টানা কয়েক সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী বিক্ষোভ, ভেঙে পড়া অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় দমননীতির চাপে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্র আজ গভীর বৈধতা সংকটে। রাজপথ আপাতত শান্ত হলেও, শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও তীব্র হয়ে উঠছে।
রাস্তায় আতঙ্ক, রাষ্ট্রে অচলাবস্থা
টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা অস্থিরতার পর ইরানের বহু এলাকা কার্যত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। জনতার ওপর স্নাইপারদের গুলি, আকাশে নজরদারি ড্রোনের গুঞ্জন, নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে মরদেহঘরে ছুটে বেড়ানো পরিবার—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র আতঙ্ক। ঘর থেকে বের হওয়াই হয়ে উঠেছে বিপজ্জনক। এই পরিস্থিতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য সামরিক হামলার হুঁশিয়ারি সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
অতীত সংকট পেরিয়ে বর্তমান চ্যালেঞ্জ
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান অতীতেও একাধিক বড় সংকট মোকাবিলা করেছে। দুই হাজার নয় সালের বিতর্কিত নির্বাচন কিংবা দুই হাজার বাইশ সালের নারী নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের সময়ও অনেকেই শাসনব্যবস্থার পতন আসন্ন বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু প্রতিবারই কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতাসীনরা টিকে যায়। তবে গত আটাশ ডিসেম্বর শুরু হওয়া এই আন্দোলন আগের সব সংকটকে ছাপিয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা, যদিও সাম্প্রতিক সময়ে আন্দোলনের গতি কিছুটা কমেছে।
অর্থনীতি ও দমননীতির যুগপৎ চাপ
অর্থনৈতিক ধস, পরিবেশগত বিপর্যয় এবং ইসরায়েলের সঙ্গে বারো দিনের যুদ্ধ মিলিয়ে ইরান পার করেছে এক ভয়াবহ বছর। রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে সামাজিক চুক্তি কার্যত ভেঙে পড়েছে। রাষ্ট্র নাগরিকদের বাইরের হুমকি থেকে রক্ষা করতে পারছে না, নিশ্চিত করতে পারছে না ন্যূনতম জীবনযাত্রাও। ক্ষুব্ধ জনগণকে শান্ত করতে ব্যর্থ হয়ে সরকার সিরিয়ার সাবেক মিত্র বাশার আল আসাদের পথ অনুসরণ করছে। এই দমননীতি হয়তো সাময়িকভাবে শাসন টিকিয়ে রাখবে, কিন্তু পরিবর্তন যে আসবেই, তা প্রায় নিশ্চিত।

দোকানিদের ধর্মঘট থেকে গণআন্দোলন
গত মাসে তেহরানের দোকানিরা ধর্মঘটে গেলে খুব কম মানুষই ধারণা করেছিলেন, সেখান থেকেই এমন বড় আন্দোলনের সূচনা হবে। প্রথম দিকে আন্দোলন ছিল সীমিত, দুই হাজার বাইশ সালের তুলনায় ছোট পরিসরে। কিন্তু আট জানুয়ারি নির্বাসিত শাহপুত্র রেজা পাহলভি দেশবাসীকে একযোগে রাস্তায় নামার আহ্বান জানালে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। এতদিন তাকে গুরুত্ব না দিলেও এবার তার আহ্বানে মানুষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাড়া পড়ে।
ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন, দমন আরও নির্মম
এরপর শুরু হয় ব্যাপক বিক্ষোভ। ঠিক কত মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন, কারণ সরকার পুরোপুরি ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়। বিশ্বের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া ইরানে নিরাপত্তা বাহিনী চালায় নির্মম দমন অভিযান। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবে এ পর্যন্ত অন্তত চব্বিশ শতাধিক বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কয়েক হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে। বিচার বিভাগের প্রধান দ্রুত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের হুঁশিয়ারি দিলেও পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, সেগুলো সাময়িকভাবে স্থগিত রয়েছে।

চার দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ রক্তপাত
