০৪:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬
তুরস্কের ক্ষমতার উত্তরাধিকার যুদ্ধ শুরু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বানানো ইরান বিক্ষোভের ভিডিওতে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে অনলাইনে ইরানে বিক্ষোভে প্রবাসী বিরোধীদের ভাঙন, নেতৃত্বহীন আন্দোলনে জটিলতা আশা ভোঁসলের হাতে উন্মোচিত হচ্ছে ‘দ্য রয়্যাল হায়দরাবাদি টেবিল’, দুবাই ও আবুধাবিতে নস্টালজিয়ার স্বাদ সংযুক্ত আরব আমিরাতের সুর যখন বিশ্বমঞ্চে ভারতীয় বংশোদ্ভূত দিলপ্রীত বাজওয়ার নেতৃত্বে টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কানাডা গাজা যুদ্ধবিরতি দ্বিতীয় ধাপে, নিরস্ত্রীকরণ ও সেনা প্রত্যাহার নিয়ে অনিশ্চয়তা ইউরোপে কৃষকদের একচ্ছত্র দাপটের শেষের শুরু রুশ সাবমেরিন ঠেকাতে ব্রিটেনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর সমুদ্র কৌশল নাইজেল ফারাজ ও পুতিন প্রশ্নে ব্রিটিশ রাজনীতির নতুন টানাপোড়েন

সংস্কারের নাম করে স্থবিরতা: ব্রিটিশ রাজনীতিতে রিফর্ম দলের ঝুঁকিপূর্ণ উত্থান

ব্রিটেনের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ তৈরি হয়েছে। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা কনজারভেটিভ অ্যান্ড ইউনিয়নিস্ট পার্টি কার্যত অস্তিত্ব সংকটে। এই শূন্যতায় যে নতুন শক্তি উঠে আসছে, সেটি রিফর্ম ইউকে। কিন্তু দ্য ইকোনমিস্ট এশিয়া প্যাসিফিকের বিশ্লেষণ বলছে, এই দল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তারা ব্রিটেনের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাকে আরও আটকে দিতে পারে।

মৃত্যুপথযাত্রী কনজারভেটিভ ও নতুন আশ্রয়
জানুয়ারির মাঝামাঝি লন্ডনের এক অভিজাত মিলনায়তনে সাবেক কনজারভেটিভ এমপি নাদিম জাহাওয়ি প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন যে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হওয়া উচিত নাইজেল ফারাজের। এই বক্তব্য শুধু ব্যক্তিগত মত নয়, বরং কনজারভেটিভ রাজনীতির অবসান মেনে নেওয়ার প্রতীক। ব্রিটিশ ইতিহাসে এমন ঘটনা খুব কমই ঘটেছে। এক শতাব্দী আগে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর লিবারেল পার্টির পতন যেমন নতুন রাজনৈতিক ধারার জন্ম দিয়েছিল, তেমনি এবারও একটি বড় রূপান্তরের সুযোগ ছিল।

কিন্তু সমস্যা হলো, রিফর্ম ইউকে সেই নতুন ধারার বাহক হয়ে উঠছে না। বরং পুরোনো, ব্যর্থ চিন্তাধারাকেই নতুন মোড়কে টিকিয়ে রাখছে।

What now for Britain's right-wing parties?

শক্ত ঘোড়ার রাজনীতি ও পুরোনো মুখ
রিফর্ম ইউকে নিজেদের দক্ষ ও সাহসী নেতৃত্বের দল হিসেবে তুলে ধরছে। তাদের বক্তব্যে ‘উচ্চ সক্ষমতা’ আর ‘সেরা মানুষ’ বাছাইয়ের কথা শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কর কেলেঙ্কারিতে চাকরি হারানো রাজনীতিকরাও এই দলে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছেন। এতে বোঝা যায়, দলের কথার সঙ্গে কাজের মিল কম।

ব্রিটিশ রাজনীতি এখানে বাম ও ডানের লড়াই নয়, বরং একই শিবিরের ভেতরে আধিপত্যের লড়াই। শক্তিশালী দেখালেই মানুষ আকৃষ্ট হয়। রিফর্ম সেই মনস্তত্ত্ব কাজে লাগাচ্ছে, কিন্তু নতুন কোনো দিকনির্দেশনা দিচ্ছে না।

অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও নীতির পুনরাবৃত্তি
ব্রিটেনের মূল সমস্যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অভাব। ঘরবাড়ি নির্মাণ সহজ করা, বিদেশি দক্ষ জনশক্তিকে স্বাগত জানানো, ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য সহজ করা—এই বিষয়গুলো অর্থনীতিকে চাঙা করতে পারত। কিন্তু রিফর্ম ইউকে এসবের বিরোধী, ঠিক যেমন কনজারভেটিভরা ছিল।

কনজারভেটিভরা শেষ দিকে এমন নীতিতে আটকে পড়েছিল যা প্রবীণ ভোটারদের খুশি করলেও দেশের ভবিষ্যৎকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। রিফর্মও একই পথে হাঁটছে। ফলে কয়েক বছরের মধ্যেই তারা কনজারভেটিভ এর জায়গায় দাঁড়িয়ে একই ভুলের ভার বহন করবে।

