০৩:৫৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬
প্রাচীন ভারতে গণিতচর্চা (পর্ব-৩৫৪) নরওয়ের বরফ রাজ্যে ট্রল ট্রেইল: স্কিতে প্রকৃতি, রোমাঞ্চ আর জীবনের স্বাদ ঝুঁকির খেলায় তরুণেরা, নকল টাকায় বিনিয়োগের রোমাঞ্চে গড়ে উঠছে নতুন অভ্যাস তারকা র‍্যাপারের দোদুল্যমান প্রত্যাবর্তন: এএসএপি রকির নতুন অ্যালবাম কতটা বলার আছে এক দশকের অপহরণ আকাশপথে সন্ত্রাস থেকে আদর্শিক সহিংসতার উত্তরাধিকার অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে টালমাটাল মুহূর্ত পেরিয়ে তৃতীয় রাউন্ডে মাদিসন কিস ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন: যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একসময় নিষিদ্ধ ইসলামপন্থী দলের সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব’ চায় শেয়ারবাজারে সপ্তাহের শেষ দিনে মিশ্র চিত্র; ডিএসইতে পতন, সিএসইতে উত্থান ঢাকা-১৫ আসনে নির্বাচনী প্রচার শুরু করলেন জামায়াতের আমির সিরাজগঞ্জে বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষে আহত ৯

নরওয়ের বরফ রাজ্যে ট্রল ট্রেইল: স্কিতে প্রকৃতি, রোমাঞ্চ আর জীবনের স্বাদ

নরওয়ের পাহাড়ে এক সময় মানুষ চলতে ভয় পেত। লোককথায় বলা হতো, এই পথগুলো দখল করে থাকত ভয়ংকর ট্রলরা, যারা পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে পথিকদের ভয় দেখাত। সেই ট্রলদের নামেই আজ গড়ে উঠেছে ট্রল ট্রেইল, যা এখন নরওয়ের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর স্কি অভিযানের একটি।

ট্রল ট্রেইল মূলত একশ মাইল দীর্ঘ ক্রস কান্ট্রি স্কি পথ, যা রোনদানে পর্বতমালার ভেতর দিয়ে শুরু হয়ে শেষ হয়েছে লিলেহ্যামারে। বরফে মোড়া পাহাড়, খোলা মালভূমি আর দূরদূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা স্কি ট্র্যাক এই পথকে করে তুলেছে প্রকৃত স্কি প্রেমীদের স্বপ্নের গন্তব্য।

ট্রলের গল্প থেকে ট্রেইলের জন্ম

এই ট্রেইলের সূচনা হোভরিঙ্গেন নামের ছোট শহর থেকে। উনিশ শতকে এখানেই নরওয়ের লেখক পিটার ক্রিস্টেন আসবিয়র্নসেন লিখেছিলেন পের গিন্টের গল্প, যেখানে এক গ্রামবাসী ট্রলদের মুখোমুখি হয়ে সাহসের পরীক্ষা দেয়। সেই গল্প থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে নাটক ও সুর সৃষ্টি করেন বিখ্যাত শিল্পীরা। আজ সেই কল্পনার ট্রলদের পথেই বাস্তবের মানুষ স্কি করে এগিয়ে যায়।

পরিকল্পিত ভ্রমণ, হালকা ব্যাগ

এই ট্রেইলে স্কি করা সহজ নয়। অভিজ্ঞ স্কিয়ারদের জন্যই এটি তৈরি। দিনে বারো থেকে তেইশ মাইল পর্যন্ত স্কি করতে হয়। তবে প্রতিদিন লাগেজ আলাদা করে পাঠানো হয়, ফলে স্কিয়ারদের বহন করতে হয় শুধু হালকা ব্যাগ। পাহাড়ি হোটেল আর একটি কাঠের কেবিনে রাত কাটিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে পুরো যাত্রা শেষ করা যায়।

বরফের মাঝে খাবারের উষ্ণতা

নরওয়েতে স্কি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি খাবারও। পাহাড়ি হোটেলে ঢুকলেই চোখে পড়ে বিশাল খাবারের আয়োজন। স্যামন মাছ এখানে যেন জাতীয় আবেগ। নানা ভাবে রান্না করা স্যামন, সঙ্গে স্থানীয় পানীয় একুয়াভিট, দীর্ঘ স্কির পর শরীরকে এনে দেয় আরাম।

