১১:৪৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬
গাজীপুরে লিটন চন্দ্র ঘোষকে পিটিয়ে হত্যা ভারত বয়কটে অনড় বিসিবি, অচলাবস্থা কাটাতে গ্রুপ পরিবর্তনের প্রস্তাব কুষ্টিয়ায় পিকআপ ও নসিমন মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ গেল এক ব্যক্তির ময়মনসিংহ মেডিকেলের শিশু ওয়ার্ডে আগুন, এক ঘণ্টায় নিয়ন্ত্রণে সুস্থ থাকতে টাকা লাগে না, দরকার সচেতন খাবার ও কৃষির পরিবর্তন নারী ইন্টার্নে হামলার প্রতিবাদে ওসমানী মেডিকেলের ইন্টার্নদের কর্মবিরতি ‘দুষ্কৃতকারী’ তালিকায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাস, বাদ দেয়া হলো বিএনপি নেতার নাম কিছুদিন দেরি হলেও সুষ্ঠু নির্বাচনই অগ্রাধিকার এনসিপি ডাকসু নেতার স্লোগানে শিক্ষার্থীদের পাল্টা বিদ্রুপ, কনসার্টে ছড়িয়ে পড়ে ‘ইউরেনিয়াম’ ধ্বনি পদ্মা গোখরা: বাংলার জলজ ভূখণ্ডে এক নীরব বিষধর সম্রাট

পদ্মা গোখরা: বাংলার জলজ ভূখণ্ডে এক নীরব বিষধর সম্রাট

ভয়ের প্রতীক না প্রকৃতির অনিবার্য অংশ

বাংলার নদী, বিল, খাল, চর আর জলাভূমির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক রহস্যময় প্রাণীর অস্তিত্ব—পদ্মা গোখরা। নাম শুনলেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে ভয়, আতঙ্ক আর মৃত্যু। গ্রামবাংলায় এই সাপকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে অসংখ্য কাহিনি, কিংবদন্তি আর অলৌকিক বিশ্বাস। কেউ বলে এটি প্রতিশোধপরায়ণ, কেউ বলে এটি চোখে চোখ রাখলে মানুষকে তাড়া করে, আবার কেউ বিশ্বাস করে এটি ঘরের লোক চিনে রাখে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক বাস্তবতায় পদ্মা গোখরা আসলে কী? কতটা বিপজ্জনক, কতটা নিরীহ, আর প্রকৃতির ভারসাম্যে এর ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই এই বিস্তৃত ফিচার।

পদ্মা গোখরার পরিচয় ও নামকরণের ইতিহাস

পদ্মা গোখরা মূলত একটি বিষধর সাপ, যা দক্ষিণ এশিয়ার জলাভূমি ও নদীবিধৌত অঞ্চলে ব্যাপকভাবে দেখা যায়। বাংলায় একে গোখরা বলা হলেও অঞ্চলভেদে এর নাম ভিন্ন ভিন্ন। কোথাও একে পদ্মা গোখরা, কোথাও জল গোখরা, আবার কোথাও কালো গোখরা নামেও পরিচিত। পদ্মা নামটি এসেছে মূলত পদ্মা নদী ও এর আশপাশের চরাঞ্চলে এ সাপের উপস্থিতি বেশি থাকার কারণে। ঐতিহাসিকভাবে নদীকেন্দ্রিক জনপদে এই সাপের সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান বহু শতাব্দীর পুরোনো।

শারীরিক গঠন: শক্তি ও সৌন্দর্যের অনন্য সংমিশ্রণ

পদ্মা গোখরার শরীর দীর্ঘ, পেশিবহুল ও অত্যন্ত শক্তিশালী। পূর্ণবয়স্ক একটি পদ্মা গোখরার দৈর্ঘ্য সাধারণত পাঁচ থেকে সাত ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে, তবে অনুকূল পরিবেশে আরও বড় আকারের গোখরাও দেখা যায়। এর শরীরের রং সাধারণত কালচে বাদামি বা ধূসর, পিঠে কখনো কখনো হালকা দাগ দেখা যায়। সবচেয়ে ভয়ংকর বৈশিষ্ট্য হলো এর ফণা। বিপদের সময় এটি ফণা তুলে নিজেকে বড় করে তোলে, যা শত্রুকে ভয় দেখানোর একটি স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা কৌশল। চোখ দুটো তীক্ষ্ণ ও সতর্ক, যেন চারপাশের প্রতিটি নড়াচড়া সে লক্ষ্য রাখছে।

No photo description available.

