ব্রিটেনের রাজনীতিতে ডানপন্থী সংস্কার যুক্তরাজ্য দলের নেতা নাইজেল ফারাজকে ঘিরে নতুন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে রাশিয়া ও ভ্লাদিমির পুতিন। ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার মনে করছেন, ফ্যারাজের রাজনৈতিক উত্থান থামানোর সবচেয়ে দুর্বল জায়গাটি এখানেই। তার দাবি, ফ্যারাজের নেতৃত্বে ব্রিটেন ইউক্রেন পন্থী ইউরোপীয় জোট থেকে কার্যত সরে যেতে পারে। এই বক্তব্য কখনও সরাসরি, কখনো আবার সংসদের মেঝেতে ব্যঙ্গের সুরে উঠে এসেছে।
পুতিন প্রশ্নে ফ্যারাজের পুরোনো অবস্থান
নাইজেল ফারাজ বহুদিন ধরেই একটি অজনপ্রিয় মত তুলে ধরেছেন। তার মতে, রাশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর আগ্রাসনের পেছনে পশ্চিমা নেতৃত্বেরও দায় রয়েছে। সামরিক জোট ও ইউরোপীয় রাজনৈতিক জোটের সম্প্রসারণ মস্কোকে উসকে দিয়েছে বলে তিনি মনে করেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাকে ব্রিটিশ রাজনীতিতে আলাদা করে তুলেছে এবং ক্ষমতায় গেলে রাশিয়া ও ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে ব্রিটেনের অবস্থান কী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।

ইউক্রেন ও সেনা মোতায়েন নিয়ে দ্বন্দ্ব
প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ভবিষ্যৎ শান্তিচুক্তির অংশ হিসেবে ইউক্রেনে ব্রিটিশ সেনা মোতায়েনের নীতিগত ঘোষণা দিয়েছেন। ফ্যারাজ এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করছেন। তার যুক্তি, কেবল ব্রিটেন ও ফ্রান্সের পক্ষে এমন অভিযানের জন্য পর্যাপ্ত জনবল ও সরঞ্জাম নেই এবং এর কোনও নির্দিষ্ট শেষ সময়ও নেই। এই প্রশ্নে তার অবস্থান সরকারবিরোধী হলেও জনমনে তা বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।
সামরিক ব্যয় ও জোটের প্রতি সমর্থন
অন্যদিকে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ক্ষেত্রে ফ্যারাজ তুলনামূলক প্রচলিত অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তার দল ক্ষমতায় এলে সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ানো হবে এবং পূর্ব ইউরোপে জোটের সদস্য দেশগুলোর নিরাপত্তা রক্ষায় ব্রিটেনের দায়িত্ব বজায় থাকবে। তার বক্তব্যে স্পষ্ট, একবার কোনও দেশ সামরিক জোটের সদস্য হলে তাকে রক্ষা করা বাধ্যতামূলক। তবে একই সঙ্গে তিনি অতীতের সম্প্রসারণকে ঐতিহাসিক ভুল বলে উল্লেখ করেছেন।
ইউরোপীয় রাজনীতিতে ফ্যারাজের অতীত ভূমিকা
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য থাকাকালে ফ্যারাজ প্রায়ই ইউরোপীয় নেতৃত্বের সমালোচনা করেছেন। তার মতে, ইউরোপীয় জোট সোভিয়েত মানসিকতার প্রতিচ্ছবি এবং এর সম্প্রসারণ অনিবার্যভাবে রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাত ডেকে আনবে। জর্জিয়া আক্রমণ বা রাশিয়ার বিতর্কিত নির্বাচন ইস্যুতে ইউরোপীয় প্রস্তাবের বিরোধিতা করে তিনি বারবার বলেছেন, অন্য দেশের গণতন্ত্র নিয়ে নৈতিক ভাষণ দেওয়ার অধিকার ইউরোপের নেই।

ক্রিমিয়া থেকে ইউক্রেন যুদ্ধ পর্যন্ত বক্তব্য
দুই হাজার চৌদ্দ সালে ক্রিমিয়া দখলের সময় ফ্যারাজ ইউরোপীয় নেতাদের দোষারোপ করে বলেছিলেন, রাশিয়াকে ইচ্ছাকৃতভাবে উসকে দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হলে তিনি নিজেকে ভবিষ্যদ্বক্তা হিসেবে তুলে ধরেন এবং দাবি করেন, তিনি আগেই এই সংঘাতের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। এই ধরনের মন্তব্য তাকে সমর্থকদের কাছে দৃঢ়, আবার সমালোচকদের কাছে বিতর্কিত করে তুলেছে।
ব্যক্তিগত প্রশংসা ও প্রচার বিতর্ক
এক সময় ফ্যারাজ প্রকাশ্যে ভ্লাদিমির পুতিনের রাজনৈতিক দক্ষতার প্রশংসা করেছিলেন, যদিও মানবিক দিক থেকে নয় বলে উল্লেখ করেন। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে রাশিয়ার ভূমিকা নিয়েও তিনি প্রশংসাসূচক মন্তব্য করেন। পাশাপাশি রাশিয়ার রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে তার ঘন ঘন উপস্থিতি তাকে বাড়তি প্রচার দিলেও সমালোচনা বাড়িয়েছে।
দলের ভেতরের সংকেত ও জনমত
সংস্কার যুক্তরাজ্য দলের বিরুদ্ধে রুশ অর্থায়নের অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও দলের এক সাবেক নেতার ঘুষ কাণ্ড দলটির ভাবমূর্তিতে আঘাত করেছে। ব্রিটেনে পুতিন সাধারণভাবে অজনপ্রিয় এবং ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন তুলনামূলকভাবে বেশি। যদিও ফ্যারাজের ভোটাররা কিছুটা সন্দিহান, তবু তারা ইউরোপের অন্যান্য ডানপন্থী দলের সমর্থকদের মতো অতটা রুশপন্থী নন।
নির্বাচনের পথে সম্ভাব্য পরিবর্তন
নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ফ্যারাজের অবস্থান কিছুটা নরম হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তার পরামর্শক মহলের ভেতরে মতভেদ স্পষ্ট। কেউ কেউ রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পক্ষে, আবার কেউ ইউক্রেন ইস্যুকে অতিরঞ্জিত বলে মনে করেন। শেষ পর্যন্ত কোন পথে দল যাবে, সে সিদ্ধান্ত পুরোপুরি ফ্যারাজের হাতেই থাকবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















