সুইজারল্যান্ডের পাহাড়ঘেরা দাভোসে আবার বসছে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম। তবে এবারের দাভোস আগের মতো নেই। আট বছর আগে যে ডোনাল্ড ট্রাম্প ছিলেন এই বৈশ্বিক অভিজাত সমাবেশের অস্বস্তিকর অতিথি, এবার তিনি যেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ব্যবসা ও রাজনীতির প্রভাবশালী নেতাদের এই বার্ষিক জমায়েত ক্রমেই মানিয়ে নিচ্ছে ট্রাম্পের এজেন্ডার সঙ্গে। জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো পেছনে ঠেলে সামনে আসছে প্রযুক্তি, চুক্তি আর কূটনৈতিক বাস্তববাদ।
বদলে যাওয়া দাভোসের চরিত্র
দাভোসকে অনেকেই ক্ষমতাবান নির্বাহী আর বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন রাজনীতিকদের আড্ডা বলে উড়িয়ে দেন। তবু পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে এই ফোরাম বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির পরিবর্তনের একটি আয়না হয়ে আছে। প্রতি জানুয়ারিতে রাষ্ট্রপ্রধান, বিনিয়োগকারী ও করপোরেট নেতাদের উপস্থিতি জানান দেয় কারা এখন বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্রে। শহরের মূল সড়কে বড় বড় প্রতিষ্ঠানের নাম ঝলমল করে ওঠা সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।

ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন এবং শক্ত প্রদর্শন
এবার দাভোসে ট্রাম্পকে এড়ানো প্রায় অসম্ভব। ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি কিংবা গ্রিনল্যান্ড কেনার শর্ত জুড়ে দেওয়ার মতো বক্তব্য দিয়ে তিনি আগেই আলোচনার আগুন জ্বালিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে থাকছেন মন্ত্রিসভার প্রভাবশালী সদস্যরা। একই মঞ্চে থাকবেন বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা এবং ইউরোপ ও এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রনেতারা। গত বছরের তুলনায় এটি একেবারেই ভিন্ন চিত্র, যখন ট্রাম্প প্রশাসনের শুরুর দিনগুলো দূর থেকে সতর্ক দৃষ্টিতে দেখেছিল দাভোস।
নতুন নেতৃত্বে ফোরামের কৌশল
প্রতিষ্ঠাতা ক্লাউস শভাব সরে দাঁড়ানোর পর বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম নিজেকে নতুনভাবে সাজিয়েছে। বড় বড় আদর্শিক বক্তব্য কমিয়ে নিজেদের নিরপেক্ষ আলোচনার মঞ্চ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা চলছে। নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা জোর দিচ্ছেন সুইজারল্যান্ডের নিরপেক্ষতার ওপর। বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্রপ্রধান ও ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো হচ্ছে, যেন দাভোস আবারও প্রভাবশালী সংলাপের কেন্দ্রে থাকতে পারে।
সংলাপের স্লোগান, বাস্তবতার সংঘাত
এবারের সম্মেলনের মূল ভাবনা সংলাপের চেতনা হলেও বাস্তবে ট্রাম্পের আচরণ ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। ন্যাটো নিয়ে উত্তেজনা, বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের হুমকি, এমনকি নিজ দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টির অভিযোগ—সব মিলিয়ে তাঁর ভূমিকা বৈশ্বিক সহযোগিতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। আট বছর আগে দাভোসে দাঁড়িয়ে যে শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের কথা তিনি বলেছিলেন, বর্তমান বাস্তবতা তার সঙ্গে তীব্রভাবে সাংঘর্ষিক।
আড়ালের আলোচনায় চুক্তির রাজনীতি
দাভোসের প্রকাশ্য মঞ্চের বাইরেই বরাবরের মতো আসল তৎপরতা চলবে। হোটেলের কক্ষ আর নৈশভোজে নির্বাহী ও বিনিয়োগকারীরা চুক্তির হিসাব কষবেন। এই বছর সেই সব চুক্তির বড় অংশই নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর। বাণিজ্য চুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি, ওষুধ শিল্প কিংবা তেলের বাজার—সব ক্ষেত্রেই মার্কিন নীতির প্রভাব স্পষ্ট।
জলবায়ু ইস্যুতে নীরবতা
আগের বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন ছিল দাভোসের অন্যতম প্রধান আলোচ্য। এবার তার উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো কম। সম্মেলনের কর্মসূচিতে এই বিষয়টি নিয়ে হাতে গোনা কয়েকটি আলোচনা রাখা হয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানির নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের অংশগ্রহণই ইঙ্গিত দিচ্ছে অগ্রাধিকারের পরিবর্তন।
ঝুঁকির তালিকায় নতুন সংকেত
সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ঝুঁকি মূল্যায়নে পরিবেশের বদলে অর্থনৈতিক সংঘাত, ভুয়া তথ্য ও সামাজিক মেরুকরণকে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব সমস্যার অনেকটাই ট্রাম্পের নীতির সঙ্গে মিলে যায়। তবু প্রতিবেদনে তাঁর নাম নেই। প্রশ্ন থেকেই যায়, দাভোসের মঞ্চে কেউ কি প্রকাশ্যে এই চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলবেন।
ভবিষ্যৎ দাভোস কোন পথে
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম তার ইতিহাসে বহুবার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হাওয়ার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্ক যদি আরও খারাপ হয়, তাহলে প্রতি জানুয়ারিতে এই দুই পক্ষের নেতাদের একসঙ্গে দাভোসে দেখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ট্রাম্প ও তাঁর এজেন্ডাকে উষ্ণভাবে গ্রহণ করা দাভোসের জন্য নতুন করে ভুল হিসাব হয়ে দাঁড়ায় কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