ট্রেইলে প্রথম দিনেই এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করে থাকে। স্কির ছন্দে ডুবে থাকার মাঝেই হঠাৎ থামতে হয় ওয়াফল খেতে। ট্রেইলের পাশের পাহাড়ি লজে পরিবেশন করা হয় হৃদয় আকৃতির গরম ওয়াফল, ক্রিম আর বেরির জ্যাম দিয়ে। নরওয়েজীয়দের কাছে এটি শুধু খাবার নয়, বরং জীবনের ছোট আনন্দের প্রতীক।

বাতাসের বিরুদ্ধে লড়াই

রোনদানে জাতীয় উদ্যানের ওপর দিয়ে যাওয়া অংশটি সবচেয়ে নাটকীয়। এখানে তীব্র বাতাস বরফের ওপর ঢেউ তৈরি করে, স্কি করা হয়ে ওঠে কঠিন। চারপাশে জমাট হ্রদ, দূরে গম্বুজ আকৃতির পাহাড় আর নীল আকাশ মিলিয়ে দৃশ্য মনে করিয়ে দেয় এক শীতল মরুভূমির কথা। অভিজ্ঞ স্কিয়াররাও এখানে এসে বুঝে যান, এই ট্রেইল সবার জন্য নয়।

ঝুঁকি আর আনন্দের মিশেল

এক জায়গায় বাতাসে ক্ষয়ে যাওয়া বরফে তৈরি হয়েছিল হঠাৎ গভীর ফাঁক। মুহূর্তের ভুলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। তবে শেষ পর্যন্ত সবাই নিরাপদে পৌঁছায় গন্তব্যে। ক্লান্ত শরীরকে আরাম দিতে পাহাড়ি হোটেলের সাউনা আর গরম পানির স্নান যেন নতুন প্রাণ এনে দেয়।

পাহাড়ের বুকে বিলাস

যাত্রার শেষ ভাগে পৌঁছানো যায় পেলেস্তোভা অঞ্চলে। এখানে স্কি ট্র্যাক ছড়িয়ে আছে মাইলের পর মাইল। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়ানো আধুনিক কাঠের হোটেলটি প্রকৃতির সঙ্গে বিলাসের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। দিনের শেষে জানালার পাশে বসে উষ্ণ পানীয় আর নরম মাছের খাবার নিয়ে পাহাড়ের আলো ঝলমলে দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

স্কিই যেখানে জীবন

শেষ দিনে লিলেহ্যামারের দিকে নামার পথে দেখা যায়, একদল মানুষ আগুন জ্বালিয়ে সসেজ ভাজছে, সঙ্গে হাসি আর গল্প। তাদের কাছে স্কি কোনো খেলা নয়, জীবনযাপনের অংশ। একজন স্থানীয় স্কিয়ার সহজ ভাষায় বললেন, স্কিই আমাদের জীবন।

 

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রাচীন ভারতে গণিতচর্চা (পর্ব-৩৫৪)

নরওয়ের বরফ রাজ্যে ট্রল ট্রেইল: স্কিতে প্রকৃতি, রোমাঞ্চ আর জীবনের স্বাদ

০২:০০:৪৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬

নরওয়ের পাহাড়ে এক সময় মানুষ চলতে ভয় পেত। লোককথায় বলা হতো, এই পথগুলো দখল করে থাকত ভয়ংকর ট্রলরা, যারা পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে পথিকদের ভয় দেখাত। সেই ট্রলদের নামেই আজ গড়ে উঠেছে ট্রল ট্রেইল, যা এখন নরওয়ের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর স্কি অভিযানের একটি।

ট্রল ট্রেইল মূলত একশ মাইল দীর্ঘ ক্রস কান্ট্রি স্কি পথ, যা রোনদানে পর্বতমালার ভেতর দিয়ে শুরু হয়ে শেষ হয়েছে লিলেহ্যামারে। বরফে মোড়া পাহাড়, খোলা মালভূমি আর দূরদূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা স্কি ট্র্যাক এই পথকে করে তুলেছে প্রকৃত স্কি প্রেমীদের স্বপ্নের গন্তব্য।