বিষের প্রকৃতি: মৃত্যু না চিকিৎসার সুযোগ

পদ্মা গোখরার বিষ অত্যন্ত শক্তিশালী স্নায়ুবিষ। এই বিষ মানুষের স্নায়ুতন্ত্রে দ্রুত আঘাত হানে এবং শ্বাসপ্রশ্বাসের পেশিকে অবশ করে দিতে পারে। ফলে সময়মতো চিকিৎসা না পেলে প্রাণঘাতী পরিণতি ঘটতে পারে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো—পদ্মা গোখরা অকারণে কামড়ায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষ অসাবধানতাবশত সাপের খুব কাছে চলে গেলে বা তাকে আঘাত করলে আত্মরক্ষার জন্য সে কামড় দেয়। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় সঠিক অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগী সুস্থ হয়ে ওঠে। তাই ভয়ের পাশাপাশি সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।

আবাসস্থল: জল ও স্থলের মাঝামাঝি রাজত্ব

পদ্মা গোখরা মূলত জলাভূমি, নদীর তীর, বিল, হাওর ও খালের আশপাশে বসবাস করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এটি জল ও স্থল—দুই পরিবেশেই সমান দক্ষ। ভালো সাঁতার কাটতে পারে এবং দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকতে সক্ষম। বর্ষাকালে নদীভাঙন ও জলস্তর বৃদ্ধির ফলে এরা অনেক সময় লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। বিশেষ করে চরাঞ্চল ও নদীপাড়ের গ্রামগুলোতে বর্ষার সময় পদ্মা গোখরার দেখা মেলে বেশি।

খাদ্যাভ্যাস: পরিবেশের প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রক

পদ্মা গোখরার খাদ্যতালিকায় রয়েছে ব্যাঙ, মাছ, ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী, ইঁদুর, এমনকি অন্য সাপও। এই খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে এটি প্রকৃতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে। ইঁদুর ও ক্ষতিকর প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে পদ্মা গোখরা কার্যকর ভূমিকা রাখে। কৃষিভিত্তিক সমাজে এই সাপের উপস্থিতি আসলে পরোক্ষভাবে উপকারী, যদিও ভয়ের কারণে মানুষ তা সহজে স্বীকার করতে চায় না।

কুবিতে 'পদ্ম গোখরা' সাপের ২৬ ডিম উদ্ধার

প্রজনন ও জীবনচক্র

পদ্মা গোখরা সাধারণত ডিম পাড়ে। স্ত্রী গোখরা নিরাপদ ও আর্দ্র স্থানে ডিম পাড়ে এবং আশ্চর্যজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রে ডিম পাহারা দেয়। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে সময় লাগে কয়েক সপ্তাহ। জন্মের পর থেকেই বাচ্চা গোখরার শরীরে বিষ সক্রিয় থাকে, যদিও বিষের মাত্রা তুলনামূলক কম। প্রাকৃতিক পরিবেশে টিকে থাকতে না পারলে অনেক বাচ্চা সাপ শিকারির হাতে বা মানুষের ভয়ে মারা যায়।

লোককথা ও কুসংস্কার: ভয়ের শেকড় কোথায়

গ্রামবাংলায় পদ্মা গোখরাকে ঘিরে অসংখ্য কুসংস্কার প্রচলিত। কেউ বিশ্বাস করে গোখরা প্রতিশোধ নেয়, কেউ বলে এর চোখে সম্মোহনী শক্তি আছে। আবার কোথাও বলা হয়, গোখরার সঙ্গী মারা গেলে সে মানুষ চিনে রেখে প্রতিশোধ নিতে আসে। বৈজ্ঞানিকভাবে এসব বিশ্বাসের কোনো ভিত্তি নেই। তবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এসব গল্প মানুষের মনে গভীর ভয়ের জন্ম দিয়েছে, যা আজও পুরোপুরি দূর হয়নি।

