মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য বড় সংঘাতের আশঙ্কা কাটিয়ে আপাতত স্বস্তির বার্তা মিলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা কমাতে সক্রিয় কূটনীতিতে নেমে সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও মিশর গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করেছে। এর ফলেই অন্তত এই মুহূর্তে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ থেকে সরে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র।
আরব কূটনৈতিক তৎপরতায় সংঘাত এড়ানোর চেষ্টা
উপসাগরীয় এক কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে শক্তি প্রয়োগের জেরে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে চারটি আরব দেশ টানা আটচল্লিশ ঘণ্টা ধরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখে। তাদের আশঙ্কা ছিল, কোনো হামলা হলে তার প্রভাব গোটা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে, যা নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করবে।
এই কূটনৈতিক উদ্যোগের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন যে আপাতত হামলার সিদ্ধান্ত থেকে তিনি সরে এসেছেন। তাঁর বক্তব্য, ইরানে প্রাণহানি কমছে বলেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ট্রাম্পের মন্তব্য ও বাজারের প্রতিক্রিয়া
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প এক ইরানি বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড না হওয়ার খবরে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, এটি ভালো খবর এবং পরিস্থিতি আরও উন্নত হবে বলেই তিনি আশা করেন। ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম জানায়, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাবিরোধী অভিযোগে অভিযুক্ত হলেও সংশ্লিষ্ট মামলায় মৃত্যুদণ্ড প্রযোজ্য নয়।
এই মন্তব্যের প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক বাজারেও। তেলের দাম কয়েক মাসের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে কিছুটা নেমে আসে এবং স্বর্ণের দামও রেকর্ড উচ্চতা থেকে কমে যায়।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের কাছে আরব বার্তা
চার আরব দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ইরানে হামলা হলে তার নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রভাব শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকেও ভোগাতে পারে। একই সঙ্গে তারা ইরানকে সতর্ক করেছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনায় কোনো প্রতিশোধমূলক হামলা চালালে তেহরানের সঙ্গে আঞ্চলিক দেশগুলোর সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
যদিও সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও মিশরের সংশ্লিষ্ট দপ্তর গুলো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হয়নি, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত রাখতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে।

বৃহত্তর অস্থিরতা এড়ানোর কৌশল
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য কমানো এবং এমন কোনো সামরিক পদক্ষেপ ঠেকানো, যা গোটা অঞ্চলকে অস্থির করে তুলতে পারে। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার পথও খুলে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উপসাগরীয় দেশগুলোর আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতে তাদের দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে, যা আঞ্চলিক অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা হবে।
ইরানের ভেতরের পরিস্থিতি
ইরানের ভেতর থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, সোমবারের পর থেকে বিক্ষোভের তীব্রতা কিছুটা কমেছে। তবে টানা এক সপ্তাহের ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় তথ্য প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, সরকার অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় পদক্ষেপ নিতে চায়। দুর্নীতি দমন, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ এবং দরিদ্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।

তবু অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে
হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প বলেছেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং ইরানের পক্ষ থেকে একটি ইতিবাচক বার্তা পাওয়া গেছে। তবে ভবিষ্যতে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা তিনি পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প আপাতত পিছু হটলেও তাঁর অবস্থান এখনও অনিশ্চিত। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি একটি কৌশলগত অচলাবস্থায় রয়েছে, যদিও এখনই শাসনব্যবস্থার পতনের আশঙ্কা দেখছেন না তারা।
আঞ্চলিক নিরাপত্তায় সাম্প্রতিক পরিবর্তন
কাতারের আল উদেইদ ঘাঁটিতে নিরাপত্তা সতর্কতা স্তর কমানো হয়েছে এবং সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া কিছু মার্কিন বিমান ধীরে ধীরে ফিরে আসছে। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে ফোনালাপেও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এরই মধ্যে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যে ইরানে চলমান সহিংসতায় হাজার হাজার বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর দাবি উঠে এসেছে, যা সাম্প্রতিক দশকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















