ভাঙন

The Watergate Scandal: Timeline and Background | Articles on WatchMojo.com

ক্ষমতার প্রয়োগ ও পরাজয় মেনে নেওয়ার রীতিনীতির ক্ষয়ও নতুন নয়। গৃহযুদ্ধের পর অ্যান্ড্রু জনসন মুক্ত দাসদের নাগরিক অধিকার রুদ্ধ করে পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে দুর্বল করেছিলেন, যার ফলে দক্ষিণে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি দেখিয়ে দেয় কীভাবে আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থাকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা যেতে পারে, আবার একই সঙ্গে প্রমাণ করে দেয়—সৎ কর্মকর্তা ও সাহসী সাংবাদিকেরা না চাইলে গণতন্ত্র টিকে থাকে না। প্রতিবারই সাধারণ মানুষের অবস্থান ও প্রতিরোধের কারণে নৈতিকতা শেষ পর্যন্ত রক্ষা পেয়েছে।

রাষ্ট্রব্যবস্থার পুরোনো দুর্বলতা

আমেরিকার ইতিহাসে বারবার এমন সময় এসেছে, যখন দেশটি ভেঙে পড়ার কিনারায় দাঁড়িয়েছে। প্রথম সংবিধান ‘আর্টিকেলস অব কনফেডারেশন’ এতটাই দুর্বল ছিল যে প্রায় রাষ্ট্র ভাঙনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরবর্তী সংবিধান দাসপ্রথাকে আপস ও অস্পষ্ট ভাষায় ঢেকে রাখে, যার চূড়ান্ত মীমাংসা আসে গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে। ত্রিশের দশকের মহামন্দা দেখিয়ে দেয়, ব্যাপক বেকারত্ব মোকাবিলায় রাজনৈতিক কাঠামো কতটা অপ্রস্তুত ছিল। আবার ২০০০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সুপ্রিম কোর্টের রায়ে নির্ধারিত হওয়া প্রমাণ করে, পুরো ব্যবস্থা কতখানি সদিচ্ছা ও সংযমের ওপর নির্ভরশীল—যা বর্তমানে বিরল হয়ে উঠছে।

How America Went Haywire - The Atlantic

আজকের ভিন্নতা, কিন্তু শিক্ষা একই

এই সময়কে কিছু দিক থেকে আলাদা মনে হলেও ইতিহাস হুবহু পুনরাবৃত্তি হয় না। তবে বর্তমানকে অতিরিক্ত ভয়াবহ বলে ভাবা অতীতের সংগ্রাম ও অর্জনকে খাটো করে দেখে। আমেরিকানরা আগেও এমন চাপের মুখে পড়েছে। ইতিহাস একদিকে যেমন হতাশার কারণ দেয় না, তেমনি আত্মতুষ্টির সুযোগও দেয় না। প্রতিবার ঘুরে দাঁড়াতে নাগরিকদেরই ব্যর্থতার মুখোমুখি হতে হয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শ—কংগ্রেসের মাধ্যমে জনগণের শাসন—নতুন করে জাগিয়ে তুলতে হয়েছে।

বড় ধাক্কা ছাড়াই পথ বদলের চ্যালেঞ্জ

ইতিহাসে পুনর্জাগরণের জন্য কখনো কখনো বড় ধাক্কার প্রয়োজন হয়েছে—গৃহযুদ্ধ, মহামন্দা কিংবা সমকক্ষ শক্তির অস্তিত্বগত হুমকি। বর্তমান প্রজন্মের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এমন কোনো বিপর্যয় ছাড়াই আবারও দেশের গতিপথ বদলানো।

জনপ্রিয় সংবাদ

আমেরিকা ২৫০ বছরে: বর্তমান সংকটে ইতিহাসের শিক্ষা

০৫:২৯:১৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র যখন তার ২৫০ বছরের যাত্রাপথে পৌঁছাতে চলেছে, তখন দেশটির রাজনীতি গভীরভাবে বিভক্ত, উত্তেজনাপূর্ণ ও অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের একটি ঘটনা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। মিনিয়াপোলিসে ৭ জানুয়ারি অভিবাসন সংস্থার এক কর্মকর্তার গুলিতে রেনি গুড নামে এক মায়ের মৃত্যুর পর একই দেহক্যামেরা ভিডিও দেখে আমেরিকানরা সম্পূর্ণ বিপরীত সিদ্ধান্তে পৌঁছান। নতুন বিষয় হলো, কেন্দ্রীয় সরকার দ্রুত ওই নারীকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেয় এবং কীভাবে ঘটনা ঘটল তা নিয়ে তদন্ত কার্যত বন্ধ করে দেয়। অনেকের কাছে এটি এমন এক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়, যেখানে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেন ইচ্ছাকৃতভাবেই অস্থিরতা উসকে দিতে চাইছেন, যাতে কঠোর দমননীতির যুক্তি তৈরি হয়।

ইতিহাসে সংকট আর পুনর্জাগরণ

ইতিহাস বলছে, আমেরিকার অগ্রগতি কখনোই সরল পথে হয়নি। বারবার ব্যর্থতা, পিছু হটা ও নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েই দেশটি এগিয়েছে। সংকটের মুহূর্তে সাধারণ মানুষ যখন প্রতিবাদ করেছে, তখনই পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়েছে। এই অভিজ্ঞতাগুলোই আজকের পরিস্থিতি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট দেয়।

