০৯:১১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬
মিত্রতা থেকে মুখ ফেরাল ওয়াশিংটন, কুর্দিদের ছেড়ে নতুন সিরিয়ার পাশে যুক্তরাষ্ট্র সরকারপ্রধান ও প্রেস সচিবের বক্তব্যে সন্দেহ অনিবার্য: গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট বাগেরহাটে কারাবন্দি ছাত্রলীগ নেতার স্ত্রী ও শিশুপুত্রের মরদেহ উদ্ধার সেগার রূপকার ডেভিড রোজেন ভিডিও গেম শিল্পের নীরব স্থপতির বিদায় দ্য প্রিন্টকে দেয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা : নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করা স্বৈরতন্ত্র, গণতন্ত্র নয় ধর্ষণের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত ব্যর্থ আশ্রয়প্রার্থীকে ফেরত পাঠানোর পথে যুক্তরাজ্য মাদ্রিদে ভেনেজুয়েলার নির্বাচিতদের অপেক্ষা, মাদুরো ধরা পড়লেও ক্ষমতা এখনো তার ঘনিষ্ঠদের হাতে ট্রাম্প নীতির দীর্ঘ ছায়া, আজ স্থিতিশীল দেখালেও ভবিষ্যতে চাপে পড়তে পারে মার্কিন অর্থনীতি নবজাতক হত্যা মামলায় লুসি লেটবি: নতুন তথ্যচিত্রে কান্না, অস্বীকার আর তদন্তের অন্ধকার অধ্যায় ক্যানসার চিকিৎসায় উপেক্ষিত মানসিক যন্ত্রণা, জাতীয় পরিকল্পনায় পরিবর্তনের দাবি জোরালো

নেতাজির পরাক্রম আজও জীবন্ত, আলোকিত করে জাতির পথচলা

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মবার্ষিকীতে জাতি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করে তাঁর সাহস, আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার প্রতি অবিচল অঙ্গীকার। অল্প বয়স থেকেই নেতাজির মধ্যে ছিল বিরল নৈতিক দৃঢ়তা। ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য, পার্থিব আকাঙ্ক্ষা এমনকি ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের মতো মর্যাদাপূর্ণ কর্মজীবনও তিনি ত্যাগ করেছিলেন ভারতের মুক্তির লক্ষ্যে নিজেকে সম্পূর্ণ উৎসর্গ করার জন্য। তাঁর কাছে স্বাধীনতা ছিল এক পবিত্র দায়িত্ব।

নেতাজির ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টি মেলে ১৯৩৯ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেওয়া এক অসামান্য শ্রদ্ধার্ঘ্য থেকে। তিনি সুভাষচন্দ্র বসুকে অভিহিত করেছিলেন ‘দেশনায়ক’ হিসেবে। গুরুদেব বলেছিলেন, সংকটকালে একটি দেশের প্রয়োজন অনুপ্রাণিত ও সাহসী নেতার শক্ত হাত। নেতাজির মধ্যে তিনি দেখেছিলেন সাহস, দূরদৃষ্টি ও নৈতিক শক্তির বিরল সমন্বয়।

যখন প্রচলিত পথগুলি স্বাধীনতা অর্জনের জন্য অপর্যাপ্ত বলে মনে হয়েছিল, তখন নেতাজি নিজস্ব পথ বেছে নেন। ভারতীয় জাতীয় সেনার মাধ্যমে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামকে আন্তর্জাতিক আন্দোলনে রূপ দেন। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, পৃথিবীর কোনো শক্তিই আর আমাদের জন্মগত স্বাধীনতার অধিকার কেড়ে নিতে পারবে না। এই বিশ্বাসই ভারতীয় জাতীয় সেনার কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হয়। নেতাজির আহ্বান—আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব—ভারতের নানা অঞ্চল ও সম্প্রদায়ের মানুষের হৃদয়ে গভীর সাড়া জাগায়, বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের মানুষের মধ্যে, তামিল জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে তা ছিল অত্যন্ত প্রবল। নেতাজি ও তামিল জনগণের মধ্যে গড়ে ওঠা গভীর আবেগগত ও আদর্শিক বন্ধন ভারতীয় জাতীয় সেনা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম শক্ত স্তম্ভে পরিণত হয়। মালয়া, বার্মা ও সিঙ্গাপুরে বসবাসকারী তামিল সম্প্রদায়ের মধ্যেও নেতাজির জনপ্রিয়তা সমানভাবে প্রতিধ্বনিত হয়।

