শীতের ঝোড়ো হাওয়ার মধ্যে গাজা শহরের উপকূলে অস্থায়ী তাঁবুতে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা পানির ক্যান হাতে জীবন টিকিয়ে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এই বাস্তবতার মধ্যেই গাজায় যুদ্ধ বন্ধের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করেছে। তবে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে বেশ কিছু মৌলিক প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
প্রথম ধাপের অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতা
গত বছরের অক্টোবর মাসে শুরু হওয়া প্রথম ধাপের মূল লক্ষ্য ছিল গাজায় সংঘর্ষ বন্ধ করা, মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা এবং হামাস ও তাদের সহযোগী গোষ্ঠীর হাতে আটক সব জীবিত ও নিহত ইসরায়েলি জিম্মিকে ফিরিয়ে আনা। এই ধাপে অধিকাংশ জিম্মিকে ফিরিয়ে আনা হলেও একজন ইসরায়েলির মরদেহ এখনও উদ্ধার হয়নি। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দোষারোপ চলছে। নিহত ব্যক্তির পরিবার দ্বিতীয় ধাপে যাওয়া বিলম্বিত করার আহ্বান জানালেও মধ্যস্থতাকারীরা এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ
হামাসের অভিযোগ, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরায়েল একাধিকবার আকাশ হামলা চালিয়েছে, বেসামরিক মানুষের ওপর গুলি করেছে এবং একটি অনানুষ্ঠানিক সীমারেখা অতিক্রম করেছে। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের দাবি, এই সময়ে শত শত মানুষ নিহত হয়েছে। ইসরায়েলের সেনাবাহিনী অবশ্য বলছে, নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করা সশস্ত্র ব্যক্তিদের লক্ষ্য করেই তারা অভিযান চালিয়েছে এবং একই সময়ে তাদেরও সেনা নিহত হয়েছে।
মানবিক সহায়তার সংকট
সহায়তা সংস্থাগুলোর মতে, প্রথম ধাপে যে পরিমাণ ত্রাণ প্রবেশের কথা ছিল, বাস্তবে তা অনুমোদন পায়নি। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও জ্বালানির তীব্র সংকট এখনও গাজায় বিদ্যমান। এ নিয়ে ইসরায়েল ও জাতিসংঘের মধ্যে ত্রাণবাহী যান প্রবেশের সংখ্যা নিয়ে মতবিরোধ অব্যাহত রয়েছে।
দ্বিতীয় ধাপে শাসন ও নিরস্ত্রীকরণ প্রশ্ন
দ্বিতীয় ধাপে গাজার দৈনন্দিন প্রশাসনের জন্য একটি পনেরো সদস্যের ফিলিস্তিনি প্রযুক্তিবিদ কমিটি গঠনের ঘোষণা এসেছে। এই কমিটি যুদ্ধ-পরবর্তী গাজা পরিচালনার দায়িত্ব পাবে, তবে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশ এখনও নেই। হামাসের শীর্ষ নেতারা বলছেন, আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া এই কমিটির কাজ এগোনো কঠিন হবে।

এই ধাপে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরস্ত্রীকরণ। ইসরায়েল প্রকাশ্য ও পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণকে অচল শর্ত হিসেবে দেখছে, যা হামাস এখনো মানতে প্রস্তুত নয়। পাশাপাশি গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি, যা ফিলিস্তিনিদের জন্য প্রধান উদ্বেগের কারণ।
আন্তর্জাতিক ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
পরিকল্পনায় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন এবং প্রশিক্ষিত ফিলিস্তিনি পুলিশ গড়ে তোলার কথাও রয়েছে। কূটনীতিকদের মতে, নিরস্ত্রীকরণ, সেনা প্রত্যাহার ও প্রশাসন নিয়ে দীর্ঘদিনের অবস্থান থেকে দুই পক্ষ সরে আসতে না পারলে দ্বিতীয় ধাপের সাফল্য কঠিন হয়ে পড়বে। সবকিছু নির্ভর করছে মধ্যস্থতাকারীদের চাপ ও উভয় পক্ষের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















