দক্ষিণ স্পেনের শুষ্ক প্রান্তর ছুটে চলা দ্রুতগতির ট্রেনটি হঠাৎ এমনভাবে কেঁপে ওঠে, যেন ভূমিকম্প হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যেই নিভে যায় আলো, আতঙ্কে চিৎকার শুরু হয় যাত্রীদের। রবিবার সন্ধ্যার সেই দুর্ঘটনায় অন্তত চল্লিশ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুই হাজার তেরোর পর এটিই স্পেনের সবচেয়ে ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনা।
প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে, দক্ষিণ স্পেনের আদামুজ শহরের কাছে মাদ্রিদগামী একটি দ্রুতগতির ট্রেনের পেছনের দুটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা আরেকটি ট্রেনের লাইনে উঠে যায়। সন্ধ্যা সাতটা পঁয়তাল্লিশ মিনিট নাগাদ বিপরীতমুখী ট্রেনটি সজোরে ধাক্কা দেয়। সংঘর্ষে দুটি বগি খাদে ছিটকে পড়ে।
ভূমিকম্পের মতো অভিজ্ঞতা
দুর্ঘটনার সময় ট্রেনে থাকা সালভাদোর হিমেনেজ জানান, প্রথমে মনে হয়েছিল ট্রেনটি হয়তো কোনো প্রাণীর সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছে। তারপরই আলো নিভে যায় এবং ঘোষণা শোনা যায় চিকিৎসা সহায়তার জন্য। প্রাণ বাঁচাতে যাত্রীরা জরুরি হাতুড়ি দিয়ে জানালা ভেঙে বেরিয়ে আসেন। তার ভাষায়, অনুভূতিটা ছিল ঠিক ভূমিকম্পের মতো।
জাতির গর্বে আঘাত
এই দুর্ঘটনায় শোক আর বিস্ময়ে স্তব্ধ স্পেন। দেশটি যে রেলব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে এবং গর্ব করে, সেই ব্যবস্থাই আজ প্রশ্নের মুখে। ইউরোপের সবচেয়ে বড় এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্কে এমন দুর্ঘটনা কীভাবে ঘটল, তা নিয়ে দেশজুড়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, স্পেনের মানুষ জানতে চাইছে কী ঘটেছে, কীভাবে ঘটেছে এবং কেন এমন ট্র্যাজেডি সম্ভব হলো। তিনি জানান, গত বছর মে মাসে সংস্কার করা লাইন, সুইচ ও সংযোগস্থল এবং সম্প্রতি পরিদর্শন করা নতুন ট্রেন—সবকিছুই তদন্তের আওতায় আনা হবে।
রহস্যজনক দুর্ঘটনা
পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে জানিয়েছেন, কোনো ট্রেনই অতিরিক্ত গতিতে চলছিল না এবং দুর্ঘটনাটি সোজা লাইনে ঘটেছে। তার মতে, ঘটনাটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক এবং বিশেষজ্ঞরাও হতবাক। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।
তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন লাইনের কোনো অংশ ভেঙে পড়েছিল কি না। তবে এটি দুর্ঘটনার কারণ না ফল, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। রেল দুর্ঘটনা তদন্ত কমিশনের প্রধান ইনাকি বারোন জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে মানবিক ভুল বা সংকেতব্যবস্থার ত্রুটি দেখা যাচ্ছে না। সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ট্রেন ও লাইনের পারস্পরিক ক্রিয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
মাঠে নেমে ভয়াবহ দৃশ্য
সংঘর্ষের তীব্রতায় কিছু মরদেহ ধ্বংসস্তূপ থেকে বহু দূরে পাওয়া গেছে। আন্দালুসিয়ার আঞ্চলিক সরকারের প্রধান হুয়ানমা মোরেনো জানান, অনেক মরদেহ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে, তাই ডিএনএ পরীক্ষার সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
দুর্ঘটনার শব্দ শুনে স্থানীয় বাসিন্দারা ছুটে আসেন। আদামুজের মেয়র রাফায়েল আঞ্জেল মোরেনো প্রথম দিকেই ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তার বর্ণনায়, মানুষ আহত অবস্থায় ট্রেন থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছিল, চারদিকে শুধু আর্তনাদ।
স্বেচ্ছাসেবী উদ্ধার আর হাসপাতালের চাপ
ঘটনাস্থল দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন গনসালো সানচেজ আগুইলার। তিনি নিজের গাড়িতে করে আহতদের হাসপাতালে পৌঁছে দেন। তার চোখের সামনে থাকা দৃশ্য ছিল বিভীষিকাময়।
করদোবার রেইনা সোফিয়া হাসপাতালে একসঙ্গে শতাধিক আহত রোগী আসায় চিকিৎসকরাও হতবাক। অভিজ্ঞ শল্যচিকিৎসক ফ্রান্সিসকো আলামিলোস জানান, তিনি জীবনে একসঙ্গে এত আহত মানুষ দেখেননি। পেলভিস, পা ও মুখের গুরুতর আঘাতে ভরে যায় হাসপাতালের ওয়ার্ড।
Sarakhon Report 



