Reform takes record 10-point lead over Labour - boosting Farage's PM hopes  : r/unitedkingdom

বিপ্লবের ভাষা, পুরোনো বাস্তবতা
রিফর্ম নিজেদের বিপ্লবী শক্তি হিসেবে তুলে ধরে। তারা রাষ্ট্রযন্ত্র, بيرোক্রেসি আর আধা-স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা ব্যবহার করে। কিন্তু প্রস্তাবিত সমাধানগুলো নতুন নয়। সরকারি কর্মচারী সংখ্যা কমানোর পরিকল্পনা আগেও নেওয়া হয়েছে এবং তাতে কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি।

লন্ডনে নির্বাচিত হলে পরিবেশ সুরক্ষা নীতির একটি বড় উদ্যোগ বাতিলের কথাও তারা বলছে। স্কুলে দেশপ্রেমিক পাঠ্যক্রম চালুর প্রস্তাব এসেছে এমন সময়ে, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যৎ চাকরির বাজারকে অনিশ্চিত করে তুলছে। এসব সিদ্ধান্ত আধুনিক সমস্যার সঙ্গে খাপ খায় না।

নস্টালজিয়ার রাজনীতি ও হারানো সুযোগ
রিফর্ম যে নস্টালজিয়া বিক্রি করছে, তা উইনস্টন চার্চিল বা মার্গারেট থ্যাচারের যুগে ফেরার স্বপ্ন নয়। বরং কনজারভেটিভ শাসনের শেষ দিকের অগোছালো নীতিনির্ধারণ আর অভিযোগের রাজনীতিরই পুনরাবৃত্তি।

এই পরিণতি অনিবার্য ছিল না। একটি আধুনিক ডানপন্থী দল ব্রিটেনের অর্থনীতি ও প্রশাসন কে কার্যকর করতে পারত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, পরিচিত স্লোগান আর নতুন মাধ্যমের মাধ্যমে পুরোনো বার্তাই আবার শোনানো হচ্ছে।

When reality bites: the rapid rise and chaotic fall of Reform UK in  Cornwall | Reform UK | The Guardian

এক শতাব্দীর সুযোগ, কিন্তু ফলাফল শূন্য
লিবারেল পার্টির পতনের পর ব্রিটিশ সমাজতন্ত্রের উত্থান যেমন নতুন দিগন্ত খুলেছিল, কনজারভেটিভদের পতনের পরও তেমন কিছু হওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু রিফর্ম ইউকের বর্তমান গতিপথ বলছে, তারা অতীত থেকে কিছু শেখেনি।

ব্রিটেনের প্রয়োজন ছিল ছোট অক্ষরের সংস্কার, বাস্তব ও গভীর পরিবর্তন। রিফর্ম সেই পথ দেখাতে পারছে না। বরং তারা দেশের অসুস্থতার আরেকটি লক্ষণে পরিণত হচ্ছে। এই ঐতিহাসিক সুযোগ নষ্ট হওয়াই সবচেয়ে বড় ক্ষতি।

জনপ্রিয় সংবাদ

তুরস্কের ক্ষমতার উত্তরাধিকার যুদ্ধ শুরু

সংস্কারের নাম করে স্থবিরতা: ব্রিটিশ রাজনীতিতে রিফর্ম দলের ঝুঁকিপূর্ণ উত্থান

০২:৫৩:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬

ব্রিটেনের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ তৈরি হয়েছে। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা কনজারভেটিভ অ্যান্ড ইউনিয়নিস্ট পার্টি কার্যত অস্তিত্ব সংকটে। এই শূন্যতায় যে নতুন শক্তি উঠে আসছে, সেটি রিফর্ম ইউকে। কিন্তু দ্য ইকোনমিস্ট এশিয়া প্যাসিফিকের বিশ্লেষণ বলছে, এই দল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তারা ব্রিটেনের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাকে আরও আটকে দিতে পারে।

মৃত্যুপথযাত্রী কনজারভেটিভ ও নতুন আশ্রয়
জানুয়ারির মাঝামাঝি লন্ডনের এক অভিজাত মিলনায়তনে সাবেক কনজারভেটিভ এমপি নাদিম জাহাওয়ি প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন যে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হওয়া উচিত নাইজেল ফারাজের। এই বক্তব্য শুধু ব্যক্তিগত মত নয়, বরং কনজারভেটিভ রাজনীতির অবসান মেনে নেওয়ার প্রতীক। ব্রিটিশ ইতিহাসে এমন ঘটনা খুব কমই ঘটেছে। এক শতাব্দী আগে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর লিবারেল পার্টির পতন যেমন নতুন রাজনৈতিক ধারার জন্ম দিয়েছিল, তেমনি এবারও একটি বড় রূপান্তরের সুযোগ ছিল।

কিন্তু সমস্যা হলো, রিফর্ম ইউকে সেই নতুন ধারার বাহক হয়ে উঠছে না। বরং পুরোনো, ব্যর্থ চিন্তাধারাকেই নতুন মোড়কে টিকিয়ে রাখছে।

What now for Britain's right-wing parties?

