বেইজিংয়ের কড়া শীতের সকালে বরফে জমে থাকা পার্কে মানুষের হাসি আর বিনোদনের ছবি যতটা প্রাণবন্ত, চীনের অর্থনীতির সাম্প্রতিক চিত্র ততটাই বৈপরীত্যে ভরা। দুই হাজার পঁচিশ সালের শেষ প্রান্তিকে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা। রপ্তানি খাত শক্ত থাকলেও ভোক্তা ব্যয় ও বিনিয়োগে দুর্বলতা দেশটির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে চাপে ফেলছে।
অর্থনীতির অসম গতি
চলতি মাসের উনিশ তারিখে প্রকাশিত হতে যাওয়া সরকারি তথ্যে দেখা যেতে পারে, দুই হাজার পঁচিশ সালের শেষ প্রান্তিকে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি চার দশমিক পাঁচ শতাংশে নেমেছে। করোনা পরবর্তী পুনরুদ্ধারের পর এটিই হবে সর্বনিম্ন ত্রৈমাসিক প্রবৃদ্ধি। পুরো বছরে প্রবৃদ্ধি পাঁচ শতাংশের কাছাকাছি থাকলেও মূল্যস্ফীতির চাপ না থাকায় প্রকৃত আয়ের গতি আরও কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এতে করপোরেট মুনাফা ও সাধারণ মানুষের সম্পদমূল্য উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
রপ্তানির ভরসা, ভোক্তার অনিশ্চয়তা
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য উত্তেজনার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে রপ্তানি বাড়িয়ে অর্থনীতিকে ধরে রেখেছে চীন। শিল্প উৎপাদন বাড়লেও খুচরা বিক্রি ও স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগ দুর্বল রয়ে গেছে। ডিসেম্বর মাসে খুচরা বিক্রির প্রবৃদ্ধি তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নামতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারি হিসাব শুরুর পর প্রথমবারের মতো বার্ষিক বিনিয়োগ হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
দুই হাজার ছাব্বিশেও কি একই চিত্র
বিশ্লেষকদের মতে, এই অসম প্রবৃদ্ধির ধারা দুই হাজার ছাব্বিশ সালেও চলতে পারে। রপ্তানির ভবিষ্যৎ ইতিবাচক হলেও অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াতে বড় ধরনের প্রণোদনার পথে হাঁটতে অনিচ্ছুক বেইজিং। স্থানীয় সরকারের ঋণের ঝুঁকি এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার চিন্তা থেকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ধীরগতির প্রবৃদ্ধিকেও মেনে নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

নীতিগত সংযম ও সীমিত সহায়তা
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, অর্থনীতিকে চাঙা করতে তারা লক্ষ্যভিত্তিক নীতিই অনুসরণ করবে। কাঠামোগত ঋণের খরচ কিছুটা কমানো হলেও সুদের হারে বড় কাটছাঁটের সম্ভাবনা কম। দুর্বল চাহিদা, আবাসন খাতের মন্দা ও স্থানীয় ঋণের পাহাড় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে জটিল করে তুলছে।
দীর্ঘ পথের সংস্কার
প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সেবা খাতকে এগিয়ে এনে ভোক্তা নির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়েছে চীন। তবে দুর্বল কর্মসংস্থান ও বাড়ির দাম কমতে থাকায় সাধারণ মানুষের ব্যয় বাড়ানো সহজ হবে না। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই রূপান্তর কয়েক বছরের নয়, বরং দীর্ঘ সময়ের বিষয়।
ভোক্তা সহায়তার সীমাবদ্ধতা
পুরোনো পণ্য বদলে নতুন কেনার সরকারি কর্মসূচির অর্থ ফুরিয়ে আসায় গত বছরের মাঝামাঝি থেকে খুচরা বিক্রির গতি কমতে থাকে। দুই হাজার ছাব্বিশ সালের জন্য প্রাথমিকভাবে কিছু অর্থ বরাদ্দ হলেও তা কয়েক মাসের বেশি টিকবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে ভোক্তা সহায়তা কতদিন চলবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

বিনিয়োগ ও প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণ
সরকার দুই হাজার ছাব্বিশ সালে বিনিয়োগের পতন ঠেকানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন অনিশ্চিত। দক্ষতা বাড়ানো এবং অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা ঠেকাতে সরকার দাম কমানোর ক্ষতিকর প্রতিযোগিতা বন্ধে উদ্যোগ নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বড় কোনো পরিবর্তন না এলে অর্থনীতির এই দুই গতির চিত্র ভাঙা কঠিনই হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















