মিনিয়াপোলিস শহরের কনকনে শীতে এক অদ্ভুত দৃশ্য এখন নিয়মিত। স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন প্রবীণ মানুষ, গায়ে উজ্জ্বল জ্যাকেট, হাতে শিস আর ওয়াকিটকি। শিশুদের পড়াশোনার নিরাপত্তা রক্ষায় নয়, বরং ফেডারেল অভিবাসন বাহিনীর সম্ভাব্য অভিযানের আশঙ্কায় তারা পাহারা দিচ্ছেন স্কুল চত্বর। সাম্প্রতিক আইসিই অভিযানের পর শহরের অভিভাবক, শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ভয় ও ক্ষোভ একসঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে।
স্কুলের সামনে শীতের পাহারা
গ্রিন সেন্ট্রাল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাইরে এক শুক্রবার বিকেলে দাঁড়িয়ে ছিলেন একাশি বছর বয়সী পিটার ব্রাউন। প্রবল শীত আর বরফে ঢাকা মুখ নিয়ে তিনি নজর রাখছিলেন প্রতিটি গাড়ি আর পথচারীর দিকে। যেখানে সম্প্রতি এক অভিবাসন কর্মকর্তার গুলিতে রেনি গুড নিহত হয়েছেন, সেই এলাকাতেই অবস্থিত এই স্কুল। ইংরেজি ও স্প্যানিশ মাধ্যমে পড়ানো এই প্রতিষ্ঠানের সামনে দাঁড়িয়ে ব্রাউন জানালেন, তিনি কোনো অন্যায়কে মেনে নিতে পারেন না। তার ভাষায়, শহরে যা হচ্ছে তা ক্ষমতার ভয় দেখানো ছাড়া কিছু নয়, আর প্রতিবেশীরা তা মেনে নেবেন না।

অভিভাবকদের স্বতঃস্ফূর্ত পাহারা
বর্তমান প্রশাসনের নির্দেশে মিনিয়াপোলিস ও সেন্ট পল এলাকায় বিপুল সংখ্যক ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তা মোতায়েন করা হয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে স্কুলপড়ুয়া শিশুদের ওপর। যেখানে একসময় অভিভাবকরা অভিভাবক সমিতির বৈঠক নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, সেখানে এখন তারা স্কুল পাহারার সময়সূচি ঠিক করছেন। কেউ কেউ বিদেশে জন্ম নেওয়া শিক্ষক ও কর্মীদের বাড়ি থেকে স্কুলে যাতায়াতে সহায়তা করছেন, যাতে তারা নিরাপদ বোধ করেন।
ভয়ের কারণে ঘরবন্দি অনেক অভিবাসী পরিবার। তাদের জন্য অভিভাবকেরাই খাবার ও ওষুধ পৌঁছে দিচ্ছেন। কাজ বন্ধ থাকায় ভাড়া দিতে না পারা পরিবারগুলোর জন্য তহবিল সংগ্রহও চলছে।
রাজনৈতিক উদ্বেগ ও সরকারি অস্বীকার
মিনেসোটা থেকে নির্বাচিত সিনেটর অ্যামি ক্লোবুচার জানিয়েছেন, তিনি স্কুলপ্রধানদের কাছ থেকে শিশু ও অভিভাবকদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা শুনেছেন। ছোট শিশুরা আতঙ্কিত, বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, বিষয়টি আর সাধারণ তদন্তে সীমাবদ্ধ নেই।
তবে স্বরাষ্ট্র দপ্তরের দাবি ভিন্ন। তাদের বক্তব্য, স্কুলকে লক্ষ্য করে কোনো অভিযান চালানো হচ্ছে না এবং শিশুদের নিরাপত্তাই তাদের উদ্দেশ্য। কর্মকর্তারা বলছেন, শুধুমাত্র জননিরাপত্তার ঝুঁকি থাকলেই স্কুল চত্বরে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে, যদিও বাস্তবে এমন ঘটনা ঘটেনি বলে তারা দাবি করছেন।

স্কুল কর্তৃপক্ষের ভিন্ন অভিজ্ঞতা
অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতা অবশ্য সরকারি বক্তব্যের সঙ্গে মিলছে না। সেন্ট পল এলাকার স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের পরিবহন ভ্যান থামিয়ে তল্লাশি চালানো হয়েছে। কোথাও কোথাও শিক্ষক ও কর্মীদের আটকের খবর জানিয়ে অভিভাবকদের ইমেইল পাঠানো হয়েছে।
কিছু এলাকায় বাসস্টপে শিশু নামিয়ে দেওয়ার পর অভিভাবকদের আটকানোর ঘটনাও ঘটেছে বলে জানানো হয়েছে। এক উচ্চবিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীদের ছুটির সময় প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।
অনলাইনে ঝুঁকছে পড়াশোনা
এই পরিস্থিতিতে মিনিয়াপোলিস ও সেন্ট পলসহ বড় স্কুল জেলাগুলো ক্লাস বাতিল বা অনলাইনে পাঠদান চালু করেছে। অভিবাসন অধ্যুষিত এলাকায় শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রগুলোতে উপস্থিতি অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। কিছু কর্মীকেও আটক করা হয়েছে বলে জানানো হচ্ছে।

অভিভাবকদের বদলে যাওয়া জীবন
এক অভিভাবক কেলি জানান, আগে তিনি স্কুলের নানা স্বেচ্ছাসেবী কাজে যুক্ত ছিলেন। এখন তিনি সবসময় শিস সঙ্গে রাখেন এবং প্রয়োজনে স্কুলের সামনে ফেডারেল কর্মকর্তাদের মুখোমুখি হওয়ার মানসিক প্রস্তুতি নিয়েছেন। তার ভাষায়, সন্তানদের বোঝানোর মতো কোনো অভিভাবকত্বের বই নেই যে কেন হঠাৎ করে সহপাঠীরা স্কুলে আসা বন্ধ করে দিয়েছে।
মিনিয়াপোলিসে এখন অভিভাবকত্ব মানে শুধু সন্তান লালন নয়, বরং ভয় আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও প্রতিবাদের সাহস জাগিয়ে রাখা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