শক্ত ঘোড়ার রাজনীতি ও পুরোনো মুখ
রিফর্ম ইউকে নিজেদের দক্ষ ও সাহসী নেতৃত্বের দল হিসেবে তুলে ধরছে। তাদের বক্তব্যে ‘উচ্চ সক্ষমতা’ আর ‘সেরা মানুষ’ বাছাইয়ের কথা শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কর কেলেঙ্কারিতে চাকরি হারানো রাজনীতিকরাও এই দলে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছেন। এতে বোঝা যায়, দলের কথার সঙ্গে কাজের মিল কম।

ব্রিটিশ রাজনীতি এখানে বাম ও ডানের লড়াই নয়, বরং একই শিবিরের ভেতরে আধিপত্যের লড়াই। শক্তিশালী দেখালেই মানুষ আকৃষ্ট হয়। রিফর্ম সেই মনস্তত্ত্ব কাজে লাগাচ্ছে, কিন্তু নতুন কোনো দিকনির্দেশনা দিচ্ছে না।

অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও নীতির পুনরাবৃত্তি
ব্রিটেনের মূল সমস্যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অভাব। ঘরবাড়ি নির্মাণ সহজ করা, বিদেশি দক্ষ জনশক্তিকে স্বাগত জানানো, ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য সহজ করা—এই বিষয়গুলো অর্থনীতিকে চাঙা করতে পারত। কিন্তু রিফর্ম ইউকে এসবের বিরোধী, ঠিক যেমন কনজারভেটিভরা ছিল।

কনজারভেটিভরা শেষ দিকে এমন নীতিতে আটকে পড়েছিল যা প্রবীণ ভোটারদের খুশি করলেও দেশের ভবিষ্যৎকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। রিফর্মও একই পথে হাঁটছে। ফলে কয়েক বছরের মধ্যেই তারা কনজারভেটিভ এর জায়গায় দাঁড়িয়ে একই ভুলের ভার বহন করবে।

Reform takes record 10-point lead over Labour - boosting Farage's PM hopes  : r/unitedkingdom

বিপ্লবের ভাষা, পুরোনো বাস্তবতা
রিফর্ম নিজেদের বিপ্লবী শক্তি হিসেবে তুলে ধরে। তারা রাষ্ট্রযন্ত্র, بيرোক্রেসি আর আধা-স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা ব্যবহার করে। কিন্তু প্রস্তাবিত সমাধানগুলো নতুন নয়। সরকারি কর্মচারী সংখ্যা কমানোর পরিকল্পনা আগেও নেওয়া হয়েছে এবং তাতে কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি।

লন্ডনে নির্বাচিত হলে পরিবেশ সুরক্ষা নীতির একটি বড় উদ্যোগ বাতিলের কথাও তারা বলছে। স্কুলে দেশপ্রেমিক পাঠ্যক্রম চালুর প্রস্তাব এসেছে এমন সময়ে, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যৎ চাকরির বাজারকে অনিশ্চিত করে তুলছে। এসব সিদ্ধান্ত আধুনিক সমস্যার সঙ্গে খাপ খায় না।

নস্টালজিয়ার রাজনীতি ও হারানো সুযোগ
রিফর্ম যে নস্টালজিয়া বিক্রি করছে, তা উইনস্টন চার্চিল বা মার্গারেট থ্যাচারের যুগে ফেরার স্বপ্ন নয়। বরং কনজারভেটিভ শাসনের শেষ দিকের অগোছালো নীতিনির্ধারণ আর অভিযোগের রাজনীতিরই পুনরাবৃত্তি।

এই পরিণতি অনিবার্য ছিল না। একটি আধুনিক ডানপন্থী দল ব্রিটেনের অর্থনীতি ও প্রশাসন কে কার্যকর করতে পারত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, পরিচিত স্লোগান আর নতুন মাধ্যমের মাধ্যমে পুরোনো বার্তাই আবার শোনানো হচ্ছে।

When reality bites: the rapid rise and chaotic fall of Reform UK in  Cornwall | Reform UK | The Guardian

এক শতাব্দীর সুযোগ, কিন্তু ফলাফল শূন্য
লিবারেল পার্টির পতনের পর ব্রিটিশ সমাজতন্ত্রের উত্থান যেমন নতুন দিগন্ত খুলেছিল, কনজারভেটিভদের পতনের পরও তেমন কিছু হওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু রিফর্ম ইউকের বর্তমান গতিপথ বলছে, তারা অতীত থেকে কিছু শেখেনি।

ব্রিটেনের প্রয়োজন ছিল ছোট অক্ষরের সংস্কার, বাস্তব ও গভীর পরিবর্তন। রিফর্ম সেই পথ দেখাতে পারছে না। বরং তারা দেশের অসুস্থতার আরেকটি লক্ষণে পরিণত হচ্ছে। এই ঐতিহাসিক সুযোগ নষ্ট হওয়াই সবচেয়ে বড় ক্ষতি।