ভারতে বিদ্যুৎ চালু রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। দেশজুড়ে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, আর সেই চাপ সামলাতে গিয়ে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা একের পর এক সামনে আসছে। শহরে মিটার কারচুপি, গ্রামে সরাসরি লাইনে অবৈধ সংযোগ—চুরি আর অপচয়ে নুইয়ে পড়ছে রাজ্যগুলোর বিদ্যুৎ সংস্থাগুলো। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা থমকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা বাড়ছে।
বাড়ছে চাহিদা, ভাঙছে গ্রিড
দুই হাজার একুশ সালের পর থেকে ভারতে বিদ্যুতের চাহিদা প্রতিবছর গড়ে প্রায় নয় শতাংশ হারে বেড়েছে। আগামী দশকে এই চাহিদা দ্বিগুণেরও বেশি হবে বলে পূর্বাভাস। দুই হাজার পঁয়ত্রিশ সালের মধ্যে ভারতের প্রয়োজন হবে ইউরোপীয় অঞ্চলের প্রায় সমান বিদ্যুৎ। এত বিপুল চাহিদা পূরণ করতে হলে রাজ্যগুলোর বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় দ্রুত ও গভীর পরিবর্তন ছাড়া উপায় নেই।
উৎপাদন আছে, বিতরণে ধস

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত মহাসড়ক, বিমানবন্দর আর বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু উৎপাদিত বিদ্যুৎ সঠিকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছানোর কাজেই সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। বিশ্বজুড়ে যেখানে বিদ্যুৎ ক্ষতি সাত শতাংশের নিচে রাখার চেষ্টা করা হয়, সেখানে ভারতে এই ক্ষতি এখনো প্রায় ষোল শতাংশ। দুর্বল তার, পুরোনো সাবস্টেশন, বকেয়া বিল আর চুরির কারণে ভারত বিশ্বের সবচেয়ে অদক্ষ বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার তালিকায় রয়ে গেছে।
ভর্তুকির ফাঁদে ঋণের বোঝা
সমস্যার গোড়া অনেক পুরোনো। কৃষকদের কম দামে বা বিনা মূল্যে বিদ্যুৎ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সেই খরচ মেটানোর ব্যবস্থা করা হয়নি। নব্বইয়ের দশক থেকে রাজ্য মালিকানাধীন বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো ঋণের পাহাড়ে চাপা পড়ে। বর্তমানে এই ঋণের পরিমাণ দেশের মোট অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য অংশ। বিনিয়োগের সক্ষমতা হারিয়ে পড়ে থাকছে খুঁটি আর সাবস্টেশন, বাড়ছে দুর্নীতির সুযোগ।
কৃষি ভর্তুকি ও শিল্পের ক্ষতি
কৃষিতে বিনা মূল্যের বিদ্যুৎ ভূগর্ভস্থ পানি তোলাকে সহজ করেছে, ফলে পানিখরচা ফসলের চাষ বেড়েছে। আধা শুষ্ক এলাকায় ধান চাষ বেড়ে জলস্তর নেমে যাচ্ছে। অন্যদিকে এই ভর্তুকির বোঝা চাপানো হয়েছে শিল্প খাতে। ফলে কারখানাগুলো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে বাধ্য হচ্ছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
![]()
শিল্পোন্নয়নে বাধা বিদ্যুৎ মূল্য
ভারতের শিল্পখাতে বিদ্যুতের দাম প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। অনেক বড় প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে নিজেদের বিদ্যুৎকেন্দ্র বসাচ্ছে। এতে সাময়িক সমাধান মিললেও জাতীয় গ্রিডের উন্নয়ন থমকে যাচ্ছে। সরকারের উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনায় তাই বিদ্যুৎ বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ওড়িশার উদাহরণে আশার আলো
এই অচলাবস্থার মাঝেই ওড়িশা দেখিয়েছে বদল সম্ভব। কয়েক বছর আগে সেখানে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ছিল বিপর্যস্ত। পরে বেসরকারি খাতের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ব্যবস্থাপনা বদলানো হয়। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, স্মার্ট মিটার, ডিজিটাল বিলিং চালু হওয়ায় বিদ্যুৎ ক্ষতি প্রায় অর্ধেক কমেছে। দাম না বাড়িয়েই সেবার মান উন্নত হয়েছে।
সৌর শক্তিতে ভর্তুকি কমানোর চেষ্টা
কিছু রাজ্য কৃষকদের সৌর প্যানেল দেওয়ার পথে হাঁটছে, যাতে বিনা মূল্যের বিদ্যুতের চাপ কমে। গুজরাটে দিনের বেলায় কৃষকদের জন্য ছোট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করে ভালো ফল পাওয়া গেছে। এই উদ্যোগ অন্য রাজ্যেও ছড়ানোর সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।

বেসরকারিকরণ নিয়ে নতুন ভাবনা
সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশ ওড়িশার পথ অনুসরণ করার কথা ভাবছে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়লে কর্মসংস্থানও বাড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো ইতিমধ্যেই এই খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
কেন্দ্রের সংস্কার পরিকল্পনা
কেন্দ্রীয় সরকার বিদ্যুৎ খাতে প্রতিযোগিতা বাড়ানো ও ভর্তুকি কমানোর লক্ষ্যে নতুন আইন আনতে প্রস্তুত হচ্ছে। ঋণগ্রস্ত সংস্থাগুলোকে উদ্ধার তহবিল দেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে, তবে শর্ত হিসেবে বেসরকারি খাতের জন্য দরজা খুলতে হবে রাজ্যগুলোর।
বিদ্যুৎ গ্রিড সংস্কার সফল হলে ভারতের উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত খুলতে পারে। উন্নয়নের গতি ধরে রাখতে হলে এই সংস্কার আর দেরি সহ্য করবে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















