সুস্থতার সংকটে বাংলাদেশ
বাংলাদেশে দিন দিন অস্বাস্থ্যকর ও অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহার বাড়ছে। ভাজা, তেলে ভরা ও রাসায়নিকসমৃদ্ধ এসব খাবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে তরুণ প্রজন্মের। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই খাদ্যাভ্যাস থেকেই বাড়ছে জীবনযাপনজনিত রোগ, এমনকি অকাল মৃত্যুর ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
ঢাকায় আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিশেষজ্ঞরা জানান, পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি হাতছাড়া হয়নি। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে আবারও স্বাস্থ্যকর খাবারের পথে ফেরা সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন প্রাকৃতিক খাদ্যাভ্যাসে প্রত্যাবর্তন এবং কৃষিতে আগ্রোইকোলজিক্যাল ও জৈব পদ্ধতির বিস্তার।

স্বাস্থ্যকর খাবারের সংকট
খাদ্য, পুষ্টি ও আকুপাংচার বিশেষজ্ঞ আলমগীর আলম বলেন, বর্তমানে স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রাপ্যতা ভয়াবহভাবে কমে গেছে। চারপাশে বাহারি খাবারের ছড়াছড়ি থাকলেও সেগুলোর বেশিরভাগই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। একসময় ভালো চাল, দুধ, মাংস ও মুরগি সহজেই পাওয়া যেত। এখন ভালো খাবার পাওয়া যেন ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কৃষিজমির উর্বরতা ও আগ্রোইকোলজিক্যাল কৃষি
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল কাদের গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দেশের আবাদি জমির উর্বরতা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাঁর মতে, আগ্রোইকোলজিক্যাল কৃষি এখন আর বিকল্প নয়, বরং জরুরি প্রয়োজন। তিনি এই পদ্ধতিকে কেবল জৈব কৃষির মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে ‘জৈবেরও ঊর্ধ্বে’ বলে ব্যাখ্যা করেন।
প্রাক্তন সচিব মো. সেলিম রেজা, কৃষি বিশেষজ্ঞ ড. মাহবুবুর রহমান ও প্রাকৃতিক খাদ্য বিশেষজ্ঞ শহীদ আহমেদসহ অন্যান্য বক্তারাও একই মত প্রকাশ করেন। তাঁরা বলেন, আগ্রোইকোলজিক্যাল কৃষি বিজ্ঞানভিত্তিক একটি পদ্ধতি, যেখানে রাসায়নিক সার, কীটনাশক বা ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার করা হয় না।

প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার গুরুত্ব
বক্তারা ব্যাখ্যা করেন, এই কৃষিপদ্ধতিতে জমির জীব ও অজীব উপাদান, পরিবেশ এবং প্রাকৃতিক চক্র একসঙ্গে কাজ করে। এর ফলে মাটির স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য, উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রজনন চক্র এবং প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খল অক্ষুণ্ন থাকে। দীর্ঘমেয়াদে এটি পরিবেশের ক্ষতি না করেই টেকসই খাদ্য উৎপাদনের পথ তৈরি করে।
খাদ্যখাতে করপোরেট প্রভাবের সমালোচনা
ফজলুল কাদের বলেন, খাদ্যখাতে করপোরেট স্বার্থের আগ্রাসী ভূমিকা পুরো ব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়েছে। ক্ষেত থেকে সুপারশপ পর্যন্ত পুরো খাদ্যশৃঙ্খল দূষিত হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় রাষ্ট্রের কার্যকর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হলেও তা যথেষ্ট নয়। তাঁর মতে, কৃষিতে আবারও পবিত্রতা ও বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে।

ভালো খাদ্য, ভালো জীবন
বিশ্বব্যাংকের ‘গুড ফুড, গুড লাইফ’ কর্মসূচির আওতায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের পরামর্শক ড. মোহাম্মদ মাহবুব আলম বলেন, ভালো খাদ্য ও ভালো কৃষিই পারে সুস্থ জীবনের বিকল্প পথ দেখাতে। নিরাপদ ও প্রাকৃতিক খাবারের আন্দোলন ভবিষ্যতের জন্য একটি টেকসই স্বাস্থ্য ও কৃষি মডেল হয়ে উঠতে পারে।
কৃষকের সংকট ও বাজার বাস্তবতা
অনুষ্ঠানে উপস্থিত কৃষকেরা বাজারে প্রবেশাধিকার ও ন্যায্যমূল্য নিয়ে উদ্বেগ জানান। তাঁদের প্রশ্ন, বাজারব্যবস্থায় সংকট থাকলে ভালো খাবার কীভাবে টিকিয়ে রাখা সম্ভব। তাঁদের মতে, কৃষিকে আবারও সম্মানজনক ও লাভজনক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, শুধু কষ্ট ও অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত পেশা হিসেবে নয়।

খাবার বদলেই সুস্থতা
আশির কোঠায় থাকা প্রাকৃতিক খাদ্য বিশেষজ্ঞ শহীদ আহমেদ নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একসময় তাঁর নানা রোগ ছিল, কিন্তু খাবারের অভ্যাস বদলে তিনি সব রোগ থেকে মুক্ত হয়েছেন। তাঁর মতে, আল্লাহ যা দিয়েছেন—ফল ও শাকপাতা—সেগুলোই খাওয়া উচিত। পাতাই সূর্যের পূর্ণ শক্তি ধারণ করে। স্বাস্থ্য রক্ষায় টাকা লাগে না, লাগে সচেতনতা।
সামাজিক আন্দোলনের আহ্বান
ওয়েভ ফাউন্ডেশনের মোহসিন আলী এই উদ্যোগকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে এটি এগিয়ে নিতে হবে এবং শিশুদের ছোটবেলা থেকেই প্রাকৃতিক খাবারের শিক্ষা দিতে মায়েদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

শুপণ্য প্রকল্পের লক্ষ্য
এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয় ‘শুপণ্য’ প্রকল্পের উদ্বোধন উপলক্ষে। প্রকল্পটির লক্ষ্য শহরবাসীর কাছে স্বাস্থ্যকর খাদ্যপণ্য ও কৃষিপণ্য পৌঁছে দেওয়া। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রাকৃতিক খাদ্য বিশেষজ্ঞ নওশের আলী। তিনি কৃষকদের ভূমিকার ওপর জোর দেন এবং এ বিষয়ে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
শুপণ্য প্রকল্পের উদ্যোক্তা খান বাতেন বলেন, তাঁর স্বপ্ন হলো এই উদ্যোগকে দেশব্যাপী সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করা। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে বাংলাদেশে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার পবিত্রতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, সঠিক শিক্ষা, ইতিবাচক চিন্তা ও সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর খাবারের বার্তা সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া যাবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