উনিশশো কুড়ির দশকের শুরু থেকেই নেতাজি ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির রাজনৈতিক গুরুত্ব অনুধাবন করেছিলেন। কংগ্রেস সংগঠক ও জাতীয় নেতা হিসেবে তিনি এই অঞ্চলের রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন। মাদ্রাজ ও প্রেসিডেন্সির অন্যান্য কেন্দ্রে তাঁর সফরগুলি ছিল বিশাল জনসমাবেশ ও উৎসাহব্যঞ্জক সংবর্ধনায় পরিপূর্ণ, বিশেষত ছাত্রসমাজ ও সচেতন যুবকদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো।

১৯৩৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর নেতাজি মাদ্রাজ সেন্ট্রাল স্টেশনে পৌঁছান। সেখানে তাঁকে স্বাগত জানান আইনজীবী ও স্বাধীনতা সংগ্রামী এস শ্রীনিবাস আয়েঙ্গার এবং পাসুম্পন উ মুথুরামালিঙ্গা থেভারসহ অসংখ্য সমর্থক। খোলা জিপে করে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এস পি আয়্যাস্বামী মুদালিয়ারের বাসভবন ‘দ্য পিক’-এ। পথজুড়ে ছিল সমর্থকদের ঢল। সেদিন সন্ধ্যায় তিনি মারিনা বিচে এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন।

এই সফরের সময় নেতাজির ঘনিষ্ঠ সহযোগী পাসুম্পন উ মুথুরামালিঙ্গা থেভার তামিলনাড়ুতে ফরওয়ার্ড ব্লকের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ‘দক্ষিণের বোস’ নামে পরিচিত এই নেতা ভারতীয় জাতীয় সেনার পক্ষে তামিল সমর্থন সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ‘নেতাজি’ নামে একটি তামিল সাপ্তাহিক পত্রিকাও প্রতিষ্ঠা করেন।

🇮🇳 “Give me blood, and I will give you freedom.” 🇮🇳 On Netaji Subhash  Chandra Bose Jayanti, we remember the fearless leader whose courage,  vision, and sacrifice continue to inspire generations. Let

উল্লেখযোগ্য নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন রামনাদের বাসিন্দা রামু থেভার। অল্প বয়সেই নেতাজির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ভারতীয় জাতীয় সেনায় যোগ দেন এবং পরে পেনাংয়ে গোয়েন্দা দায়িত্ব পান। ভারতে পৌঁছানোর চেষ্টার সময় তিনি গ্রেপ্তার হন এবং কলকাতার আলিপুর জেলে বন্দি থাকেন। মায়ের কাছে লেখা তাঁর চিঠিগুলি সেই সময়ের কঠোর কষ্ট ও তাঁর অটল দেশপ্রেমের কথা বলে। ১৯৪৪ সালে মাদ্রাজ জেলে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবর না জেনে তাঁর মা ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত তাঁকে চিঠি লিখে গেছেন। মাত্র আঠারো বছর বয়সে রামু থেভার দেশের জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করেছিলেন। দেশের বাইরে থেকেও তামিল তরুণরা ভারতীয় জাতীয় সেনায় যোগ দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন লেফটেন্যান্ট আর মাধবন পিল্লাই। ২০২৪ সালে পরাক্রম দিবস উদযাপনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হাতে তাঁর সম্মাননা প্রাপ্তি ছিল এক হৃদয়স্পর্শী মুহূর্ত।

১৯৪৩ সালে সিঙ্গাপুরের পদাংয়ে এক আবেগময় ভাষণে নেতাজি নারীদের সংগ্রামে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এটি হতে হবে এক সত্যিকারের বিপ্লবী সেনা। তাঁর কথায় গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন মালয়ার তামিল ভারতীয় নারীরা, যাঁদের অনেকেই রাবার বাগানে কঠোর জীবনযাপন করেছিলেন। কখনো ভারত না দেখেও তাঁদের প্রায় এক হাজার জন ঝাঁসির রানি রেজিমেন্টে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দেন।

লক্ষ্মী স্বামিনাথন তথা ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী সহগালের বীরত্ব সর্বজনবিদিত হলেও জানকি থেভার, অঞ্জলাই পন্নুসামি ও রসম্মা ভূপালানের অবদানও সমানভাবে প্রেরণাদায়ক। জানকি থেভার মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে নেতাজির ভাষণ শুনে তাঁর হীরের কানের দুল ভারতীয় জাতীয় সেনায় দান করেন এবং পরে ঝাঁসির রানি রেজিমেন্টে উচ্চ নেতৃত্বের পদে উন্নীত হন। সরস্বতী রাজামণি, যিনি ভারতের কনিষ্ঠতম নারী গোয়েন্দা কর্মীদের একজন হিসেবে পরিচিত, ষোলো বছর বয়সে সেনায় যোগ দিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। নেতাজির সমতার দর্শনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নারীরা পুরুষদের সঙ্গে একসঙ্গে প্রশিক্ষণ নেন ও কাজ করেন, এবং বর্ণভেদ প্রথা প্রত্যাখ্যাত হয়।