মানুষ ও পদ্মা গোখরা: সংঘাতের গল্প

বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় সাপের কামড় একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা। পদ্মা গোখরাও এই পরিসংখ্যানে একটি অংশ। তবে অধিকাংশ সংঘাতের পেছনে রয়েছে মানুষের অসচেতনতা। ঝোপঝাড়ে খালি পায়ে হাঁটা, রাতে আলো ছাড়া চলাফেরা, খড়ের গাদা বা কাঠের স্তূপে হাত দেওয়ার মতো কাজ বিপদের ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে, ভয়ের কারণে অনেক সময় মানুষ দেখামাত্রই সাপটিকে মেরে ফেলে, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।

No photo description available.

পরিবেশগত গুরুত্ব: ভারসাম্যের নীরব প্রহরী

পদ্মা গোখরা শুধু একটি ভয়ংকর সাপ নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত উপাদান। খাদ্যশৃঙ্খলে এর অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি না থাকলে ইঁদুর ও ক্ষতিকর প্রাণীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে, যা ফসল ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই পদ্মা গোখরার অস্তিত্ব মানেই প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার একটি স্তম্ভ।

সংরক্ষণ ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ

আবাসস্থল ধ্বংস, জলাভূমি ভরাট, নদী দূষণ ও মানুষের ভয়—সব মিলিয়ে পদ্মা গোখরার অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে। অনেক এলাকায় এ সাপের সংখ্যা আগের তুলনায় কমে যাচ্ছে। সচেতনতা বৃদ্ধি, সাপ উদ্ধারকারী দল গঠন এবং পরিবেশবান্ধব আচরণই পারে এই প্রজাতিকে রক্ষা করতে।

 ভয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সহাবস্থানের শিক্ষা

পদ্মা গোখরা ভয়ের প্রতীক হলেও এটি প্রকৃতির অপরিহার্য অংশ। অকারণে হত্যা নয়, বরং সচেতন সহাবস্থানই হতে পারে সমাধান। মানুষ যদি বুঝতে শেখে যে প্রতিটি প্রাণীরই এই পৃথিবীতে একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে, তবে পদ্মা গোখরার মতো নীরব প্রাণীরাও নিরাপদে বেঁচে থাকার সুযোগ পাবে। ভয় নয়, জ্ঞানই হতে পারে আমাদের প্রকৃত রক্ষা কবচ

জনপ্রিয় সংবাদ

গাজীপুরে লিটন চন্দ্র ঘোষকে পিটিয়ে হত্যা

পদ্মা গোখরা: বাংলার জলজ ভূখণ্ডে এক নীরব বিষধর সম্রাট

১০:০০:৪৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬

ভয়ের প্রতীক না প্রকৃতির অনিবার্য অংশ

বাংলার নদী, বিল, খাল, চর আর জলাভূমির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক রহস্যময় প্রাণীর অস্তিত্ব—পদ্মা গোখরা। নাম শুনলেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে ভয়, আতঙ্ক আর মৃত্যু। গ্রামবাংলায় এই সাপকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে অসংখ্য কাহিনি, কিংবদন্তি আর অলৌকিক বিশ্বাস। কেউ বলে এটি প্রতিশোধপরায়ণ, কেউ বলে এটি চোখে চোখ রাখলে মানুষকে তাড়া করে, আবার কেউ বিশ্বাস করে এটি ঘরের লোক চিনে রাখে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক বাস্তবতায় পদ্মা গোখরা আসলে কী? কতটা বিপজ্জনক, কতটা নিরীহ, আর প্রকৃতির ভারসাম্যে এর ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই এই বিস্তৃত ফিচার।