Archibald: Are we celebrating Independence Day on the wrong date? - al.com

চলতি বছর স্বাধীনতা দিবস পর্যন্ত সাতটি ধারাবাহিক পর্বে যুক্তরাষ্ট্রের এমন সব সময়ের দিকে ফিরে তাকানো হবে, যখন রাষ্ট্র কাঠামো প্রবল চাপে পড়েছিল। উদ্দেশ্য একটাই—বর্তমান সংকটকে ইতিহাসের আলোকে দেখা। ট্রাম্পের শাসনামল নিঃসন্দেহে কঠিন পরীক্ষা, তবে একেবারে নজিরবিহীন নয়।

ভিন্নমত দমন: পুরোনো চিত্র

ট্রাম্পই প্রথম প্রেসিডেন্ট নন, যিনি সমালোচকদের রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে দেখেছেন। ১৭৯৮ সালে জন অ্যাডামসের সময়ে প্রণীত ‘এলিয়েন ও সেডিশন আইন’ সরকারের বিরুদ্ধে লেখালেখিকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। পরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ও পরবর্তী পর্বে উড্রো উইলসনের প্রশাসন ভিন্নমতাবলম্বীদের কারাবন্দি ও বহিষ্কার করে, সংবাদমাধ্যমে সেন্সর আরোপ করে এবং তথাকথিত ‘অআমেরিকান’দের বিরুদ্ধে জনতার সহিংসতা উপেক্ষা করে। প্রতিবারই এসব দমনমূলক পদক্ষেপকে নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমের নামে বৈধ ও প্রয়োজনীয় বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে—যে ভাষা আজও শোনা যায়।

গণতান্ত্রিক রীতিনীতির ভাঙন

The Watergate Scandal: Timeline and Background | Articles on WatchMojo.com

ক্ষমতার প্রয়োগ ও পরাজয় মেনে নেওয়ার রীতিনীতির ক্ষয়ও নতুন নয়। গৃহযুদ্ধের পর অ্যান্ড্রু জনসন মুক্ত দাসদের নাগরিক অধিকার রুদ্ধ করে পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে দুর্বল করেছিলেন, যার ফলে দক্ষিণে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি দেখিয়ে দেয় কীভাবে আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থাকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা যেতে পারে, আবার একই সঙ্গে প্রমাণ করে দেয়—সৎ কর্মকর্তা ও সাহসী সাংবাদিকেরা না চাইলে গণতন্ত্র টিকে থাকে না। প্রতিবারই সাধারণ মানুষের অবস্থান ও প্রতিরোধের কারণে নৈতিকতা শেষ পর্যন্ত রক্ষা পেয়েছে।

রাষ্ট্রব্যবস্থার পুরোনো দুর্বলতা

আমেরিকার ইতিহাসে বারবার এমন সময় এসেছে, যখন দেশটি ভেঙে পড়ার কিনারায় দাঁড়িয়েছে। প্রথম সংবিধান ‘আর্টিকেলস অব কনফেডারেশন’ এতটাই দুর্বল ছিল যে প্রায় রাষ্ট্র ভাঙনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরবর্তী সংবিধান দাসপ্রথাকে আপস ও অস্পষ্ট ভাষায় ঢেকে রাখে, যার চূড়ান্ত মীমাংসা আসে গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে। ত্রিশের দশকের মহামন্দা দেখিয়ে দেয়, ব্যাপক বেকারত্ব মোকাবিলায় রাজনৈতিক কাঠামো কতটা অপ্রস্তুত ছিল। আবার ২০০০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সুপ্রিম কোর্টের রায়ে নির্ধারিত হওয়া প্রমাণ করে, পুরো ব্যবস্থা কতখানি সদিচ্ছা ও সংযমের ওপর নির্ভরশীল—যা বর্তমানে বিরল হয়ে উঠছে।

How America Went Haywire - The Atlantic

আজকের ভিন্নতা, কিন্তু শিক্ষা একই

এই সময়কে কিছু দিক থেকে আলাদা মনে হলেও ইতিহাস হুবহু পুনরাবৃত্তি হয় না। তবে বর্তমানকে অতিরিক্ত ভয়াবহ বলে ভাবা অতীতের সংগ্রাম ও অর্জনকে খাটো করে দেখে। আমেরিকানরা আগেও এমন চাপের মুখে পড়েছে। ইতিহাস একদিকে যেমন হতাশার কারণ দেয় না, তেমনি আত্মতুষ্টির সুযোগও দেয় না। প্রতিবার ঘুরে দাঁড়াতে নাগরিকদেরই ব্যর্থতার মুখোমুখি হতে হয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শ—কংগ্রেসের মাধ্যমে জনগণের শাসন—নতুন করে জাগিয়ে তুলতে হয়েছে।

বড় ধাক্কা ছাড়াই পথ বদলের চ্যালেঞ্জ

ইতিহাসে পুনর্জাগরণের জন্য কখনো কখনো বড় ধাক্কার প্রয়োজন হয়েছে—গৃহযুদ্ধ, মহামন্দা কিংবা সমকক্ষ শক্তির অস্তিত্বগত হুমকি। বর্তমান প্রজন্মের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এমন কোনো বিপর্যয় ছাড়াই আবারও দেশের গতিপথ বদলানো।