এই নেতাদের পাশাপাশি ছিলেন রামনাথপুরম, তিরুনেলভেলি, মাদুরাই, শিবগঙ্গা, তিরুচিরাপল্লি ও কুদ্দালোরের অসংখ্য নাম না জানা তামিল সৈনিক ও শ্রমিক, যাঁরা মালয়া, বার্মা ও সিঙ্গাপুর থেকে নেতাজির ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন। এই বিপুল সমর্থনে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হয়ে নেতাজি নাকি বলেছিলেন, যদি তিনি আবার জন্ম নেন, তবে তিনি তামিল হিসেবেই জন্ম নিতে চাইবেন।

নেতাজির বিশ্বাস ছিল, রাজনৈতিক স্বাধীনতা কেবল সূচনা মাত্র। আসল কাজ হলো এমন এক শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ ও আত্মনির্ভর ভারত গড়ে তোলা, যেখানে সবার জন্য মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। তামিল জনগণের সঙ্গে তাঁর বিশেষ সম্পর্ক আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ভারতের স্বাধীনতা গড়ে উঠেছে নানা অঞ্চল, সম্প্রদায় ও অগণিত নীরব বীরের যৌথ আত্মত্যাগের মাধ্যমে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ধারাবাহিকভাবে ঔপনিবেশিক মানসিকতা ঝেড়ে ফেলার, ভারতের মূল্যবোধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সম্মান করার এবং মন ও আত্মার প্রকৃত মুক্তির পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। নেতাজির জন্মবার্ষিকীকে পরাক্রম দিবস হিসেবে পালন, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের ঐতিহাসিক দ্বীপগুলির নামকরণ এবং কর্তব্য পথে তাঁর মূর্তি স্থাপন—সবই এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। নেতাজি একবার বলেছিলেন, একজন মানুষ কোনো আদর্শের জন্য মৃত্যুবরণ করতে পারে, কিন্তু তার মৃত্যুর পর সেই আদর্শ হাজার জীবনে পুনর্জন্ম নেয়। তাঁর আদর্শ আজও ভারতকে পথ দেখাচ্ছে, যখন জাতি পরাক্রমকে অগ্রগতিতে রূপান্তরের সম্মিলিত সংকল্প নিয়ে এগিয়ে চলেছে।

লেখক:  ভারতের উপরাষ্ট্রপতি (লেখাটি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত। মূল ভাব ও শব্দের সঙ্গে মিল রেখে বাংলায় অনূদিত)
জনপ্রিয় সংবাদ

মিত্রতা থেকে মুখ ফেরাল ওয়াশিংটন, কুর্দিদের ছেড়ে নতুন সিরিয়ার পাশে যুক্তরাষ্ট্র

নেতাজির পরাক্রম আজও জীবন্ত, আলোকিত করে জাতির পথচলা

০৭:৪০:১১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মবার্ষিকীতে জাতি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করে তাঁর সাহস, আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার প্রতি অবিচল অঙ্গীকার। অল্প বয়স থেকেই নেতাজির মধ্যে ছিল বিরল নৈতিক দৃঢ়তা। ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য, পার্থিব আকাঙ্ক্ষা এমনকি ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের মতো মর্যাদাপূর্ণ কর্মজীবনও তিনি ত্যাগ করেছিলেন ভারতের মুক্তির লক্ষ্যে নিজেকে সম্পূর্ণ উৎসর্গ করার জন্য। তাঁর কাছে স্বাধীনতা ছিল এক পবিত্র দায়িত্ব।

নেতাজির ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টি মেলে ১৯৩৯ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেওয়া এক অসামান্য শ্রদ্ধার্ঘ্য থেকে। তিনি সুভাষচন্দ্র বসুকে অভিহিত করেছিলেন ‘দেশনায়ক’ হিসেবে। গুরুদেব বলেছিলেন, সংকটকালে একটি দেশের প্রয়োজন অনুপ্রাণিত ও সাহসী নেতার শক্ত হাত। নেতাজির মধ্যে তিনি দেখেছিলেন সাহস, দূরদৃষ্টি ও নৈতিক শক্তির বিরল সমন্বয়।