এই সহিংসতা গত সাতচল্লিশ বছরে ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বলে বিবেচিত হচ্ছে। দুই হাজার বাইশ সালের আন্দোলনে দুই মাসে প্রায় সাড়ে পাঁচশ মানুষ নিহত হয়েছিলেন। তার তুলনায় এবারের রক্তপাত বহু গুণ বেশি। এমনকি উনিশশত আটাশি সালের গণফাঁসিও এর সামনে ম্লান হয়ে যেতে পারে বলে মত বিশ্লেষকদের।
সরকারি বর্ণনা বনাম বাস্তবতা
কিছু বিক্ষোভকারী ছুরি কিংবা শিকারি বন্দুক নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুললেও সরকার নিজেদের নিরাপত্তা বাহিনীর মৃত্যুর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখিয়ে বিদেশি মদদের অভিযোগ তুলছে। তবু বিরোধী পক্ষের হিসাবেও দেড় শতাধিক নিরাপত্তাকর্মী নিহত হয়েছে।
ভেঙে পড়া অর্থনীতি, ক্ষুব্ধ সমাজ
এই সহিংসতার মূল কারণ একটাই—ক্ষুব্ধ জনগণের সামনে দেওয়ার মতো কার্যকর কোনো সমাধান সরকারের হাতে নেই। জুলাই থেকে মুদ্রার মান চল্লিশ শতাংশের বেশি পড়ে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমদানি পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া, মূল্যস্ফীতি প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ। প্রতি তিনজন ইরানির একজন দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। শিক্ষিত পেশাজীবীরাও কসাইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে উচ্ছিষ্টের আশায় থাকছেন। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মাত্র এক তৃতীয়াংশের নিয়মিত কাজ রয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা ও দুর্নীতির দুষ্টচক্র
এই দুরবস্থার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা বড় ভূমিকা রেখেছে, বিশেষ করে তেল খাতে আরোপিত কড়াকড়ি। পারমাণবিক চুক্তি বাতিলের পর এসব নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল হয়। তেলের অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত মধ্যস্বত্বভোগীরা আয় বিদেশে সরিয়ে নিচ্ছে। সরকার প্রায় সাতশ কোটি ডলারের নিখোঁজ রাজস্বের তদন্ত করছে বলে জানা গেছে।
দুর্নীতি ও কুশাসন সংকটকে আরও গভীর করেছে। বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী অর্থনীতির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। তেল থেকে ওষুধ, উৎপাদন থেকে বাণিজ্য—সবই তাদের নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ধর্মীয় নেতা ও সামরিক কমান্ডারদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো বিনা জামানতে ঋণ পায়। গত অক্টোবরে একটি বড় ব্যাংকের ধস নামলেও কারও জবাবদিহি নিশ্চিত হয়নি।
বিরোধীদের দুর্বলতা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
এই সবকিছু মানুষকে রাস্তায় নামিয়েছে। সরকারের নির্মম দমননীতিতে আপাতত তারা ঘরে ফিরলেও আন্দোলন যে শেষ, এমন নয়। বিরোধী শিবির এখনো সুস্পষ্ট কোনো পথনকশা হাজির করতে পারেনি। রেজা পাহলভি পরিবর্তনের কথা বললেও মাঠপর্যায়ে তার প্রভাব সীমিত। সেনা বা প্রশাসনের ভেতরেও বড় ধরনের ভাঙনের ইঙ্গিত এখনো নেই।
রাষ্ট্র ভাঙনের আশঙ্কা
অনেকে মনে করছেন, শাসনব্যবস্থার ভেতর থেকেই নেতৃত্ব বদলের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। আবার কারও আশঙ্কা, বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী ক্ষমতা আরও শক্তভাবে কুক্ষিগত করবে। তবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হলে তারাও একা অর্থনৈতিক সংকট সামাল দিতে পারবে না। আরও ভয়াবহ আশঙ্কা হলো, রাষ্ট্রই ভেঙে পড়তে পারে। জাতিগত বৈচিত্র্যে ভরা ইরানে প্রান্তিক অঞ্চলগুলো আলাদা পথে হাঁটার চেষ্টা করতে পারে, যা গোটা অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলবে।
ইতিহাস কি আবার ফিরে আসছে
প্রায় অর্ধশতক আগে শাহের পতনের যে কারণগুলো ছিল, আজও সেই একই সমস্যায় আক্রান্ত ইরান। তখন যা অসম্ভব মনে হয়েছিল, পরে তা অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ক্ষেত্রেও হয়তো ইতিহাস শেষ পর্যন্ত একই পথেই হাঁটবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















