ডোলোমাইট পর্বতমালার কোলে ছোট্ট পাহাড়ি শহর কর্টিনা দ’আম্পেজ্জো আবারও বিশ্বমঞ্চে ফিরছে। মিলানের সঙ্গে যৌথভাবে শীতকালীন অলিম্পিক আয়োজনের প্রস্তুতিতে শহর জুড়ে চলছে ব্যাপক রূপান্তর। একদিকে উন্নয়নের ব্যস্ততা, অন্যদিকে স্থানীয় জীবনের স্বকীয়তা রক্ষার উদ্বেগ—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে দাঁড়িয়ে আছে কর্টিনা।
ঐতিহ্য আর ভিড়ের চাপে শহর
উনিশশো ছাপ্পান্ন সালে প্রথমবার অলিম্পিক আয়োজনের অভিজ্ঞতা রয়েছে কর্টিনার। তবে এবারের প্রস্তুতির মাত্রা ভিন্ন। নির্মাণকাজে ছেয়ে গেছে এলাকা, টিকিট বিক্রি ছুঁয়েছে প্রায় দশ লক্ষের কাছাকাছি। স্থানীয় বাসিন্দারা, যাদের বলা হয় আম্পেজ্জানি, দীর্ঘদিন ধরে পর্যটনের সঙ্গে সহাবস্থান করলেও এবার তাঁদের চিন্তা বেড়েছে। শতাব্দী প্রাচীন লাদিন ভাষা, টাইরোলীয় সংস্কৃতি আর মধ্যযুগ থেকে চলে আসা রেগোলে দ’আম্পেজ্জোর সামষ্টিক ভূমি ব্যবস্থাপনা—সবকিছুই কি টিকে থাকবে এই পরিবর্তনের ঢেউয়ে।

পাহাড়ের সৌন্দর্য আর অভিজাত আকর্ষণ
ডলোমাইটের খাঁজকাটা সাদা পাথরের পাহাড়, শীতকালীন ক্রীড়া আর গ্রীষ্মের ট্রেকিং কর্টিনাকে দীর্ঘদিন ধরে আকর্ষণীয় করে রেখেছে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে অভিজাত জীবনযাপনের গ্ল্যামার। গ্রীষ্ম ও শীতে বাড়ছে পর্যটকের সংখ্যা, শহরের প্রধান সড়ক কর্সো ইতালিয়ায় সন্ধ্যার হাঁটা যেন ফ্যাশন আর সামাজিক প্রদর্শনীর মঞ্চ।
ইতিহাসের পথে হাঁটা
শহরের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা আঠারো শতকের ডুওমো, পাশেই সামষ্টিক মালিকানার ঐতিহাসিক ভবন, পুরোনো টাউন হল আর মধ্যযুগীয় বাড়িগুলো কর্টিনার অতীতকে চোখের সামনে এনে দেয়। আধুনিক স্থাপত্যও এখানে ইতিহাসের অংশ, যেখানে আগের অলিম্পিকের স্মৃতি আজও দেয়ালে খোদাই হয়ে আছে।
স্বাদের শহর কর্টিনা
এই পাহাড়ি জনপদ শুধু দৃশ্যের জন্য নয়, খাবারের জন্যও পরিচিত। স্থানীয় খামার থেকে আসা মাংস, দুধ আর সবজিতে তৈরি খাবার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি লজে পরিবেশিত খাবারে আছে আলপাইন স্বাদের আধুনিক রূপ, আবার শহরের ভেতরে পুরোনো রেস্তোরাঁয় মেলে ঘরোয়া পাস্তা আর মাংসের পদ।

প্রকৃতি আর রোমাঞ্চ
স্কি লিফটে উঠে চিনকুয়ে তোরির চুনাপাথরের স্তম্ভের কাছে পৌঁছানো যেন অন্য গ্রহে পা রাখা। প্রশস্ত ঢালু পথ, জমাট জলপ্রপাতের পাশ দিয়ে নেমে আসা ট্রেইল আর ঘোড়ায় টানা স্কি টো—সব মিলিয়ে রোমাঞ্চ প্রিয়দের জন্য কর্টিনা এক স্বপ্নের নাম। শীত ছাড়াও সারা বছর হেঁটে বেড়ানো, স্নোশু আর ক্রস কান্ট্রি স্কির সুযোগ রয়েছে।
শিল্প আর নীরব রাত
শহরের জাদুঘরগুলো আধুনিক শিল্প, জীবাশ্ম আর লোকজ সংস্কৃতির জানালা খুলে দেয়। সন্ধ্যার পর ছোট্ট মদের দোকানগুলোতে জমে ওঠে গল্প আর হাসি। আর গভীর রাতে পাহাড়ের চূড়ায় জ্যোতির্বিদ্যা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে আলো দূষণমুক্ত আকাশ দেখা এক বিরল অভিজ্ঞতা।
অলিম্পিকের আগে শেষ ভাবনা
দুই হাজার ছাব্বিশের অলিম্পিক কর্টিনাকে নতুন করে গড়ে তুলছে। তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এই আলো ঝলমলে ভবিষ্যতের ভেতরেও কি পাহাড়ি শহরের নিজস্ব আত্মা অটুট থাকবে। উন্নয়ন আর ঐতিহ্যের ভারসাম্য রক্ষাই এখন কর্টিনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















