আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ভবিষ্যৎ জ্বালানি সম্মেলন শেষ হয়েছে নতুন আশাবাদ, দৃঢ় অঙ্গীকার এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার শক্ত বার্তা দিয়ে। জ্বালানি রূপান্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে আয়োজিত এই সম্মেলনে বিশ্বের দেড় শতাধিক দেশের নীতিনির্ধারক, শিল্প নেতা ও বিশেষজ্ঞরা একত্রিত হন। টেকসই জ্বালানির পথে মধ্যপ্রাচ্যসহ বৈশ্বিক অগ্রগতির দিক নির্দেশনা ছিল এবারের সম্মেলনের মূল সুর।
সম্মেলনের বিস্তৃতি ও গুরুত্ব
মাসদারের আয়োজনে আবুধাবি টেকনোলজি ও প্রদর্শনী কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত অষ্টাদশ বিশ্ব ভবিষ্যৎ জ্বালানি সম্মেলন ছিল এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী। আবুধাবি টেকসই উন্নয়ন সপ্তাহের অংশ হিসেবে তিন দিনব্যাপী এই সম্মেলনে নীতিগত আলোচনা, শিল্পখাতের গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সমাধান নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ উঠে আসে। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, জ্বালানি রূপান্তরের এই সময়ে বৈশ্বিক সংলাপের জন্য সম্মেলনটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

বায়ুশক্তিতে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন দিগন্ত
সম্মেলনের তৃতীয় দিনের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায় বায়ুশক্তি। সম্মেলনের প্রস্তুত করা এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরে বায়ুশক্তি দ্রুত কৌশলগত স্তম্ভে পরিণত হচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা থেকে সরে এসে বহুমুখী ও টেকসই বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে এগোচ্ছে অঞ্চলটি। উচ্চাভিলাষী শূন্য নিঃসরণ লক্ষ্যের অংশ হিসেবে সরকার ও উন্নয়নকারীরা বৃহৎ বায়ুশক্তি প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগ করছে, যা এখন প্রমাণিত, অর্থনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থার সঙ্গে ক্রমেই একীভূত।
আঞ্চলিক প্রকল্প ও ভবিষ্যৎ সক্ষমতা
সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের দুমাত আল জান্দাল বাণিজ্যিক বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মিশরের সুয়েজ উপসাগরের প্রকল্প এবং নিয়ম ভিত্তিক সবুজ হাইড্রোজেন উদ্যোগ এই অগ্রগতির স্পষ্ট উদাহরণ। সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, ইরাক ও মরক্কোতেও সম্ভাব্যতা যাচাই, দরপত্র ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। এর ফলে দুই হাজার পঁচিশ থেকে দুই হাজার ত্রিশ সালের মধ্যে অঞ্চলে তেইশ গিগাওয়াটের বেশি নতুন বায়ুশক্তি সক্ষমতা যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বায়ুশক্তির বহুমাত্রিক সুফল
নির্গমন হ্রাসের পাশাপাশি বায়ু শক্তি সৌর শক্তির সঙ্গে পরিপূরক ভূমিকা রাখছে। রাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে গ্রিডের ভারসাম্য রক্ষা করছে বায়ুশক্তি। একই সঙ্গে উৎপাদন, গবেষণা, সরবরাহ শৃঙ্খল ও শক্তি সঞ্চয় খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছে। বিশ্লেষকদের মতে, দুই হাজার পঁচিশ সাল থেকে বায়ুশক্তি স্থাপনে আরও গতি আসবে এবং আগামী দশক মধ্যপ্রাচ্যের জন্য বাস্তবায়নের নির্ধারক সময় হয়ে উঠবে।
প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নতুন প্রযুক্তি
সম্মেলনে প্রথমবারের মতো অংশ নেয় জীববৈচিত্র্য বিশ্লেষণে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান নেচারমেট্রিক্স। অফশোর বায়ুশক্তি প্রকল্পে প্রকৃতি ঝুঁকি ও সম্ভাবনা বোঝাতে প্রতিষ্ঠানটি উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। পরিবেশগত ডিএনএ নমুনার মাধ্যমে সমুদ্রের প্রাণী শনাক্ত করে তারা ভারী মাঠপর্যায়ের কাজ ছাড়াই জীববৈচিত্র্যের ভিত্তি তথ্য সংগ্রহে সহায়তা করছে। এর ফলে নির্মাণকালীন প্রভাব পর্যবেক্ষণ ও প্রকল্প চালুর পর প্রকৃতিগত উন্নতির প্রমাণ দেওয়া সহজ হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগ চুক্তি
সম্মেলনের শেষ দিনে একাধিক আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়, যা বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তরের গতি আরও বাড়িয়েছে। এর মধ্যে নাইজেরিয়ার আকওয়া ইবম রাজ্যে প্রস্তাবিত তরলীকৃত গ্যাস প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য সাতশো মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমঝোতা স্মারক বিশেষ গুরুত্ব পায়। নাইজেরিয়ার গ্যাস বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই প্রকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, জ্বালানি দারিদ্র্য কমাবে এবং পরিবেশ বান্ধব ভবিষ্যতের পথে দেশটিকে এগিয়ে নেবে।
নতুন বাজার ও সীমান্তপারের উদ্যোগ
এছাড়া টেকসই জ্বালানি উন্নয়ন বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল সিএমএক্স সীমান্তপারের জ্বালানি লেনদেনের নতুন প্ল্যাটফর্ম চালুর ঘোষণা দেয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে সম্প্রতি অনুমোদিত বাণিজ্য চুক্তিকে ভিত্তি করে এই উদ্যোগ বিনিয়োগ, অধিগ্রহণ ও নবায়নযোগ্য প্রকল্প বাস্তবায়নকে আরও সহজ করবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















