জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই দেশের রাজনীতিতে অস্বস্তিকর এক বাস্তবতা সামনে আসছে। খুন, বিস্ফোরণ ও গণপিটুনির ঘটনায় ভোটের পরিবেশ নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। চার সপ্তাহ বাকি থাকলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণে আসবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
নির্বাচনী প্রস্তুতির মাঝপথে উদ্বেগ
নির্বাচন কমিশনের দাবি, রাজনৈতিক দলগুলো মোটের উপর আচরণবিধি মানছে। মনোনয়ন যাচাই শেষে আপিল প্রক্রিয়া চলছে এবং চূড়ান্ত প্রার্থীর তালিকা প্রকাশের অপেক্ষা। তবে এর মধ্যেই ধারাবাহিক সহিংস ঘটনায় নির্বাচনের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তফসিল ঘোষণার পরদিনই এক রাজনৈতিক নেতার হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এরপর বিভিন্ন এলাকায় দলীয় কোন্দল, গোলাগুলি ও বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ চলতে থাকে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে শান্তিপূর্ণ ভোটের আশা প্রকাশ করা হলেও বাস্তব চিত্র নিয়ে শঙ্কা কাটেনি।

খুন ও বিস্ফোরণে আতঙ্ক
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটে। কোথাও রাজনৈতিক নেতাকে গুলি করে হত্যা, কোথাও বোমা বিস্ফোরণে প্রাণহানি। এক এলাকায় বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণে তিন তরুণের মৃত্যু হয় এবং পরে বিপুল পরিমাণ হাতবোমা উদ্ধার করে পুলিশ।
এর আগে নারীদের ও শিশুদের আহত হওয়ার মতো বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি আরও গভীর হয়েছে।
গণপিটুনি ও অগ্নিসংযোগে জনমনে আতঙ্ক
শুধু রাজনৈতিক সহিংসতাই নয়, গণপিটুনির ঘটনায় উদ্বেগ বাড়িয়েছে। রাজধানীতে সড়ক বিরোধের জেরে একজন আইনজীবীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। অন্য জেলায় এক ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে ও পুড়িয়ে মারা হয়। কোথাও ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একজনকে হত্যা করে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
আরেক জেলায় অগ্নিসংযোগে একটি শিশুর মৃত্যু জনমনে গভীর ক্ষোভ সৃষ্টি করে। এসব ঘটনা নির্বাচনের আগের সামাজিক পরিবেশকে আরও ভঙ্গুর করে তুলেছে।

অস্ত্র উদ্ধারে ঘাটতি ও আইনি প্রশ্ন
গত বছরের আন্দোলনের সময় লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি। যদিও অভিযানে কিছু অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে, তবু নিখোঁজ অস্ত্রের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন স্থগিত চেয়ে আদালতে আবেদন করা হয়েছে।
বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা সরকারের ব্যর্থতার কথা তুলে ধরে অস্ত্র উদ্ধারে গাফিলতির অভিযোগ করেছেন। সাবেক শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তারাও বলেছেন, প্রত্যাশিত স্থিতিশীলতা এখনও আসেনি এবং কড়া নজরদারি জরুরি।
চার সপ্তাহে কতটা পরিবর্তন সম্ভব
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্প সময়ে বড় পরিবর্তন কঠিন হলেও অতিরিক্ত জনবল ও কঠোর ব্যবস্থায় কিছুটা উন্নতি সম্ভব। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধীদের আইনের আওতায় আনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মাঠে নামার প্রস্তুতিও নিচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের দমনে বাহিনীর সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে এবং কেউ নির্বাচন বানচাল করতে পারবে না। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দৃশ্যমান অগ্রগতির জন্য অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ দরকার।

আচরণবিধি নিয়ে স্বস্তি ও অস্বস্তি
আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু না হলেও সম্ভাব্য প্রার্থীরা ইতোমধ্যে শোডাউন ও প্রচারণায় ব্যস্ত। আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা এখনও খুব বেশি চোখে পড়েনি।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বর্তমান পরিস্থিতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে আরও উন্নতির আশা করছেন। নিয়মিত সমন্বয় সভা ও নজরদারির কথাও জানানো হয়েছে। কমিশনের পক্ষ থেকে কঠোর অবস্থানের আশ্বাস দেওয়া হলেও সংস্কার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আরও জোরালো বার্তা দরকার ছিল।
তাদের মতে, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা মাঠে নামলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই প্রতিদিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা, নিয়মিত সমন্বয় এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে জরুরি।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















