তামিল সিনেমা ও রাজনীতির সংযোগ নতুন কিছু নয়। তবে এবারের ঘটনা ঘিরে জল্পনা আরও ঘনীভূত। জনপ্রিয় অভিনেতা বিজয়ের নতুন ছবি মুক্তি না পাওয়ায় যেমন হতাশ ভক্তরা, তেমনি রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ। রাজ্য নির্বাচনের মুখে এই বিলম্ব কি কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক হিসাব—এই আলোচনাই এখন তামিলনাড়ুর কেন্দ্রবিন্দু।
পংগাল উৎসবের আনন্দ ম্লান
চেন্নাইয়ের ট্যাক্সিচালক প্রদীপ দেবসুদনের মতো অসংখ্য বিজয়ভক্ত এবারের পংগাল উৎসবে একটি পরিচিত আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। উৎসব মানেই নতুন বিজয় ছবি দেখা—এই রীতি ভেঙে যায়। ‘জননায়ক’ নামের ছবিটি মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল জানুয়ারির শুরুতেই। অনেকের ধারণা, এটি হয়তো অভিনেতা হিসেবে বিজয়ের শেষ ছবি, কারণ তিনি পুরোপুরি রাজনীতিতে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ছবির মুক্তি অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে যায়।
সার্টিফিকেট জটিলতায় থমকে গেল ছবি
ছবির মুক্তি আটকে যায় চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডের আপত্তিতে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং সরকারি প্রতীক ব্যবহারের অনুমতি না থাকার অভিযোগে ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। প্রযোজনা সংস্থা বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করায় বিষয়টি নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়। মাদ্রাজ হাইকোর্টে মামলার শুনানি নির্ধারিত থাকলেও ততদিনে ক্ষতির অঙ্ক বাড়তেই থাকে।
ভক্তদের ক্ষোভ ও হতাশা
ছবি মুক্তির খবর পেয়ে অনেক দর্শক আগাম টিকিট কেটে রেখেছিলেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর হঠাৎ করে সব পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকে। কারও ভাষায়, মুখের সামনে থেকে খাবার কেড়ে নেওয়ার মতো অনুভূতি। এই হতাশা শুধু বিনোদনের নয়, অনেকের কাছে এটি আবেগ ও বিশ্বাসের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজনৈতিক চাপের জল্পনা
এই পরিস্থিতির মধ্যেই সামনে আসে আরও বড় একটি বিষয়। করুরে নির্বাচনী সভায় পদদলিত হয়ে বহু মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার তদন্তের মুখোমুখি হচ্ছেন বিজয়। দিল্লিতে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ, আবারও তলবের সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে সময়টা তাঁর জন্য বেশ কঠিন। একই সঙ্গে ছবির বিলম্ব ও তদন্তকে ঘিরে আলোচনা শুরু হয়, এর পেছনে কি শাসক দলের রাজনৈতিক কৌশল কাজ করছে।
রাজ্য নির্বাচনে বিজয়ের দল একটি অনিশ্চিত শক্তি
বিজয়ের দল তামিলাগা ভেত্ত্রি কাজগম মাত্র কয়েক বছরের পুরোনো। এখনো নির্বাচনী পরীক্ষায় নামেনি, কিন্তু তাদের ভোটের ভাগ রাজ্যের ক্ষমতার সমীকরণ বদলে দিতে পারে। শাসক দলের বিরুদ্ধে বিরোধীদের একজোট করার চেষ্টার মধ্যেই বিজয়ের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যদিও তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন, রাজ্যে তাঁর প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বর্তমান শাসক দল, আর আদর্শগতভাবে তিনি শাসক দলের বিরোধী।

ছবির মধ্যেই রাজনীতির বার্তা
‘জননায়ক’ ছবির কাহিনিতেও স্পষ্ট রাজনৈতিক ইঙ্গিত রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। চরিত্রের নাম, সংলাপ, এমনকি ট্রেলারের বক্তব্য—সবকিছুই তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছেন ভক্তরা। অনেকে মনে করছেন, ছবি মুক্তি পেলে নির্বাচনের আগে তা দলের পক্ষে জনসমর্থন গড়ে তুলতে বড় ভূমিকা রাখতে পারত।
সমালোচনা ও সমর্থনের দ্বন্দ্ব
তবে সব আলোচনাই যে ইতিবাচক, তা নয়। করুরের ঘটনার পর বিজয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে তাঁর সরাসরি উপস্থিত না থাকা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার অভাব—এসব নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। আবার রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, তরুণ তামিল পুরুষদের মধ্যে তাঁর প্রতি আকর্ষণ স্পষ্ট, কারণ তিনি তাদের হতাশা ও ক্ষোভের ভাষা তুলে ধরছেন।

তারকার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
এই মুহূর্তে বিজয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা সামলে রাজনৈতিক পথে এগিয়ে যাওয়া। তাঁর পর্দার চরিত্রের মতোই বাস্তব জীবনেও তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো একজন সাধারণ মানুষের প্রতিচ্ছবি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন। বিশ্লেষকদের মতে, চাপ যত বাড়বে, তাঁর এই ভাবমূর্তিই তত উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