যখন প্রচলিত পথগুলি স্বাধীনতা অর্জনের জন্য অপর্যাপ্ত বলে মনে হয়েছিল, তখন নেতাজি নিজস্ব পথ বেছে নেন। ভারতীয় জাতীয় সেনার মাধ্যমে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামকে আন্তর্জাতিক আন্দোলনে রূপ দেন। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, পৃথিবীর কোনো শক্তিই আর আমাদের জন্মগত স্বাধীনতার অধিকার কেড়ে নিতে পারবে না। এই বিশ্বাসই ভারতীয় জাতীয় সেনার কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হয়। নেতাজির আহ্বান—আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব—ভারতের নানা অঞ্চল ও সম্প্রদায়ের মানুষের হৃদয়ে গভীর সাড়া জাগায়, বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের মানুষের মধ্যে, তামিল জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে তা ছিল অত্যন্ত প্রবল। নেতাজি ও তামিল জনগণের মধ্যে গড়ে ওঠা গভীর আবেগগত ও আদর্শিক বন্ধন ভারতীয় জাতীয় সেনা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম শক্ত স্তম্ভে পরিণত হয়। মালয়া, বার্মা ও সিঙ্গাপুরে বসবাসকারী তামিল সম্প্রদায়ের মধ্যেও নেতাজির জনপ্রিয়তা সমানভাবে প্রতিধ্বনিত হয়।

উনিশশো কুড়ির দশকের শুরু থেকেই নেতাজি ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির রাজনৈতিক গুরুত্ব অনুধাবন করেছিলেন। কংগ্রেস সংগঠক ও জাতীয় নেতা হিসেবে তিনি এই অঞ্চলের রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন। মাদ্রাজ ও প্রেসিডেন্সির অন্যান্য কেন্দ্রে তাঁর সফরগুলি ছিল বিশাল জনসমাবেশ ও উৎসাহব্যঞ্জক সংবর্ধনায় পরিপূর্ণ, বিশেষত ছাত্রসমাজ ও সচেতন যুবকদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো।

১৯৩৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর নেতাজি মাদ্রাজ সেন্ট্রাল স্টেশনে পৌঁছান। সেখানে তাঁকে স্বাগত জানান আইনজীবী ও স্বাধীনতা সংগ্রামী এস শ্রীনিবাস আয়েঙ্গার এবং পাসুম্পন উ মুথুরামালিঙ্গা থেভারসহ অসংখ্য সমর্থক। খোলা জিপে করে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এস পি আয়্যাস্বামী মুদালিয়ারের বাসভবন ‘দ্য পিক’-এ। পথজুড়ে ছিল সমর্থকদের ঢল। সেদিন সন্ধ্যায় তিনি মারিনা বিচে এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন।

এই সফরের সময় নেতাজির ঘনিষ্ঠ সহযোগী পাসুম্পন উ মুথুরামালিঙ্গা থেভার তামিলনাড়ুতে ফরওয়ার্ড ব্লকের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ‘দক্ষিণের বোস’ নামে পরিচিত এই নেতা ভারতীয় জাতীয় সেনার পক্ষে তামিল সমর্থন সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ‘নেতাজি’ নামে একটি তামিল সাপ্তাহিক পত্রিকাও প্রতিষ্ঠা করেন।

🇮🇳 “Give me blood, and I will give you freedom.” 🇮🇳 On Netaji Subhash  Chandra Bose Jayanti, we remember the fearless leader whose courage,  vision, and sacrifice continue to inspire generations. Let

উল্লেখযোগ্য নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন রামনাদের বাসিন্দা রামু থেভার। অল্প বয়সেই নেতাজির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ভারতীয় জাতীয় সেনায় যোগ দেন এবং পরে পেনাংয়ে গোয়েন্দা দায়িত্ব পান। ভারতে পৌঁছানোর চেষ্টার সময় তিনি গ্রেপ্তার হন এবং কলকাতার আলিপুর জেলে বন্দি থাকেন। মায়ের কাছে লেখা তাঁর চিঠিগুলি সেই সময়ের কঠোর কষ্ট ও তাঁর অটল দেশপ্রেমের কথা বলে। ১৯৪৪ সালে মাদ্রাজ জেলে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবর না জেনে তাঁর মা ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত তাঁকে চিঠি লিখে গেছেন। মাত্র আঠারো বছর বয়সে রামু থেভার দেশের জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করেছিলেন। দেশের বাইরে থেকেও তামিল তরুণরা ভারতীয় জাতীয় সেনায় যোগ দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন লেফটেন্যান্ট আর মাধবন পিল্লাই। ২০২৪ সালে পরাক্রম দিবস উদযাপনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হাতে তাঁর সম্মাননা প্রাপ্তি ছিল এক হৃদয়স্পর্শী মুহূর্ত।

