রাজধানীর পল্টনে একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে চার বছর বয়সী এক শিশুকে নির্মম নির্যাতনের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, স্কুলের অফিস কক্ষে দুই শিক্ষক দফায় দফায় শিশুটির ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাচ্ছেন। ঘটনার পরপরই অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সংশ্লিষ্ট স্কুল বন্ধের দাবি উঠেছে।
শিশুর মানসিক অবস্থা
নির্যাতনের শিকার শিশুটির মা পল্টন থানায় মামলা করার পর সাংবাদিকদের জানান, তার সন্তান এখনো গভীর ট্রমায় রয়েছে। ঘুমের মধ্যেও সে চিৎকার করে উঠে বলে, মুখ সেলাই করে দিও না। শিশুটি বারবার বলছে, সে আর স্কুলে যাবে না। ভয় এতটাই বেড়েছে যে, বাবা-মায়ের সঙ্গেও থাকতে চাইছে না। আতঙ্কে সে নানাবাড়িতে চলে গেছে।
এক সপ্তাহেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
শিশুটির বাবা জানান, প্রি-প্লে শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই তার ছেলেকে এমন অমানবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। ভাইরাল ভিডিও দেখে তারা বাকরুদ্ধ। সন্তান জানিয়েছে, স্কুলের একজন তাকে ভয় দেখিয়ে বলেছিল, বাসায় কিছু বললে গলায় পারা দেবে, মুখ সেলাই করে দেবে।
ঘটনার বিবরণ
ঘটনাটি ঘটে গত ১৮ জানুয়ারি নয়াপল্টনের মসজিদ রোডে অবস্থিত শারমিন একাডেমিতে। স্কুলের অফিস কক্ষে থাকা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, স্কুলের পোশাক পরা শিশুটিকে এক নারী শিক্ষক কক্ষে নিয়ে গিয়ে প্রথমে চড় মারেন। এরপর সেখানে থাকা এক পুরুষ শিক্ষক শিশুটির গলা ও মুখ চেপে ধরেন। তার হাতে একটি স্টেপলার ছিল। শিশুটি কান্না ও অস্থিরতা প্রকাশ করলে নারী শিক্ষক তাকে ধরে রাখেন।
এক পর্যায়ে শিশুটি ভয়ে ওই নারীর শাড়িতে থুতু ফেললে পুরুষ শিক্ষক শিশুটির মাথা শাড়িতে চেপে ধরে কয়েকবার ঝাঁকি দেন। ভিডিওতে থাকা নারী শিক্ষক শারমিন জাহান, যিনি স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক। পুরুষ শিক্ষক পবিত্র কুমার স্কুলের ব্যবস্থাপক। পুলিশ জানিয়েছে, তারা স্বামী-স্ত্রী।
স্কুল বন্ধ, অভিভাবকদের উদ্বেগ
ঘটনার পরদিন সকালে স্কুলটিতে গিয়ে দেখা যায়, সেটি বন্ধ রয়েছে। তবে একাধিক অভিভাবক খোঁজ নিতে সেখানে যান। তারা জানান, ভিডিও দেখে তারা আতঙ্কিত ও ক্ষুব্ধ। গলির ভেতরে তিনতলা একটি ভবনের নিচতলার কয়েকটি কক্ষে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলটি পরিচালিত হতো। ভবনের নিরাপত্তাকর্মী জানান, তার জানা মতে স্কুলটি দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হয়ে আসছে।
মামলা ও পুলিশের বক্তব্য
শিশুর মা বাদী হয়ে শিশু আইনের ৭০ ধারায় শারমিন জাহান ও পবিত্র কুমারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার জানান, নির্যাতনের ভিডিও নিয়ে ১৯ জানুয়ারি শিশুটির বাবা-মা থানায় অভিযোগ করেন। সেদিনই পুলিশ স্কুল পরিদর্শন করে। অভিযুক্ত দুই শিক্ষক বর্তমানে পলাতক।
বাসায় ফিরে অসুস্থ হয়ে পড়ে শিশু
শিশুটির বাবা-মা পুলিশকে জানান, তাদের ছেলে স্বভাবতই চঞ্চল ও জেদি। সাধারণত বাবা স্কুল থেকে আনতে যান, তবে ঘটনার দিন মা গিয়েছিলেন। সেদিন ছেলের পোশাক এলোমেলো, একটি জুতা খোলা ও চুল অগোছালো ছিল। শিশুটি ছিল অস্বাভাবিকভাবে চুপচাপ ও বিষণ্ণ। কী ঘটেছে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক দাবি করেন, শিশুটি নাকি শিক্ষকের গায়ে লাথি ও থুতু দিয়েছে, তাই তাকে হালকা চড় দেওয়া হয়েছে। পরে বাসায় ফিরে শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়ে।
অভিভাবকদের ক্ষোভ
স্কুলের সামনে উপস্থিত অভিভাবকেরা ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান। এক অভিভাবক বলেন, অনেক সময় তার সন্তান অফিস কক্ষে অপেক্ষা করত। এখন সন্তানকে স্কুলে রেখে যেতে তিনি ভীত। অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বলেন, সচিবালয়ের কাছাকাছি পল্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় স্কুলে এমন অমানবিক ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















