০৮:১৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬

অ্যান্টার্কটিকার বরফের নিচে লুকানো পাহাড়–খাদ উন্মোচিত, জলবায়ু গবেষণায় নতুন দিগন্ত খুলল মানচিত্র

অ্যান্টার্কটিকার বিস্তীর্ণ বরফ চাদরের নিচে লুকিয়ে থাকা এক বিস্ময়কর ভূদৃশ্য প্রথমবারের মতো প্রায় সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ পেল। বিজ্ঞানীদের তৈরি সর্বাধুনিক মানচিত্রে উঠে এসেছে পাহাড়শ্রেণি, গভীর গিরিখাত, প্রশস্ত উপত্যকা ও সমতলভূমি। একই সঙ্গে শনাক্ত হয়েছে আগে অজানা হাজার হাজার ছোট পাহাড় ও ঢেউখেলানো ভূমির গঠন, যা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বরফ গলার গতি বোঝার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

বরফের নিচে কীভাবে আঁকা হলো মানচিত্র

এই মানচিত্র তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে অত্যাধুনিক উচ্চমাত্রার কৃত্রিম উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ এবং বরফ প্রবাহ বিশ্লেষণ পদ্ধতি। বরফের ওপরের নড়াচড়া ও আকৃতির পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা অনুমান করেছেন নিচের শিলাস্তরের গঠন ও অবস্থা। এর ফলে পুরো মহাদেশ জুড়ে, এমনকি যেসব এলাকা আগে কখনো জরিপ করা যায়নি, সেখানকার ভূ প্রকৃতি ও নির্ভুলভাবে ধরা পড়েছে।

A penguin comes ashore in Neko Harbour, Antarctica

নতুন তথ্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

বরফের নিচের ভূমির আকৃতি বরফের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে। কোথাও খাড়া পাহাড় বা খসখসে ভূমি থাকলে বরফের গতি ধীর হয়, আবার কোথাও সমতল বা ঢালু হলে বরফ দ্রুত সমুদ্রের দিকে এগোয়। তাই এই নতুন মানচিত্র ভবিষ্যতে অ্যান্টার্কটিকার বরফ কত দ্রুত গলবে এবং সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা কতটা বাড়তে পারে, সেই পূর্বাভাসকে আরও নির্ভরযোগ্য করবে। গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বোঝার জন্য এই তথ্য অত্যন্ত জরুরি।

হাজার হাজার নতুন পাহাড়ের সন্ধান

মানচিত্র বিশ্লেষণে অন্তত পঞ্চাশ মিটার বা তার বেশি উঁচু ত্রিশ হাজারের বেশি অজানা পাহাড় শনাক্ত হয়েছে। এতদিন এসব পাহাড় বরফের নিচে ঢাকা থাকায় কোনো ধারণাই ছিল না। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ক্ষুদ্র কিন্তু অসংখ্য ভূমিরূপ বরফপ্রবাহে ঘর্ষণ সৃষ্টি করে, যা বরফ গলার গতি নিয়ন্ত্রণে বড় প্রভাব ফেলে।

Glaciers are seen in Half Moon Bay, Antarctica

অ্যান্টার্কটিকার আকার ও ইতিহাস

অ্যান্টার্কটিকা ইউরোপের চেয়েও বড়, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্রায় অর্ধেক বেশি বিস্তৃত এবং আফ্রিকার প্রায় অর্ধেক আয়তনের। এই মহাদেশ সবসময় বরফে ঢাকা ছিল না। কয়েক কোটি বছর আগে এখানে বরফ জমার আগেই পাহাড় ও উপত্যকার গঠন তৈরি হয়েছিল। পরে দীর্ঘ সময় ধরে বরফের চাপ ও প্রবাহ সেই ভূদৃশ্যকে আরও রূপ দিয়েছে। একসময় এটি দক্ষিণ আমেরিকার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ভূত্বক সঞ্চালনের ফলে আলাদা হয়ে যায়।

মঙ্গল গ্রহের চেয়েও অজানা ছিল এই ভূমি

গবেষকরা জানিয়েছেন, এতদিন অ্যান্টার্কটিকার বরফের নিচের ভূপ্রকৃতি সম্পর্কে জ্ঞান ছিল এতটাই সীমিত যে লাল গ্রহের পৃষ্ঠ সম্পর্কে মানুষের ধারণা ছিল আরও স্পষ্ট। আগে বিমান বা তুষারযানে বসানো রাডার দিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে জরিপ করা হতো, যার মাঝে বহু কিলোমিটার ফাঁক থেকে যেত। নতুন পদ্ধতিতে সেই ফাঁক পূরণ হয়েছে।

A glacier in Half Moon Bay, Antarctica

ভবিষ্যৎ গবেষণায় সহায়তা

এই মানচিত্রের মাধ্যমে এখন বিজ্ঞানীরা নির্দিষ্ট করে বলতে পারবেন কোথায় আরও বিশদ মাঠ পর্যায়ের গবেষণা দরকার এবং কোথায় তা কম জরুরি। পাশাপাশি বৈশ্বিক জলবায়ু মূল্যায়ন ও সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পূর্বাভাসে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

