দীর্ঘদিন ধরে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের অঙ্গীকার থাকলেও আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই প্রতিশ্রুতির বিপরীত চিত্রই তুলে ধরছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থিতালিকায় নারীর উপস্থিতি এখনো অত্যন্ত কম, যা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
নারী প্রার্থীর সংখ্যা কেন এত কম
নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল। কিন্তু এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীসহ ৩০টির বেশি দল একজন নারী প্রার্থীও মনোনয়ন দেয়নি। ফলে মোট প্রার্থীর মধ্যে নারীর হার চার শতাংশেরও নিচে নেমে গেছে।
নির্বাচনের জন্য জমা দেওয়া ২ হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্রের মধ্যে মাত্র ১০৯টি জমা দিয়েছেন নারী প্রার্থীরা। নির্বাচন কমিশনের পর্যালোচিত তথ্যে দেখা যায়, এটি মোটের মাত্র চার দশমিক ২৪ শতাংশ।
মনোনয়ন যাচাই শেষে কমিশন বৈধ ঘোষণা করেছে ১ হাজার ৮৪২ জন প্রার্থীকে। এদের মধ্যে পুরুষ ১ হাজার ৭৭৯ জন এবং নারী মাত্র ৬৩ জন। অর্থাৎ চূড়ান্ত তালিকায় নারীর অংশগ্রহণ তিন দশমিক চার শতাংশে নেমে আসে।
পরে আপিলের মাধ্যমে ৪১৭ জন প্রার্থী পুনরায় প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পান। সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থী, যার মধ্যে নারী ৭৬ জন। শতাংশের হিসেবে এটি তিন দশমিক ৮৪।
স্বচ্ছতা ও স্বাধীন প্রার্থীদের চিত্র
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ জানিয়েছে, দলীয় প্রার্থীদের মধ্যে নারীর হার মাত্র তিন দশমিক ৩৮ শতাংশ। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে এই হার তুলনামূলক বেশি, প্রায় ১০ শতাংশ।

৩৭ জন স্বতন্ত্র নারী প্রার্থীর মধ্যে যাচাইয়ে টিকে গেছেন মাত্র ছয়জন। তারা হলেন নাটোর, ঢাকা, জামালপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন আসনের প্রার্থী।
ভোটার তালিকায় নারীর শক্ত অবস্থান
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখের বেশি, নারী ভোটার প্রায় ৬ কোটি ২৯ লাখ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন এক হাজারেরও বেশি। অর্থাৎ ভোটার তালিকায় নারী প্রায় অর্ধেক হলেও প্রার্থিতালিকায় তাদের অংশগ্রহণ নগণ্য।
আইনি কাঠামো ও বাস্তবতা
২০২৫ সালের জুলাই মাসে প্রণীত জাতীয় ঐকমত্য অধ্যাদেশে বলা হয়েছিল, সংসদ নির্বাচনে প্রতিটি দলকে অন্তত পাঁচ শতাংশ নারী প্রার্থী দিতে হবে, যা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ৩৩ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য ছিল। কিন্তু অধ্যাদেশটি এখনো কার্যকর না হওয়ায় এটি বাধ্যতামূলক হয়নি।
আগের নির্বাচনগুলোর ইতিহাসও হতাশাজনক। ২০০৮ সালে নারী প্রার্থী ছিলেন তিন দশমিক ৫১ শতাংশ, ২০১৪ সালে পাঁচ দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে তা নেমে আসে শূন্য দশমিক ৮১ শতাংশে। দ্বাদশ সংসদে নির্বাচিত ২০ নারী সদস্য সর্বোচ্চ হলেও সেটিও ছিল মাত্র ছয় দশমিক ৬৭ শতাংশ।
দলভিত্তিক মনোনয়নের চিত্র
বিএনপি শুরুতে সর্বোচ্চ ১৫টি আসনে নারী প্রার্থী দিলেও যাচাই শেষে বৈধ রয়েছেন ১১ জন। অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক দল মার্ক্সবাদী, জাসদ, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ, গণসংহতি আন্দোলন, জাতীয় পার্টিসহ কয়েকটি দল সীমিত সংখ্যায় নারী প্রার্থী দিয়েছে।
নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উঠে আসা জাতীয় নাগরিক পার্টি ৪৪ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র তিনজন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে। অনেক বড় দল, যেমন জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ ও খেলাফত মজলিসের শতাধিক প্রার্থী থাকলেও একজন নারীও নেই।
নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ ও মানবাধিকার উদ্বেগ
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫১টি দলের মধ্যে ৩০টি দল কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি। প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের অন্যতম বড় দল জামায়াতে ইসলামীও কোনো নারীকে মনোনয়ন দেয়নি।

নারী নেতৃত্ব ও আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও রাজনীতিতে অর্থবহ অংশগ্রহণ থেকে নারীরা এখনো বঞ্চিত, এমন মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।
নারী অধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়া
নারী রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম জানিয়েছে, জুলাইয়ের জাতীয় সনদের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও পাঁচ শতাংশ নারী প্রার্থী নিশ্চিত না করায় রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। তারা নারী মনোনয়নকে আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং সাংবিধানিক দায় হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছে।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ফোরামের নেতারা বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও সংসদ নির্বাচনে তারা দলীয় মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
ফোরাম নেত্রী সামিনা ইয়াসমিন বলেন, ভোটারের প্রায় ৫১ শতাংশ নারী। এত বড় একটি জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার চিন্তা কতটা বাস্তবসম্মত, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির উদ্বেগ
নারী, মানবাধিকার ও উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা ৭১টি সংগঠনের জোট সামাজিক প্রতিরোধ কমিটিও নারী প্রার্থীর স্বল্পতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। তাদের মতে, সমাজের বিদ্যমান নারীবিদ্বেষী সংস্কৃতি ও পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামো নারীদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে নিরুৎসাহিত করছে।
কমিটি রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও শাসনব্যবস্থায় নারীর সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। তাদের মতে, গণতান্ত্রিক ও ন্যায্য সমাজ গঠনের জন্য এটি অপরিহার্য।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