ট্রলের গল্প থেকে ট্রেইলের জন্ম

এই ট্রেইলের সূচনা হোভরিঙ্গেন নামের ছোট শহর থেকে। উনিশ শতকে এখানেই নরওয়ের লেখক পিটার ক্রিস্টেন আসবিয়র্নসেন লিখেছিলেন পের গিন্টের গল্প, যেখানে এক গ্রামবাসী ট্রলদের মুখোমুখি হয়ে সাহসের পরীক্ষা দেয়। সেই গল্প থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে নাটক ও সুর সৃষ্টি করেন বিখ্যাত শিল্পীরা। আজ সেই কল্পনার ট্রলদের পথেই বাস্তবের মানুষ স্কি করে এগিয়ে যায়।

পরিকল্পিত ভ্রমণ, হালকা ব্যাগ

এই ট্রেইলে স্কি করা সহজ নয়। অভিজ্ঞ স্কিয়ারদের জন্যই এটি তৈরি। দিনে বারো থেকে তেইশ মাইল পর্যন্ত স্কি করতে হয়। তবে প্রতিদিন লাগেজ আলাদা করে পাঠানো হয়, ফলে স্কিয়ারদের বহন করতে হয় শুধু হালকা ব্যাগ। পাহাড়ি হোটেল আর একটি কাঠের কেবিনে রাত কাটিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে পুরো যাত্রা শেষ করা যায়।

বরফের মাঝে খাবারের উষ্ণতা

নরওয়েতে স্কি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি খাবারও। পাহাড়ি হোটেলে ঢুকলেই চোখে পড়ে বিশাল খাবারের আয়োজন। স্যামন মাছ এখানে যেন জাতীয় আবেগ। নানা ভাবে রান্না করা স্যামন, সঙ্গে স্থানীয় পানীয় একুয়াভিট, দীর্ঘ স্কির পর শরীরকে এনে দেয় আরাম।

ট্রেইলে প্রথম দিনেই এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করে থাকে। স্কির ছন্দে ডুবে থাকার মাঝেই হঠাৎ থামতে হয় ওয়াফল খেতে। ট্রেইলের পাশের পাহাড়ি লজে পরিবেশন করা হয় হৃদয় আকৃতির গরম ওয়াফল, ক্রিম আর বেরির জ্যাম দিয়ে। নরওয়েজীয়দের কাছে এটি শুধু খাবার নয়, বরং জীবনের ছোট আনন্দের প্রতীক।

বাতাসের বিরুদ্ধে লড়াই

রোনদানে জাতীয় উদ্যানের ওপর দিয়ে যাওয়া অংশটি সবচেয়ে নাটকীয়। এখানে তীব্র বাতাস বরফের ওপর ঢেউ তৈরি করে, স্কি করা হয়ে ওঠে কঠিন। চারপাশে জমাট হ্রদ, দূরে গম্বুজ আকৃতির পাহাড় আর নীল আকাশ মিলিয়ে দৃশ্য মনে করিয়ে দেয় এক শীতল মরুভূমির কথা। অভিজ্ঞ স্কিয়াররাও এখানে এসে বুঝে যান, এই ট্রেইল সবার জন্য নয়।

ঝুঁকি আর আনন্দের মিশেল

এক জায়গায় বাতাসে ক্ষয়ে যাওয়া বরফে তৈরি হয়েছিল হঠাৎ গভীর ফাঁক। মুহূর্তের ভুলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। তবে শেষ পর্যন্ত সবাই নিরাপদে পৌঁছায় গন্তব্যে। ক্লান্ত শরীরকে আরাম দিতে পাহাড়ি হোটেলের সাউনা আর গরম পানির স্নান যেন নতুন প্রাণ এনে দেয়।

পাহাড়ের বুকে বিলাস

যাত্রার শেষ ভাগে পৌঁছানো যায় পেলেস্তোভা অঞ্চলে। এখানে স্কি ট্র্যাক ছড়িয়ে আছে মাইলের পর মাইল। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়ানো আধুনিক কাঠের হোটেলটি প্রকৃতির সঙ্গে বিলাসের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। দিনের শেষে জানালার পাশে বসে উষ্ণ পানীয় আর নরম মাছের খাবার নিয়ে পাহাড়ের আলো ঝলমলে দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

স্কিই যেখানে জীবন

শেষ দিনে লিলেহ্যামারের দিকে নামার পথে দেখা যায়, একদল মানুষ আগুন জ্বালিয়ে সসেজ ভাজছে, সঙ্গে হাসি আর গল্প। তাদের কাছে স্কি কোনো খেলা নয়, জীবনযাপনের অংশ। একজন স্থানীয় স্কিয়ার সহজ ভাষায় বললেন, স্কিই আমাদের জীবন।