অ্যান্টার্কটিকার বরফের নিচে লুকানো পাহাড়–খাদ উন্মোচিত, জলবায়ু গবেষণায় নতুন দিগন্ত খুলল মানচিত্র

০৬:১৪:৩১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬

অ্যান্টার্কটিকার বিস্তীর্ণ বরফ চাদরের নিচে লুকিয়ে থাকা এক বিস্ময়কর ভূদৃশ্য প্রথমবারের মতো প্রায় সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ পেল। বিজ্ঞানীদের তৈরি সর্বাধুনিক মানচিত্রে উঠে এসেছে পাহাড়শ্রেণি, গভীর গিরিখাত, প্রশস্ত উপত্যকা ও সমতলভূমি। একই সঙ্গে শনাক্ত হয়েছে আগে অজানা হাজার হাজার ছোট পাহাড় ও ঢেউখেলানো ভূমির গঠন, যা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বরফ গলার গতি বোঝার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

বরফের নিচে কীভাবে আঁকা হলো মানচিত্র

এই মানচিত্র তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে অত্যাধুনিক উচ্চমাত্রার কৃত্রিম উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ এবং বরফ প্রবাহ বিশ্লেষণ পদ্ধতি। বরফের ওপরের নড়াচড়া ও আকৃতির পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা অনুমান করেছেন নিচের শিলাস্তরের গঠন ও অবস্থা। এর ফলে পুরো মহাদেশ জুড়ে, এমনকি যেসব এলাকা আগে কখনো জরিপ করা যায়নি, সেখানকার ভূ প্রকৃতি ও নির্ভুলভাবে ধরা পড়েছে।

A penguin comes ashore in Neko Harbour, Antarctica

নতুন তথ্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

বরফের নিচের ভূমির আকৃতি বরফের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে। কোথাও খাড়া পাহাড় বা খসখসে ভূমি থাকলে বরফের গতি ধীর হয়, আবার কোথাও সমতল বা ঢালু হলে বরফ দ্রুত সমুদ্রের দিকে এগোয়। তাই এই নতুন মানচিত্র ভবিষ্যতে অ্যান্টার্কটিকার বরফ কত দ্রুত গলবে এবং সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা কতটা বাড়তে পারে, সেই পূর্বাভাসকে আরও নির্ভরযোগ্য করবে। গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বোঝার জন্য এই তথ্য অত্যন্ত জরুরি।

হাজার হাজার নতুন পাহাড়ের সন্ধান

মানচিত্র বিশ্লেষণে অন্তত পঞ্চাশ মিটার বা তার বেশি উঁচু ত্রিশ হাজারের বেশি অজানা পাহাড় শনাক্ত হয়েছে। এতদিন এসব পাহাড় বরফের নিচে ঢাকা থাকায় কোনো ধারণাই ছিল না। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ক্ষুদ্র কিন্তু অসংখ্য ভূমিরূপ বরফপ্রবাহে ঘর্ষণ সৃষ্টি করে, যা বরফ গলার গতি নিয়ন্ত্রণে বড় প্রভাব ফেলে।

Glaciers are seen in Half Moon Bay, Antarctica

অ্যান্টার্কটিকার আকার ও ইতিহাস

অ্যান্টার্কটিকা ইউরোপের চেয়েও বড়, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্রায় অর্ধেক বেশি বিস্তৃত এবং আফ্রিকার প্রায় অর্ধেক আয়তনের। এই মহাদেশ সবসময় বরফে ঢাকা ছিল না। কয়েক কোটি বছর আগে এখানে বরফ জমার আগেই পাহাড় ও উপত্যকার গঠন তৈরি হয়েছিল। পরে দীর্ঘ সময় ধরে বরফের চাপ ও প্রবাহ সেই ভূদৃশ্যকে আরও রূপ দিয়েছে। একসময় এটি দক্ষিণ আমেরিকার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ভূত্বক সঞ্চালনের ফলে আলাদা হয়ে যায়।

মঙ্গল গ্রহের চেয়েও অজানা ছিল এই ভূমি

গবেষকরা জানিয়েছেন, এতদিন অ্যান্টার্কটিকার বরফের নিচের ভূপ্রকৃতি সম্পর্কে জ্ঞান ছিল এতটাই সীমিত যে লাল গ্রহের পৃষ্ঠ সম্পর্কে মানুষের ধারণা ছিল আরও স্পষ্ট। আগে বিমান বা তুষারযানে বসানো রাডার দিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে জরিপ করা হতো, যার মাঝে বহু কিলোমিটার ফাঁক থেকে যেত। নতুন পদ্ধতিতে সেই ফাঁক পূরণ হয়েছে।

A glacier in Half Moon Bay, Antarctica

ভবিষ্যৎ গবেষণায় সহায়তা

এই মানচিত্রের মাধ্যমে এখন বিজ্ঞানীরা নির্দিষ্ট করে বলতে পারবেন কোথায় আরও বিশদ মাঠ পর্যায়ের গবেষণা দরকার এবং কোথায় তা কম জরুরি। পাশাপাশি বৈশ্বিক জলবায়ু মূল্যায়ন ও সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পূর্বাভাসে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।