গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতির উত্তাপ আরও বাড়ল। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য দাবি ও চাপের মধ্যেই ইউরোপের একাধিক দেশ গ্রিনল্যান্ডে সামরিক সদস্য পাঠাতে শুরু করেছে। ডেনমার্ক জানিয়েছে, ন্যাটোর অধীনে দ্বীপটিতে আরও বড় ও স্থায়ী সামরিক উপস্থিতির পরিকল্পনা এগোচ্ছে।
ইউরোপের অবস্থান স্পষ্ট
ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুক ও আশপাশের এলাকায় ১৫ জানুয়ারি থেকে ইউরোপীয় দেশগুলোর সীমিত সংখ্যক সেনা মোতায়েন শুরু হয়। ডেনমার্কের ভাষ্য অনুযায়ী, এগুলো মূলত আসন্ন সামরিক মহড়ার প্রস্তুতির অংশ। তবে এর মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক বার্তাও দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের প্রতিনিধিদের বৈঠকে কোনো অগ্রগতি না হওয়ার পরদিনই এই পদক্ষেপ আসে, যা ইউরোপের সমর্থনের স্পষ্ট ইঙ্গিত।
ট্রাম্পের দাবি ও ডেনমার্কের আপত্তি
বৈঠকের পর আবারও ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, রাশিয়া বা চীন যদি কখনো গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টা করে, ডেনমার্ক তা ঠেকাতে পারবে না। তাঁর মতে, কৌশলগত ও খনিজসমৃদ্ধ এই দ্বীপ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের কথাও তিনি উড়িয়ে দেননি। তবে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এই অঞ্চল বিক্রির প্রশ্নই ওঠে না এবং বলপ্রয়োগের হুমকি দায়িত্বজ্ঞানহীন।

ন্যাটোর স্থায়ী উপস্থিতির পরিকল্পনা
ডেনমার্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ট্রোলস লুন্ড পুলসেন জানান, গ্রিনল্যান্ডে ন্যাটোর সম্ভাব্য বর্ধিত উপস্থিতির নির্দিষ্ট সংখ্যা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে ২০২৬ সালজুড়ে সেখানে আরও বড় ও স্থায়ী সামরিক উপস্থিতির পরিকল্পনা করা যাবে বলে তিনি আশাবাদী। তাঁর ভাষায়, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা শুধু ডেনমার্কের নয়, পুরো ন্যাটোর দায়িত্ব।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সতর্কবার্তা
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রভাবশালী দেশগুলো ডেনমার্কের পাশে দাঁড়িয়েছে। তাদের সতর্কবার্তা, ন্যাটোভুক্ত কোনো অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক দখল জোটটির অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

দুটি স্পষ্ট বার্তা
ডেনমার্কের রয়্যাল ডিফেন্স কলেজের সহযোগী অধ্যাপক মার্ক জ্যাকবসেন বলেন, এই সেনা মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রকে দুটি বার্তা দিচ্ছে। প্রথমত, গ্রিনল্যান্ডে সামরিক পদক্ষেপ নিলে ইউরোপ ও ন্যাটো প্রস্তুত থাকবে। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনাকে গুরুত্ব দিয়ে ডেনমার্ক ও তার মিত্ররা নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় উপস্থিতি ও নজরদারি বাড়াচ্ছে।
গ্রিনল্যান্ডে বাস্তব চিত্র
ডেনমার্কের জয়েন্ট আর্কটিক কমান্ডে বর্তমানে প্রায় দেড়শ সামরিক ও বেসামরিক কর্মী কর্মরত। জার্মানি, ফ্রান্স, সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডস জানিয়েছে, তারা ভবিষ্যৎ বড় মহড়ার প্রস্তুতিতে সামরিক সদস্য পাঠাচ্ছে। জার্মানি পাঠাচ্ছে তেরো সদস্যের একটি গোয়েন্দা দল। ফ্রান্স পাঠাচ্ছে পাহাড়ি যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ, যাদের সঙ্গে স্থল, আকাশ ও নৌ সম্পদ যুক্ত হবে। সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসও সীমিত সংখ্যক কর্মকর্তা পাঠাচ্ছে।
স্থানীয়দের উদ্বেগ
গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুকের ব্যবসায়ী ম্যাডস পিটারসেন বলেন, আরও সেনা দেখা অস্বস্তিকর হতে পারে। তিনি আশা করেন, এটি যেন নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত না হয়।
হোয়াইট হাউসের প্রতিক্রিয়া
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ইউরোপীয় সেনা মোতায়েন ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব ফেলবে না। মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট বলেন, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অপরিবর্তিত।

রাশিয়ার মন্তব্য
রাশিয়া ন্যাটোর বক্তব্যকে ভিত্তিহীন বলে আখ্যা দিয়েছে। তাদের দাবি, মস্কো ও বেইজিংয়ের হুমকির কথা বলে অকারণ আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে এবং এতে অঞ্চলে সংঘাত বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান
ডেনিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডে প্রায় দুইশ মার্কিন সেনা রয়েছে। কোপেনহেগেনে প্রবাসী গ্রিনল্যান্ডবাসীদের সমাবেশে গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স ফ্রেডেরিক নিলসেন স্পষ্ট ভাষায় বলেন, দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে চায় না। ডেনমার্কের রাজ্যের অংশ হিসেবেই গ্রিনল্যান্ড নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে চায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