১৯৪৩ সালে সিঙ্গাপুরের পদাংয়ে এক আবেগময় ভাষণে নেতাজি নারীদের সংগ্রামে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এটি হতে হবে এক সত্যিকারের বিপ্লবী সেনা। তাঁর কথায় গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন মালয়ার তামিল ভারতীয় নারীরা, যাঁদের অনেকেই রাবার বাগানে কঠোর জীবনযাপন করেছিলেন। কখনো ভারত না দেখেও তাঁদের প্রায় এক হাজার জন ঝাঁসির রানি রেজিমেন্টে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দেন।

লক্ষ্মী স্বামিনাথন তথা ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী সহগালের বীরত্ব সর্বজনবিদিত হলেও জানকি থেভার, অঞ্জলাই পন্নুসামি ও রসম্মা ভূপালানের অবদানও সমানভাবে প্রেরণাদায়ক। জানকি থেভার মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে নেতাজির ভাষণ শুনে তাঁর হীরের কানের দুল ভারতীয় জাতীয় সেনায় দান করেন এবং পরে ঝাঁসির রানি রেজিমেন্টে উচ্চ নেতৃত্বের পদে উন্নীত হন। সরস্বতী রাজামণি, যিনি ভারতের কনিষ্ঠতম নারী গোয়েন্দা কর্মীদের একজন হিসেবে পরিচিত, ষোলো বছর বয়সে সেনায় যোগ দিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। নেতাজির সমতার দর্শনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নারীরা পুরুষদের সঙ্গে একসঙ্গে প্রশিক্ষণ নেন ও কাজ করেন, এবং বর্ণভেদ প্রথা প্রত্যাখ্যাত হয়।

এই নেতাদের পাশাপাশি ছিলেন রামনাথপুরম, তিরুনেলভেলি, মাদুরাই, শিবগঙ্গা, তিরুচিরাপল্লি ও কুদ্দালোরের অসংখ্য নাম না জানা তামিল সৈনিক ও শ্রমিক, যাঁরা মালয়া, বার্মা ও সিঙ্গাপুর থেকে নেতাজির ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন। এই বিপুল সমর্থনে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হয়ে নেতাজি নাকি বলেছিলেন, যদি তিনি আবার জন্ম নেন, তবে তিনি তামিল হিসেবেই জন্ম নিতে চাইবেন।

নেতাজির বিশ্বাস ছিল, রাজনৈতিক স্বাধীনতা কেবল সূচনা মাত্র। আসল কাজ হলো এমন এক শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ ও আত্মনির্ভর ভারত গড়ে তোলা, যেখানে সবার জন্য মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। তামিল জনগণের সঙ্গে তাঁর বিশেষ সম্পর্ক আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ভারতের স্বাধীনতা গড়ে উঠেছে নানা অঞ্চল, সম্প্রদায় ও অগণিত নীরব বীরের যৌথ আত্মত্যাগের মাধ্যমে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ধারাবাহিকভাবে ঔপনিবেশিক মানসিকতা ঝেড়ে ফেলার, ভারতের মূল্যবোধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সম্মান করার এবং মন ও আত্মার প্রকৃত মুক্তির পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। নেতাজির জন্মবার্ষিকীকে পরাক্রম দিবস হিসেবে পালন, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের ঐতিহাসিক দ্বীপগুলির নামকরণ এবং কর্তব্য পথে তাঁর মূর্তি স্থাপন—সবই এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। নেতাজি একবার বলেছিলেন, একজন মানুষ কোনো আদর্শের জন্য মৃত্যুবরণ করতে পারে, কিন্তু তার মৃত্যুর পর সেই আদর্শ হাজার জীবনে পুনর্জন্ম নেয়। তাঁর আদর্শ আজও ভারতকে পথ দেখাচ্ছে, যখন জাতি পরাক্রমকে অগ্রগতিতে রূপান্তরের সম্মিলিত সংকল্প নিয়ে এগিয়ে চলেছে।

লেখক:  ভারতের উপরাষ্ট্রপতি (লেখাটি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত। মূল ভাব ও শব্দের সঙ্গে মিল রেখে বাংলায় অনূদিত)