পদ্মা গোখরার পরিচয় ও নামকরণের ইতিহাস

পদ্মা গোখরা মূলত একটি বিষধর সাপ, যা দক্ষিণ এশিয়ার জলাভূমি ও নদীবিধৌত অঞ্চলে ব্যাপকভাবে দেখা যায়। বাংলায় একে গোখরা বলা হলেও অঞ্চলভেদে এর নাম ভিন্ন ভিন্ন। কোথাও একে পদ্মা গোখরা, কোথাও জল গোখরা, আবার কোথাও কালো গোখরা নামেও পরিচিত। পদ্মা নামটি এসেছে মূলত পদ্মা নদী ও এর আশপাশের চরাঞ্চলে এ সাপের উপস্থিতি বেশি থাকার কারণে। ঐতিহাসিকভাবে নদীকেন্দ্রিক জনপদে এই সাপের সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান বহু শতাব্দীর পুরোনো।

শারীরিক গঠন: শক্তি ও সৌন্দর্যের অনন্য সংমিশ্রণ

পদ্মা গোখরার শরীর দীর্ঘ, পেশিবহুল ও অত্যন্ত শক্তিশালী। পূর্ণবয়স্ক একটি পদ্মা গোখরার দৈর্ঘ্য সাধারণত পাঁচ থেকে সাত ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে, তবে অনুকূল পরিবেশে আরও বড় আকারের গোখরাও দেখা যায়। এর শরীরের রং সাধারণত কালচে বাদামি বা ধূসর, পিঠে কখনো কখনো হালকা দাগ দেখা যায়। সবচেয়ে ভয়ংকর বৈশিষ্ট্য হলো এর ফণা। বিপদের সময় এটি ফণা তুলে নিজেকে বড় করে তোলে, যা শত্রুকে ভয় দেখানোর একটি স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা কৌশল। চোখ দুটো তীক্ষ্ণ ও সতর্ক, যেন চারপাশের প্রতিটি নড়াচড়া সে লক্ষ্য রাখছে।

No photo description available.

বিষের প্রকৃতি: মৃত্যু না চিকিৎসার সুযোগ

পদ্মা গোখরার বিষ অত্যন্ত শক্তিশালী স্নায়ুবিষ। এই বিষ মানুষের স্নায়ুতন্ত্রে দ্রুত আঘাত হানে এবং শ্বাসপ্রশ্বাসের পেশিকে অবশ করে দিতে পারে। ফলে সময়মতো চিকিৎসা না পেলে প্রাণঘাতী পরিণতি ঘটতে পারে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো—পদ্মা গোখরা অকারণে কামড়ায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষ অসাবধানতাবশত সাপের খুব কাছে চলে গেলে বা তাকে আঘাত করলে আত্মরক্ষার জন্য সে কামড় দেয়। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় সঠিক অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগী সুস্থ হয়ে ওঠে। তাই ভয়ের পাশাপাশি সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।

আবাসস্থল: জল ও স্থলের মাঝামাঝি রাজত্ব

পদ্মা গোখরা মূলত জলাভূমি, নদীর তীর, বিল, হাওর ও খালের আশপাশে বসবাস করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এটি জল ও স্থল—দুই পরিবেশেই সমান দক্ষ। ভালো সাঁতার কাটতে পারে এবং দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকতে সক্ষম। বর্ষাকালে নদীভাঙন ও জলস্তর বৃদ্ধির ফলে এরা অনেক সময় লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। বিশেষ করে চরাঞ্চল ও নদীপাড়ের গ্রামগুলোতে বর্ষার সময় পদ্মা গোখরার দেখা মেলে বেশি।

খাদ্যাভ্যাস: পরিবেশের প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রক

পদ্মা গোখরার খাদ্যতালিকায় রয়েছে ব্যাঙ, মাছ, ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী, ইঁদুর, এমনকি অন্য সাপও। এই খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে এটি প্রকৃতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে। ইঁদুর ও ক্ষতিকর প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে পদ্মা গোখরা কার্যকর ভূমিকা রাখে। কৃষিভিত্তিক সমাজে এই সাপের উপস্থিতি আসলে পরোক্ষভাবে উপকারী, যদিও ভয়ের কারণে মানুষ তা সহজে স্বীকার করতে চায় না।

