বিমানযাত্রায় গাদাগাদি করে বসে থাকতে থাকতে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, পাশের যাত্রী কিংবা কয়েক সারি দূরের কারও কাছ থেকে কি কোনো রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই দুশ্চিন্তায় যাত্রীরা একা নন। গবেষকরাও দীর্ঘদিন ধরে জানতে চাইছেন, বিমানের ভেতরের বাতাসে আসলে কী ধরনের জীবাণু ভেসে বেড়ায়।
বাতাসে জীবাণু খোঁজার অভিনব পদ্ধতি
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ও পরিবেশ প্রকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এরিকা হার্টম্যান ও তাঁর সহকর্মীরা এক ভিন্ন পথ বেছে নেন। তাঁরা যাত্রীদের ব্যবহৃত মুখোশ সংগ্রহ করে সেগুলোর ভেতরে আটকে থাকা জীবাণু বিশ্লেষণ করেন। একই সঙ্গে হাসপাতালের কর্মীদের ব্যবহৃত মুখোশও পরীক্ষা করা হয়, কারণ হাসপাতালও এমন একটি জায়গা যেখানে জীবাণু সহজে ছড়াতে পারে।

গবেষণার জন্য মোট তেপ্পান্নটি মুখোশ জীবাণুমুক্ত ব্যাগে সংগ্রহ করা হয়। এরপর মুখোশের বাইরের স্তর কেটে শুধু বাতাসে ভেসে থাকা জীবাণুগুলোর নমুনা নেওয়া হয়। সেখান থেকে ডিএনএ বের করে বিশেষ পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ চালানো হয়, যাতে উপস্থিত সব ধরনের জীবাণুর চিহ্ন ধরা পড়ে।
ফলাফলে স্বস্তির ইঙ্গিত
গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে একটি বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে। এতে দেখা গেছে, বিমান ও হাসপাতালের বাতাস থেকে মোট চার শতাধিক জীবাণু প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে এবং দুই জায়গার জীবাণুর ধরন প্রায় একই। এর বড় অংশই এসেছে মানুষের ত্বক থেকে, যেগুলো সাধারণত ক্ষতিকর নয়।
গবেষকদের ভাষায়, এটি খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। আমরা যেখানে যাই, সেখানেই নিজের শরীরের জীবাণু ছড়িয়ে দিই। হাত দিয়ে কোনো পৃষ্ঠ স্পর্শ করলে ত্বকের জীবাণু সেখানে লেগে যায়। গবেষকেরা একে মানুষের জীবাণু বলয় বলে উল্লেখ করেছেন।

ভাইরাস নিয়ে কী বলছে গবেষণা
এই গবেষণায় মূলত ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ধরা পড়েছে, কারণ ব্যবহৃত পরীক্ষাপদ্ধতি ডিএনএ শনাক্তে বেশি কার্যকর। অনেক ভাইরাসের জিনগত উপাদান ভিন্ন হওয়ায় সেগুলো তুলনামূলক কম ধরা পড়ে। গবেষকেরা জানান, বাতাসে ব্যাকটেরিয়ার তুলনায় ভাইরাসের পরিমাণ সাধারণত কম, কারণ মানুষ ত্বকের ব্যাকটেরিয়া অনেক বেশি ঝরায়।
তাঁদের মতে, ভাইরাস টিকে থাকার জন্য নির্দিষ্ট পরিবেশ প্রয়োজন। শরীরের বাইরে ও সংক্রমণের উপযোগী কোষ থেকে দূরে গেলে ভাইরাসের শক্তি অনেক সময় কমে যায়। তবে এটাও সত্য, সামান্য পরিমাণ ভাইরাসই কাউকে অসুস্থ করতে পারে এবং কিছু ভাইরাস পৃষ্ঠে টিকে থাকতে সক্ষম।
ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার দিকনির্দেশনা
গবেষণার ফলাফল বাতাসে রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু শনাক্তে আরও উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছে। গবেষকদের ধারণা, ভবিষ্যতে এমন সেন্সর তৈরি হতে পারে যা বাতাসে জীবাণুর মাত্রা বেড়ে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতাস চলাচলের হার বাড়াবে বা মানুষকে সতর্ক করবে।

গবেষকের ভাষায়, স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় রেখে নিজের সুরক্ষার বিষয়ে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারলে তা হবে বড় অগ্রগতি।
সাধারণ মানুষের জন্য বার্তা
গবেষকেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, শীতকালে ঘরের ভেতরে জমায়েত বাড়লেও বিমান বা হাসপাতালের মতো জায়গার বাতাস সব সময় ভয়ংকর জীবাণুতে ভরা থাকে না। তবু অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা থাকলে মুখোশ ব্যবহার এখনো একটি কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা। এতে যেমন নিজেকে রক্ষা করা যায়, তেমনি অসুস্থ হলে অন্যদের মধ্যেও জীবাণু ছড়ানো কমানো সম্ভব।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















