যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সদ্য ঘোষিত বাণিজ্য চুক্তি তাইওয়ানের তথাকথিত সিলিকন ঢালকে দুর্বল করবে না বলে মনে করছেন দেশটির সরকারি কর্মকর্তা ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা। উন্নত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে তাইওয়ানের আধিপত্যই যে সম্ভাব্য চীনা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি বড় কৌশলগত প্রতিরোধ, সেই বিশ্বাসে এখনই ফাটল ধরছে না বলেই মত তাঁদের।
চুক্তির মূল কাঠামো
পনেরো জানুয়ারি রাতে ওয়াশিংটন ও তাইপের মধ্যে ঘোষিত এই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানি পণ্যের ওপর শুল্ক কমিয়ে পনেরো শতাংশে নামিয়ে এনেছে। এর বিনিময়ে তাইওয়ানের সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিগুলো যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় আড়াইশো বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে। পাশাপাশি তাইওয়ান সরকার এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য সমপরিমাণ ঋণ গ্যারান্টি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এটিকে নিজেদের দেশে চিপ উৎপাদন সক্ষমতা পুনর্গঠনের বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে তুলে ধরছে।
ওয়াশিংটনের লক্ষ্য ও তাইপের উদ্বেগ
মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লাটনিক প্রকাশ্যে বলেছেন, লক্ষ্য হচ্ছে তাইওয়ানের মোট সরবরাহ শৃঙ্খল ও উৎপাদনের বড় একটি অংশ আমেরিকায় নিয়ে আসা। এই বক্তব্য তাইওয়ানে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এতে দ্বীপটির প্রযুক্তিগত ভিত্তি ফাঁপা হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে এবং কৌশলগত লিভারেজ কমতে পারে।
সরকারি অবস্থান ও ব্যাখ্যা
তবে তাইওয়ানের উপপ্রধানমন্ত্রী চেং লি ছুন এই আশঙ্কা নাকচ করে বলেছেন, এটি উৎপাদন সরিয়ে নেওয়া নয়, বরং যৌথভাবে নতুন সক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্যোগ। যুক্তরাষ্ট্রে উপস্থিতি বাড়ানো হলেও তা তাইওয়ানের প্রযুক্তি শিল্পের সম্প্রসারণ। অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রী কুং মিং সিনও জোর দিয়ে বলেছেন, ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে সবচেয়ে বড় অর্ডার আসবে যুক্তরাষ্ট্র থেকেই, তাই বৈশ্বিকভাবে কিছুটা বিস্তার অপরিহার্য।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা
হংকং সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জুলিয়েন শেসের মতে, এই চুক্তি তাইওয়ানের জন্য একটি ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ মূলক পদক্ষেপ। চিপনির্ভর রপ্তানি অর্থনীতির জন্য শুল্ক নিয়ে অনিশ্চয়তা কমানো জরুরি ছিল। বিনিয়োগের অঙ্ক বড় হলেও এর ফলে আরও কঠোর শুল্ক বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ঝুঁকি আপাতত এড়ানো গেছে।
চিপ শিল্পের চাপ ও বিদেশমুখী বিস্তার
তাইওয়ানের অর্থনীতিবিদ দারসন চিউ মনে করেন, বিদেশে উৎপাদন বাড়ানো এখন অনিবার্য। চিপ উৎপাদনে বিপুল পানি ও বিদ্যুৎ লাগে, যা দ্বীপটির জন্য বড় চাপ। ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ চাহিদার বড় অংশই এই শিল্প থেকে আসবে। যুক্তরাষ্ট্র পর্যাপ্ত সম্পদ ও করছাড় দিতে প্রস্তুত থাকায় সেখানে কিছু উৎপাদন সরানো বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।
সিলিকন ঢাল কেন টিকে থাকবে
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাইওয়ান যতদিন সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি নিজের দেশে ধরে রাখবে, ততদিন তার নেতৃত্ব অক্ষুন্ন থাকবে। বিদেশে স্থাপিত কারখানাগুলোতে আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে অন্তত এক প্রজন্ম পুরোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয়। ফলে কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দু তাইওয়ানেই রয়ে যায়।

কূটনৈতিক প্রভাব ও চীনের প্রতিক্রিয়া
তাইপে এই চুক্তিকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শিল্প ও সরবরাহ শৃঙ্খল সম্পর্ক আরও গভীর হবে বলে আশা করছে। তবে বেইজিং ইতিমধ্যে কড়া ভাষায় আপত্তি জানিয়েছে এবং তাইওয়ানকে ঘিরে যে কোনো সরকারি চুক্তির বিরোধিতা পুনর্ব্যক্ত করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















