ইরানে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দেশটির শাসক ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিলেও বিদেশে থাকা বিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে পুরোনো বিভাজন আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের আগের সময় থেকে চলে আসা এই দ্বন্দ্ব আজও প্রবাসী বিরোধী রাজনীতিকে ক্ষতবিক্ষত করে রেখেছে। রাজতন্ত্রপন্থি ও বামপন্থি সংগঠনগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস ও দ্বন্দ্ব ইরানের অভ্যন্তরীণ আন্দোলনের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
ইরানে চলমান অস্থিরতা প্রবাসী বিরোধীদের সক্রিয় করলেও দেশের ভেতরে তাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সংশয় কাটেনি। বিশ্লেষক ও কূটনীতিকদের মতে, এই গোষ্ঠীগুলোর জনপ্রিয়তা মূলত প্রবাসী ইরানিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, দেশের অভ্যন্তরে নয়।
পুরোনো বিভাজন, নতুন বাস্তবতা
প্রবাসী বিরোধী রাজনীতির প্রধান বিভাজনটি রাজতন্ত্রপন্থি ও মুজাহিদিনে খালকের মধ্যে। একদিকে রয়েছেন অপসারিত শাহের পুত্র রেজা পাহলভির সমর্থকেরা, অন্যদিকে রয়েছে সংগঠিত বামপন্থি ও ইসলামি আদর্শের মিশ্রণে গড়া মুজাহিদিনে খালক। এই দ্বন্দ্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছাড়িয়ে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার রাজপথের বিক্ষোভেও প্রকাশ পেয়েছে।
অনেক প্রবাসী ইরানি এই দুই শিবিরের প্রতিই গভীর সন্দেহ পোষণ করেন। তবে তাদের কাছে এমন কোনো সংগঠিত নেটওয়ার্ক নেই, যা এই দুই গোষ্ঠীর মতো দৃশ্যমান ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে প্রবাসী বিরোধী রাজনীতি কার্যত কয়েকটি পুরোনো মুখ ও সংগঠনের মধ্যেই আবর্তিত হচ্ছে।
নেতৃত্বের সংকট ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি
ইরানে একটি সর্বজনগ্রাহ্য বিরোধী নেতৃত্ব বা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের অভাব আন্তর্জাতিক মহলের অবস্থানকেও জটিল করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন জানালেও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে স্পষ্ট ধারণা পাচ্ছে না। এমনকি রেজা পাহলভির দেশীয় সমর্থন নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নেতা ও কূটনীতিক।
লন্ডনের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞের মতে, ইরানে এখনো এমন কোনো অন্তর্ভুক্তিমূলক সংগঠন গড়ে ওঠেনি, যা ধর্মীয়, জাতিগত ও সামাজিক সব শ্রেণির মানুষকে এক ছাতার নিচে আনতে পারে। এই শূন্যতাই আন্দোলনের বড় দুর্বলতা।
রেজা পাহলভির অবস্থান
সাম্প্রতিক বিক্ষোভে ইরানের বিভিন্ন শহরে কিছু বিক্ষোভকারীকে রাজতন্ত্রের পক্ষে স্লোগান দিতে দেখা গেছে। এতে রেজা পাহলভির ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করা এই নেতা গণতন্ত্রের কথা বললেও বর্তমান ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে তিনি কী ভূমিকা নেবেন, তা স্পষ্ট করেননি।
তার সমর্থকেরা দাবি করেন, বিক্ষোভে তার নাম উচ্চারিত হওয়া প্রমাণ করে যে তিনি দেশকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষমতা রাখেন। তবে অনেক কূটনীতিক মনে করেন, পরিচিত বিকল্প নেতৃত্বের অভাবেই তার নাম সামনে আসছে, প্রকৃত গণভিত্তি এখনো অনিশ্চিত।

মুজাহিদিনে খালক ও বিতর্ক
মুজাহিদিনে খালক রাজতন্ত্র ও বর্তমান শাসনব্যবস্থা উভয়ের বিরোধিতা করে। তাদের স্লোগানেই স্পষ্ট, তারা কোনো রাজা বা সর্বোচ্চ নেতার ধারণা মানে না। তবে ইরান-ইরাক যুদ্ধকালে ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার ইতিহাসের কারণে সংগঠনটি দেশের ভেতরে ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয়।
অনেক ইরানির কাছে এই সংগঠনের অতীত সহিংসতা ও কঠোর অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা আজও নেতিবাচক স্মৃতি হয়ে আছে। ফলে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে তাদের প্রকাশ্য সমর্থনের কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ মেলেনি।
সমাজ বদলেছে, রাজনীতি আটকে আছে
১৯৭৯ সালের পর ইরানের জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে, বেড়েছে শহুরে ও শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা। এই নতুন প্রজন্মের বড় অংশ প্রবাসী রাজনীতির পুরোনো দ্বন্দ্বকে সেকেলে বলে মনে করে। দীর্ঘ সময় ধরে দেশের অভ্যন্তরের রাজনৈতিক আন্দোলনগুলো মূলত ব্যবস্থার সংস্কারেই সীমাবদ্ধ ছিল, পুরোপুরি উচ্ছেদের দিকে নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোর বিক্ষোভ আরও গভীর পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের মানুষ শুধু প্রবাসী নেতৃত্বের দিকেই তাকিয়ে নেই। তারা নিজেদের ভেতর থেকেই ভবিষ্যৎ পথ খুঁজতে চাইছে, যা প্রবাসী বিরোধী রাজনীতির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