কুবিতে 'পদ্ম গোখরা' সাপের ২৬ ডিম উদ্ধার

প্রজনন ও জীবনচক্র

পদ্মা গোখরা সাধারণত ডিম পাড়ে। স্ত্রী গোখরা নিরাপদ ও আর্দ্র স্থানে ডিম পাড়ে এবং আশ্চর্যজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রে ডিম পাহারা দেয়। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে সময় লাগে কয়েক সপ্তাহ। জন্মের পর থেকেই বাচ্চা গোখরার শরীরে বিষ সক্রিয় থাকে, যদিও বিষের মাত্রা তুলনামূলক কম। প্রাকৃতিক পরিবেশে টিকে থাকতে না পারলে অনেক বাচ্চা সাপ শিকারির হাতে বা মানুষের ভয়ে মারা যায়।

লোককথা ও কুসংস্কার: ভয়ের শেকড় কোথায়

গ্রামবাংলায় পদ্মা গোখরাকে ঘিরে অসংখ্য কুসংস্কার প্রচলিত। কেউ বিশ্বাস করে গোখরা প্রতিশোধ নেয়, কেউ বলে এর চোখে সম্মোহনী শক্তি আছে। আবার কোথাও বলা হয়, গোখরার সঙ্গী মারা গেলে সে মানুষ চিনে রেখে প্রতিশোধ নিতে আসে। বৈজ্ঞানিকভাবে এসব বিশ্বাসের কোনো ভিত্তি নেই। তবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এসব গল্প মানুষের মনে গভীর ভয়ের জন্ম দিয়েছে, যা আজও পুরোপুরি দূর হয়নি।

মানুষ ও পদ্মা গোখরা: সংঘাতের গল্প

বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় সাপের কামড় একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা। পদ্মা গোখরাও এই পরিসংখ্যানে একটি অংশ। তবে অধিকাংশ সংঘাতের পেছনে রয়েছে মানুষের অসচেতনতা। ঝোপঝাড়ে খালি পায়ে হাঁটা, রাতে আলো ছাড়া চলাফেরা, খড়ের গাদা বা কাঠের স্তূপে হাত দেওয়ার মতো কাজ বিপদের ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে, ভয়ের কারণে অনেক সময় মানুষ দেখামাত্রই সাপটিকে মেরে ফেলে, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।

No photo description available.

পরিবেশগত গুরুত্ব: ভারসাম্যের নীরব প্রহরী

পদ্মা গোখরা শুধু একটি ভয়ংকর সাপ নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত উপাদান। খাদ্যশৃঙ্খলে এর অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি না থাকলে ইঁদুর ও ক্ষতিকর প্রাণীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে, যা ফসল ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই পদ্মা গোখরার অস্তিত্ব মানেই প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার একটি স্তম্ভ।

সংরক্ষণ ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ

আবাসস্থল ধ্বংস, জলাভূমি ভরাট, নদী দূষণ ও মানুষের ভয়—সব মিলিয়ে পদ্মা গোখরার অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে। অনেক এলাকায় এ সাপের সংখ্যা আগের তুলনায় কমে যাচ্ছে। সচেতনতা বৃদ্ধি, সাপ উদ্ধারকারী দল গঠন এবং পরিবেশবান্ধব আচরণই পারে এই প্রজাতিকে রক্ষা করতে।

 ভয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সহাবস্থানের শিক্ষা

পদ্মা গোখরা ভয়ের প্রতীক হলেও এটি প্রকৃতির অপরিহার্য অংশ। অকারণে হত্যা নয়, বরং সচেতন সহাবস্থানই হতে পারে সমাধান। মানুষ যদি বুঝতে শেখে যে প্রতিটি প্রাণীরই এই পৃথিবীতে একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে, তবে পদ্মা গোখরার মতো নীরব প্রাণীরাও নিরাপদে বেঁচে থাকার সুযোগ পাবে। ভয় নয়, জ্ঞানই হতে পারে আমাদের প্রকৃত রক্ষা কবচ