গাজা উপত্যকার ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে আবারও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ঘোষিত হলুদ সীমারেখার ভেতরে ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িগুলোর ছবি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছে। এমন বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা শান্তি বোর্ডে পাকিস্তানকে যুক্ত হওয়ার আহ্বান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ফিলিস্তিনের সঙ্গে পাকিস্তানের আবেগী ও নৈতিক সম্পর্ক পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের আগে থেকে গভীরভাবে প্রোথিত, যা আজকের সিদ্ধান্তকে আরো সংবেদনশীল করে তুলেছে।
পাকিস্তানের সামরিক ভাবমূর্তি ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা
বিশ্ব শক্তিগুলো আজ যদি ফিলিস্তিন সংকটের সমাধানে পাকিস্তানের দিকে তাকায়, তার পেছনে রয়েছে দেশটির সুপ্রতিষ্ঠিত সামরিক সুনাম। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের ভূমিকা আন্তর্জাতিক পরিসরে আস্থা তৈরি করেছে। কঙ্গো থেকে সোমালিয়া, বসনিয়া থেকে আফ্রিকার নানা সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে পাকিস্তানি শান্তিরক্ষীরা পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও শৃঙ্খলার পরিচয় দিয়ে সম্মান অর্জন করেছে। তবে গাজার বর্তমান পরিস্থিতি অতীতের যেকোনো মিশনের চেয়ে ভিন্ন ও জটিল।

ভুল অবস্থান নিলে আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা
গাজায় যদি পাকিস্তান এমন কোনো সামরিক বা নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হয়, যাকে প্রকাশ্যে ইসরাইল পন্থী শক্তির তত্ত্বাবধানে দেখা হয় বা যাকে গাজার জনগণ জায়নবাদী এজেন্ডার সম্প্রসারণ হিসেবে মনে করে, তাহলে তাৎক্ষণিক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া অনিবার্য। এতে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে, বিশেষ করে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে পাকিস্তান বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি হতে পারে। ফিলিস্তিন প্রশ্নে পাকিস্তান দীর্ঘদিন নৈতিক নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে থাকলেও এমন সিদ্ধান্ত সেই বিশ্বাসকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
নিষ্ক্রিয়তার ঝুঁকি ও কূটনৈতিক শূন্যতা
অন্যদিকে পাকিস্তান যদি পুরোপুরি দূরে সরে থাকে বা কেবল প্রতীকী উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তার ফল কম ভয়াবহ নয়। গাজা নিয়ে স্থিতিশীলতা আনার প্রক্রিয়ায় আগ্রহ না দেখালে পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রভাব ক্ষীণ হয়ে পড়বে। তখন ফিলিস্তিনিদের প্রতি দীর্ঘদিনের সহানুভূতি ও বাস্তব প্রয়োগে নিষ্প্রভ হয়ে যাবে। পাকিস্তানের অনুপস্থিতিতে যে শূন্যতা তৈরি হবে, তা এমন শক্তি দিয়ে পূরণ হতে পারে যারা ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায়সংগত দাবির সঙ্গে একাত্ম নয়।

সৌদি আরবের ভূমিকা ও আঞ্চলিক সমন্বয়
এই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কূটনৈতিক ময়দানে নেতৃত্ব পুনরুদ্ধারে পাকিস্তানের জন্য রিয়াদের মতো মিত্রের সমর্থন জরুরি। সৌদি নেতৃত্ব যদি ট্রাম্পের প্রস্তাবিত গাজা শান্তি উদ্যোগে সমর্থন দেয়, তাহলে পাকিস্তানেরও সেই অবস্থানে সৌদি আরবের পাশে দাঁড়ানো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
শান্তিরক্ষা হোক পাকিস্তানের সীমা
পাকিস্তান আজ এক ঐতিহাসিক মোড়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে জনমত, নৈতিক দায়িত্ব ও কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা, অন্যদিকে ভুল হিসাবের মারাত্মক পরিণতির আশঙ্কা। এই অবস্থায় পাকিস্তানের ভূমিকা কোনো সামরিক বা আক্রমণাত্মক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হওয়া উচিত নয়। শান্তিরক্ষা, মানবিক সহায়তা ও যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন এর মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ থাকা প্রয়োজন। এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না, যা বিতর্কিত রাজনৈতিক বা সামরিক এজেন্ডাকে বৈধতা দেয় কিংবা পরোক্ষভাবে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি আগ্রাসনকে সমর্থন করার ধারণা তৈরি করে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সিদ্ধান্ত
মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রস্তাব পাকিস্তানের আগামী কয়েক দশকের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে। ইতিহাস কেবল সিদ্ধান্তকে নয়, তার ফলাফলকেও প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করে নিয়ে যায়। তাই গাজা প্রশ্নে পাকিস্তানের প্রতিটি পদক্ষেপ হতে হবে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে।


সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















