ইস্তাম্বুলের গালাতা সেতুতে জানুয়ারির শুরুতে গাজা সমর্থনে আয়োজিত মিছিলে এক মধ্য বয়সী বক্তার কণ্ঠস্বর ও ভঙ্গি অনেকেরই পরিচিত মনে হয়েছে। তুরস্ক ও ফিলিস্তিনের পতাকা আঁকা স্কার্ফ গলায় ঝুলিয়ে তিনি ভিড়ের সামনে দাঁড়িয়ে যেসব বক্তব্য রাখছিলেন, সেগুলো বহু বছর ধরেই প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের মুখে শোনা। বক্তা ছিলেন এরদোয়ানের কনিষ্ঠ পুত্র বিলাল এরদোয়ান। এই উপস্থিতি থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তুরস্কের ক্ষমতার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে।
ক্ষমতার ছায়ায় বিলালের উত্থান
কোনো সরকারি পদে না থেকেও বিলাল ধীরে ধীরে রাজনৈতিক আলোচনায় ঢুকে পড়ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বাবার পাশে তার উপস্থিতি, সরকার ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন ফাউন্ডেশনের পরিচালনা পর্ষদে ভূমিকা এবং তুর্কি বিশ্বের ক্রীড়া উৎসব হিসেবে পরিচিত বিশ্ব যাযাবর ক্রীড়ার মুখ হয়ে ওঠা তাকে আলাদা করে নজরে এনেছে। গাজা যুদ্ধকে সামনে রেখে তিনি প্রকাশ্যে বাবার আরও ক্ষমতা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন, যা উত্তরাধিকার প্রশ্নে নতুন জল্পনা তৈরি করেছে।

এরদোয়ানের ক্ষমতার সীমা কোথায়
দুই দশকের বেশি সময় ধরে তুরস্ক শাসন করা এরদোয়ান ইতোমধ্যে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার প্রায় সব নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেছেন। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী তার মেয়াদ শেষ হবে দুই হাজার আটাশ সালে। আবার ক্ষমতায় থাকতে হলে সংবিধান বদলানো বা আগাম নির্বাচন ছাড়া পথ নেই। সংসদে প্রয়োজনীয় সমর্থন না থাকায় গণভোটের ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক তিনি। ফলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা, দুই হাজার সাতাশ সালের দিকে আগাম নির্বাচনের পথই বেছে নিতে পারেন।
উত্তরসূরি বাছাইয়ের অঘোষিত লড়াই
সরকারি বক্তব্যে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলছেন, এরদোয়ান ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু অন্দরমহলে ভিন্ন চিত্র। চারজনকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে ধরা হচ্ছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন প্রতিরক্ষা শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ও জামাতা সেলচুক বায়রাকতার, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুলেমান সোয়লু, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সাবেক গোয়েন্দা প্রধান হাকান ফিদান এবং বিলাল এরদোয়ান। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে ফিদান ও সোয়লু এগিয়ে থাকলেও বিলালও উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছেন।

হাকান ফিদানের বাড়তি সুবিধা
দীর্ঘদিন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান থাকার পর কূটনীতির শীর্ষ পদে ওঠা ফিদানের অভিজ্ঞতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। দেশীয় যুদ্ধবিমান প্রকল্প নিয়ে প্রকাশ্য মন্তব্য করে তিনি প্রমাণ করেছেন, প্রয়োজনে প্রেসিডেন্টের সাফল্যের গল্পেও প্রশ্ন তুলতে পারেন। এতে করে তার রাজনৈতিক ওজন আরও বেড়েছে।
অর্থনীতি ও জনপ্রিয়তার চ্যালেঞ্জ
উচ্চ সুদের হার, নতুন কর ও ব্যয় সংকোচনের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বেড়েছে। মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা কমলেও এখনও ত্রিশ শতাংশের ওপরে। জরিপে দেখা যাচ্ছে, এরদোয়ান নিজেও প্রধান বিরোধী নেতাদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছেন। এই পরিস্থিতিতে তার মনোনীত কোনো উত্তরসূরির জন্য লড়াই আরও কঠিন হবে, বিশেষ করে যদি নামের সঙ্গে এরদোয়ান যুক্ত থাকে।
রাজবংশ কি বাস্তব হবে
বিশ্লেষকদের মতে, তুরস্কের গণতন্ত্র দুর্বল হলেও পারিবারিক শাসন ধারণাটি এখনও বহু ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এরদোয়ানের ব্যক্তিগত বৈধতা থাকলেও সেই উত্তরাধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার সন্তানের হাতে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ফলে তুরস্কে এরদোয়ান-পরবর্তী অধ্যায় নিয়ে অনিশ্চয়তা ক্রমশ গভীর হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















