ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হওয়া মানে শুধু ক্ষমতার শীর্ষে থাকা নয়, বরং বছরের নির্দিষ্ট কিছু আচার মেনে চলাও। নববর্ষের রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ, জাতীয় দিবসে সামরিক কুচকাওয়াজ পরিদর্শন এবং ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে প্যারিসের কৃষি প্রদর্শনীতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গরু ছুঁয়ে দেখা—এই তিন পর্বে আবর্তিত হয় রাষ্ট্রপ্রধানের ক্যালেন্ডার। এই কৃষি প্রদর্শনী শহুরে ফ্যাশন সপ্তাহের মতোই গ্রামবাংলার জন্য এক বড় মঞ্চ, যেখানে গরু হয়ে ওঠে তারকা আর কৃষকরা জানান নিজেদের ক্ষোভ। ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ একসময় এই আয়োজনকে এতটাই গুরুত্ব দিয়েছেন যে আন্তর্জাতিক বৈঠক ফেলে টানা তেরো ঘণ্টা সেখানে কাটিয়েছেন।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, ইউরোপের অর্থনীতিতে মাত্র প্রায় এক শতাংশ অবদান রাখা এবং ক্রমশ কমে আসা জনসংখ্যার একটি খাত কিভাবে এতদিন এমন রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রেখেছে। ইউরোপীয় রাজনীতিতে কৃষকরা দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষ সুবিধাভোগী। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট বাজেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ যায় কৃষি ভর্তুকিতে। সাধারণ কৃষি নীতির আওতায় কৃষকদের জন্য ন্যায্য জীবনমানের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, যা অন্য কোনো পেশার ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে বলা নেই।

তবে এই বিশেষ মর্যাদার ভিত এখন নড়বড়ে। সাম্প্রতিক একাধিক সিদ্ধান্তে স্পষ্ট হচ্ছে, কৃষকদের প্রতি রাজনৈতিক সহানুভূতির একচেটিয়া আধিপত্য আর আগের মতো অটুট নেই। জানুয়ারির মাঝামাঝি ইউরোপীয় ইউনিয়ন দক্ষিণ আমেরিকার বাণিজ্য জোটের সঙ্গে দীর্ঘদিনের আলোচিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে সায় দিয়েছে। এই চুক্তি এত বছর আটকে ছিল মূলত ইউরোপীয় কৃষকদের আপত্তিতে, যারা বিশ্বের বড় গবাদিপশু উৎপাদকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যেতে রাজি ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত শিল্প খাতের চাপেই চুক্তি এগিয়ে যায়।
এখানেই শেষ নয়। ইউক্রেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনাও ক্রমে বাস্তব হয়ে উঠছে। ইউক্রেনের উর্বর জমি আর বৃহৎ কৃষি কোম্পানির উপস্থিতি ইউরোপের কৃষকদের জন্য বড় আশঙ্কার কারণ। বর্তমান নিয়মে এই দেশ যুক্ত হলে ভর্তুকির বড় অংশই চলে যেতে পারে ইউক্রেনীয় কৃষকদের হাতে। ফলে কৃষক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে ভর্তুকি ব্যবস্থায় সম্ভাব্য কাটছাঁটের ইঙ্গিতে। ইউরোপীয় কমিশনের দীর্ঘমেয়াদী বাজেট প্রস্তাবে কৃষি ভর্তুকি বাস্তব অর্থমূল্যে প্রায় তিরিশ শতাংশ কমানোর ইশারা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশ রক্ষার নামে কীটনাশক ব্যবহার ও নিবিড় চাষের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এমনকি মাংস খাওয়া কমানোর পরামর্শ উঠে এসেছে নীতিনির্ধারকদের মুখে।

যদিও কৃষকরা পুরোপুরি উপেক্ষিত হননি। বাণিজ্য চুক্তিতে মাংস আমদানির কড়া সীমা রাখা হয়েছে। ভর্তুকি কাটছাঁটের কিছু পরিকল্পনা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমলাতান্ত্রিক নিয়ম, পশু কল্যাণ আর কীটনাশক ব্যবহারে কিছুটা শিথিলতা এসেছে। ইউক্রেন যদি ভবিষ্যতে ইউনিয়নে যোগ দেয়, সেখানকার কৃষকরা পূর্ণ সুবিধা পেতে বহু বছর অপেক্ষা করতে হবে।
তবু বাস্তবতা হলো, কৃষকদের রাজনৈতিক প্রভাব ধীরে ধীরে কমছে। কারণ ইউরোপের সামনে এখন নতুন অগ্রাধিকার। প্রতিরক্ষা ব্যয়, শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা আর ভূরাজনৈতিক চাপের যুগে কৃষিতে অতিরিক্ত খরচ আর আগের মতো যুক্তিসংগত মনে করা হচ্ছে না। একসময় কৃষকরা খাদ্য নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে নিজেদের গুরুত্ব বোঝাতেন। কিন্তু বর্তমান নীতিতে ইউরোপে খাদ্য উদ্বৃত্ত তৈরি হচ্ছে, যা রপ্তানিতে যাচ্ছে। ফলে আত্মনির্ভরতার যুক্তিও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
তবুও রাজনীতিবিদদের কাছে কৃষকদের শেষ শক্ত যুক্তি সামাজিক স্থিতিশীলতা। গ্রামীণ অঞ্চলে অসন্তোষ বাড়লে কট্টর ডানপন্থীরা লাভবান হয়। ফ্রান্সে গবাদি পশুর রোগ ছড়িয়ে পড়ায় কৃষি খাত আরও চাপে পড়েছে। এই রোগের কারণে আসন্ন কৃষি প্রদর্শনীতে এবার গরু থাকবে না। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেখানে কাটানোর সুযোগ না পেলে প্রেসিডেন্টের ভূমিকা কী হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















