সরকারি প্রশাসনে নিয়মিত পদোন্নতি দীর্ঘদিন আটকে থাকায় গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। এতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরের প্রায় আটশ যোগ্য কর্মকর্তা তীব্র হতাশা ও ক্ষোভে ভুগছেন। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই অচলাবস্থা প্রশাসনের মনোবল ও কার্যকারিতার ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
পদোন্নতির অপেক্ষায় শত শত কর্মকর্তা
অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, বর্তমানে প্রায় ৮০০ কর্মকর্তা নিয়মিত পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন। এর মধ্যে অতিরিক্ত সচিব পদে উন্নীত হওয়ার যোগ্য প্রায় ৩৫০ জন, যুগ্ম সচিব পদে প্রায় ৩৪৫ জন এবং উপসচিব পদে অন্তত ৮৪ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। দীর্ঘসূত্রতার কারণে তাঁদের মধ্যে ব্যাপক হতাশা ও অসন্তোষ জমে উঠেছে।

নির্বাচনী তফসিলের পর অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে
প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর পদোন্নতি নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। তবে নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়মিত পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো আইনগত বাধা নয়। সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, নিয়মিত পদোন্নতি বন্ধ থাকলে প্রশাসন হতাশ ও মনোবলহীন হয়ে পড়বে, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও দৈনন্দিন শাসনব্যবস্থাকে ধীর করে দেবে।
বঞ্চিত কর্মকর্তার সংখ্যা বাড়ছে
উপসচিব ও যুগ্ম সচিব পর্যায়ে বঞ্চিত কর্মকর্তার সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। সম্প্রতি ৩০তম বিসিএস ব্যাচের ৭৯ জন কর্মকর্তাকে সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে উপসচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। তাঁদের প্রায় সবাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পুনর্বিবেচনার আবেদন করেছেন।
সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া জানান, সময়মতো পদোন্নতি না হলে প্রশাসনে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ে এবং কাজের গতি কমে যায়। তাঁর মতে, প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন নিয়ে হলেও সরকার নিয়মিত পদোন্নতি নিশ্চিত করতে পারে। এখনও সময় আছে এবং সরকার চাইলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে।
![]()
যুগ্ম সচিব পদে বঞ্চনা
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নিয়মিত ব্যাচ পদ্ধতিতে ২৪তম বিসিএস ব্যাচের অন্তত ১৮৩ জন কর্মকর্তা যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। গত ২০ মার্চ ১৯৬ জনকে যুগ্ম সচিব হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হলেও নিয়মিত ব্যাচের ৩২০ জনের মধ্যে মাত্র ১৩৭ জন সুযোগ পান। বাকি ১৮৩ জনের মধ্যে পাঁচজন কর্মরত জেলা প্রশাসকও রয়েছেন।
অতিরিক্ত সচিব পদে জটিলতা
যুগ্ম সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে নিয়মিত ব্যাচ হিসেবে বিবেচনায় রয়েছে ২০তম বিসিএস। প্রশাসন ক্যাডারের ২৪৪ জনসহ অন্যান্য ক্যাডারের মিলিয়ে প্রায় ৩০০ কর্মকর্তা এই তালিকায় রয়েছেন। তবে সূত্র জানায়, এই ব্যাচের ৪৩ জন সাবেক জেলা প্রশাসক এবং শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে মন্ত্রীদের ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ৪০ জন কর্মকর্তাকে এবার বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না।
২০তম বিসিএসের নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হয় ১৯৯৯ সালে। তাঁরা ২০১৯ সালে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির যোগ্য হলেও তা পান ২০২১ সালে। নিয়ম অনুযায়ী দুই বছর দায়িত্ব পালনের পর ২০২৩ সালে তাঁরা অতিরিক্ত সচিব পদে উন্নীত হওয়ার যোগ্য হন। সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড তাঁদের কর্মজীবনের নথি পর্যালোচনা করে তালিকা চূড়ান্ত করলেও শেষ মুহূর্তে গেজেট প্রকাশ হয়নি।

অন্যান্য ক্যাডারের অবস্থান
প্রশাসন ক্যাডারের পাশাপাশি অন্যান্য ক্যাডারের ১৫০ জনের বেশি কর্মকর্তা যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির যোগ্য হলেও এখনো সুযোগ পাননি। তাঁদের অনেকেই পুনর্বিবেচনার আবেদন করেছেন এবং এ বিষয়ে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড একাধিক বৈঠক করেছে।
দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে এমন কর্মকর্তা, দুর্নীতি দমন কমিশন বা বিভাগীয় মামলার আওতায় থাকা কর্মকর্তা এবং আগের সরকারের সময়ে মন্ত্রীদের ব্যক্তিগত সচিব বা জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারীদের এবার বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয় সূত্র।
সরকারের অবস্থান
জনপ্রশাসন সচিব এহসানুল হক জানিয়েছেন, সরকার বিষয়টি সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন। যাঁরা নিয়মিত পদোন্নতি পাননি তাঁদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আবদুর রশিদ বলেন, একাধিক আবেদন পাওয়া গেছে এবং বেশ কয়েকটি বৈঠক হয়েছে। সরকার সময়ের মধ্যে যতটা সম্ভব সমাধানের চেষ্টা করছে।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মন্ত্রীদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সচিবদের অনেকেই ইতোমধ্যে পদোন্নতি পেয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো পদোন্নতি নিশ্চিত করা না গেলে সরকারি কাজকর্ম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে, কর্মকর্তাদের মনোবল দুর্বল হবে এবং শেষ পর্যন্ত জনসেবা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















