যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকার প্রশাসনিক দায়িত্ব পেলেন ফিলিস্তিনি বেসামরিক প্রকৌশলী ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ড. আলি শাথ। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে গৃহীত নতুন পরিকল্পনার আওতায় তিনি গাজার পুনর্গঠন ও প্রশাসন পরিচালনার জন্য গঠিত পনেরো সদস্যের ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। ড. শাথের ঘোষণা, আগামী সাত বছরের মধ্যেই গাজা আগের চেয়েও ভালো অবস্থায় ফিরে আসবে।
নতুন প্রশাসনের সূচনা
চলতি মাসের পনেরো তারিখ ড. আলি শাথের নিয়োগের মাধ্যমে গাজায় নতুন প্রশাসনিক অধ্যায়ের সূচনা হয়। এই নিয়োগকে ইসরায়েল ও গাজায় চলমান যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন হামাসের নিয়ন্ত্রণে থাকা গাজা উপত্যকায় এবার প্রশাসনিক দায়িত্ব যাচ্ছে নিরপেক্ষ প্রযুক্তিবিদদের হাতে।

যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ ও কঠিন বাস্তবতা
ট্রাম্পের পরিকল্পনার আওতায় ইসরায়েল গাজার প্রায় অর্ধেক এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার করলেও বাকি অংশ এখনও তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেই এলাকাগুলো প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। গাজাজুড়ে প্রায় আটষট্টি মিলিয়ন টন ধ্বংসাবশেষ ও অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ ছড়িয়ে রয়েছে, যা পরিষ্কার করাই হবে ড. শাথের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যেই ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রয়েছে।
সমুদ্রে ধ্বংসাবশেষ ঠেলে নতুন ভূমি
গাজার পুনর্গঠনে ড. শাথ একটি ব্যতিক্রমী প্রস্তাব দিয়েছেন। অতীতে সংঘাতের পর গাজার মানুষ ধ্বংসস্তূপ ব্যবহার করে গাজা শহরের ঐতিহাসিক নৌবন্দরসহ বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তুলেছিল। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি বলেন, ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে ধ্বংসাবশেষ ভূমধ্যসাগরে ঠেলে দিয়ে নতুন দ্বীপ বা নতুন ভূমি তৈরি করা যেতে পারে। এতে একদিকে গাজা নতুন জমি পাবে, অন্যদিকে তিন বছরের মধ্যে ধ্বংসস্তূপও সরানো সম্ভব হবে।
প্রাথমিক অগ্রাধিকার কী
ড. শাথের ভাষ্য অনুযায়ী, তার প্রথম অগ্রাধিকার হবে জরুরি ত্রাণ ও বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা। এরপর গুরুত্ব দেওয়া হবে বিদ্যুৎ, পানি ও যোগাযোগব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পুনর্বাসনে। শেষ ধাপে শুরু হবে ঘরবাড়ি ও অন্যান্য ভবনের পূর্ণাঙ্গ পুনর্নির্মাণ।
জাতিসংঘের হিসাব ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ
দুই হাজার চব্বিশ সালে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গাজার ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরবাড়ি পুনর্গঠনে অন্তত দুই হাজার চল্লিশ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে, এমনকি তা আরও দীর্ঘ হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে ড. শাথের আশাবাদী সময়সূচি বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। বিশেষ করে হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ, শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন এবং ভারী যন্ত্রপাতি আমদানির অনুমতি পাওয়া বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ড. আলি শাথের পটভূমি
ড. শাথ দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস এলাকার বাসিন্দা। তিনি পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের উপপরিকল্পনা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই সময়ে পশ্চিম তীর ও গাজায় একাধিক শিল্পাঞ্চল উন্নয়নের কাজ তদারকি করেছেন তিনি। বর্তমানে তিনি পশ্চিম তীরেই বসবাস করছেন।

সম্পূর্ণ গাজার নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য
ড. শাথ জানিয়েছেন, তার নেতৃত্বাধীন কমিটির কর্তৃত্ব শুরুতে হামাস নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে কার্যকর হবে। পরে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গে এই কর্তৃত্ব ধীরে ধীরে বাড়বে। চূড়ান্তভাবে সমুদ্র থেকে পূর্ব সীমান্ত পর্যন্ত পুরো গাজা উপত্যকার প্রশাসনিক দায়িত্ব এই কমিটির হাতে থাকবে বলে তিনি আশাবাদী।
হামাসের সমর্থন ও ভঙ্গুর চুক্তি
এই কমিটি গঠনে হামাসও সমর্থন জানিয়েছে। কায়রোতে গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্যান্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর সঙ্গে হামাসের আলোচনা চলছে। হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা বাসেম নাইম বলেছেন, এখন মধ্যস্থতাকারী, মার্কিন গ্যারান্টর ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর দায়িত্ব রয়েছে এই কমিটিকে কার্যকরভাবে ক্ষমতায়িত করার।
তবে গত অক্টোবরের চুক্তি নানা কারণে নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। ইসরায়েলি বিমান হামলায় গাজায় শত শত মানুষের মৃত্যু, এক ইসরায়েলি জিম্মির মরদেহ উদ্ধার না হওয়া এবং মিসরের সঙ্গে সীমান্ত পারাপার পুনরায় খুলতে দেরি হওয়ায় চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















